টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

সীতাকুন্ডে মহাসড়কে বেপরোয়া ‘সেইফ লাইন’

দুর্ঘটনায় দেড় মাসে নিহত ২০, আহত শতাধিক

চট্টগ্রাম, ২৭  জানুয়ারি ২০১৭ (সিটিজি টাইমস): সেইফ লাইনের চালক খুব বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাচ্ছিল। চালকের পাশের সিটে বসা আমরা দুই মহিলা যাত্রী তাকে বারবার অনুরোধ করছিলাম গতি কমিয়ে ধীরে চলার জন্য। কিন্তু ১৬-১৭ বছর বয়সী গাড়িচালক কোনো কথা শুনতে রাজি নয়। সে তার ইচ্ছেমতোই দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় আমরা আতঙ্কিত হয়ে উঠলে তার একটাই কথা- আপনারা চুপচাপ বসে থাকুন, যা করার আমি করব। এভাবে আমাদের সতর্কতা উপেক্ষা করে গাড়ি চালাতে গিয়ে মহাসড়কের বাঁশবাড়িয়া মগপুকুর অতিক্রম করার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ক্রেন ও একটি চলন্ত ট্রাককে সজোরে ধাক্কা দেয় সে। এতে সেইফ লাইনের সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। গুরুতর আহত হলাম আমি ও আমার সহযাত্রী মনোয়ারা বেগমসহ (৩৫) গাড়িতে থাকা সবাই। আমার মাথাও দারুণভাবে ফেটে গেল। শেষে মাথায় ১০টি সেলাই দিতে হয়েছে। চালকের বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের স্বীকার হয়ে এখনো ব্যাথায় কষ্ট পাচ্ছি আমি। কথাগুলো বলছিলেন এনজিও ব্র্যাকের শিক্ষা প্রোগ্রামের কর্মী পূর্নিমা দে (৩৪)। পটিয়ার সজল মিত্রের স্ত্রী পূর্নিমা চাকরির সুবাদে থাকেন সীতাকুন্ড পৌরসদরের বড়বাজার এলাকায় প্রদীপ চৌধুরীর বাসায়। গত ১ জানুয়ারি লোকাল সেইফ লাইনে নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারি বই নিয়ে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনার স্বীকার হন তিনি। এ ঘটনায় মাথা ছাড়াও পা ও গোড়ালিতে মারাত্মক জখম হয় তার।

পূর্নিমা বলেন, গাড়িতে থাকা চালক ও হেল্পার ছাড়া সবাই ছিল ব্র্যাক কর্মী। ওই দুর্ঘটনায় আমার পাশের সিটে বসা ব্র্যাক কর্মী মনোয়ারা বেগম, ভেতরের সিটে বসা জমির (৪০) ও মনির (৪৫) এবং চালক, হেল্পার সবাই আহত হয়েছিল। মনোয়ারা দুদিন চমেক হাসপাতালে চিকিৎসার পর রিলিজ পেলেও এখনো পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। এদিকে শুধু এই দিনই নয়, নামে ‘সেইফ লাইন’ হলেও ইতোমধ্যে সীতাকুন্ডের সবচেয়ে অনিরাপদ এই লোকাল গাড়িতে প্রায়ই দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটছে। গতকাল সোমবার বিকেলেও উপজেলার বাড়বকুন্ড পিএইচপি ফ্লোট গ্লাসের সামনে চট্টগ্রামমুখী একটি সেইফ লাইন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের উপরে উল্টে গেলে কমপক্ষে ১৫-১৬ যাত্রী আহত হয়েছেন। ঘটনার পর স্থানীয়দের সহযোগিতায় তারা বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। যাত্রী ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুন্ড উপজেলাটি বন্দর নগরী চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত হওয়ায় এলাকাটি খুবই ব্যস্ত। এখানে যানবাহনের চাপ মহাসড়কের অন্য অংশের তুলনায় কিছুটা বেশিই থাকে। ফলে গাড়ি খুব সাবধানে না চালালে যে কোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।

থানা, হাইওয়ে পুলিশ ও এলাকাবাসীর তথ্য অনুসারে গত দেড় মাসেই মহাসড়কের সীতাকুন্ড অংশে ৩২টি দুর্ঘটনায় ২০ জন নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে সেইফ লাইন উল্টে, ট্রাকের সংঘর্ষ ও বেপরোয়া গাড়ি চাপায়। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে দ্রুতগতির গাড়ির নিচে চাপা পড়ে। মহাসড়কের এক নিত্যযাত্রী সীতাকুন্ড সদরের মো. একরাম হোসেন বলেন, সীতাকুন্ড মহাসড়কে সিএনজি অটোরিকশা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেসব গাড়ি চালকরাই সেইফ লাইন নামক নতুন লোকাল গাড়িগুলো চালাতে শুরু করে। ১৬-১৭ বছরের যুবক ও অদক্ষ গাড়ি চালকদের লাইসেন্স না থাকলেও তারা নির্বিঘ্নে গাড়িগুলোতে যাত্রী আনা-নেয়া করছে। ফলে সেইফ লাইন পরিবহনের দুর্ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সীতাকুন্ডের বারোআউলিয়া হাইওয়ে থানার ওসি মো. ছালে আহমেদ পাঠান প্রতিবেদককে বলেন, গাড়ি চালকদের বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের কারণেই বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে। আমরা যখন অতিরিক্ত গতিতে চলতে দেখি বা আইন অমান্য করতে দেখি তখন মামলা দেই। কিন্তু তারা মামলা শেষ করে আবারো একই নিয়মে চলে। তিনি বলেন, সেইফ লাইনে দুর্ঘটনা বৃদ্ধির মূল কারণ হলো- অতিরিক্ত গতি এবং হটাৎ ব্রেক করার চেষ্টা। একজন প্যাসেঞ্জার সিগনাল দিলেই তারা হটাৎ ব্রেক করার চেষ্টা করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত