টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

বাঘের গর্জনে প্রাণ ফিরেছে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায়

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: বন নেই, তবুও শুনা যায় বাঘের গর্জন। সাথে জনকোলাহল। সে আর কি হতে পারে-এমন প্রশ্ন করতেই সমস্বরে সমু আর শানু দুই ভাই-বোন বলে উঠল চিড়িয়াখানা। হ্যা! চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা।

সমু (১১) আর শানু (৮)-চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার অদুরে আনসার ক্যাম্পের পাশে মা-বাবার সাথে বসবাস করে বলে সহজে উত্তরটা দিতে পারল তা না! এই কয়দিনে সবাই জেনে গেছে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার বাঘের গর্জন সম্পর্কে। যদিও মাত্র এক মাস আগেও বাঘের গর্জন শুনা যেত না চিড়িয়াখানা ও আশপাশের কোথাও।

গত বছরের ডিসেম্বর মসের তৃতীয় সপ্তাহের কোন একদিনে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দুটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার আনা হয়েছে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায়। গণমাধ্যমের সুবাধে সে কথা এখন অজানা নয় বিনোদন পিয়াসী কারোই। এর আগে নোভা ও বাদশার বিয়েতেও বিষয়টি জেনে গেছে অনেকে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষে তৎকালীন জেলা প্রশাসক কিন্তু ঘোষনাটি দিয়েছিলেন তখনই। সেই মোতাবেক নির্দিষ্ট সময়ে বাঘ আনা হয়েছে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায়। বাঘ যেদিন এসেছিল সেদিন তো উপচে পড়া দর্শনার্থী ছিল চিড়িয়াখানায়।

সেই থেকে কমতি নেই দর্শকের। ক্রমেই বাড়ছে দর্শক। ফলে প্রতিদিন বাঘের গর্জনের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে জনকোলাহলও। যা গত এক দশকেও দেখা যায়নি এই চিড়িয়াখানায়।

চিড়িয়াখানার চিকিৎসক ডা. শাহাদাত হোসেন শুভ জানান, গত এক দশক ধরে চিড়িয়াখানায় বানর, হরিণ, ভালুক, সারস, কুমির, ময়ূর, সজারু -এসব দেখেই মন ভরাতে হতো দর্শনার্থীদের। কিছুটা বিনোদন পূরণ হতো দর্শনার্থীদেরকে ভালুকের অনুকরণ করার চেষ্টা আর বানরের ছুটাছুটি দেখে। কিন্তু সব কিছু শেষে সেই বাঘ-সিংহের অভাবই শূণ্যতা জাগিয়ে তুলতো। শূণ্যতা পূরণে ব্যর্থ হতে হতে এক সময় চিড়িয়াখানাই ব্যর্থ হয়ে উঠলো।

তিনি বলেন, সম্পুর্ণ নিজস্ব আয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তত্ববধানে পরিচালিত এই চিড়িয়াখানায় বাঘ ও সিংহের অভাব পূরণের উদ্যোগ নেন। যথাযথ উদ্যোগে চিড়িয়াখানা এখন সফল। বাঘের গর্জনেই প্রাণ ফিরে পেয়েছে এই চিড়িয়াখানা।

তিনি আরও বলেন, বাঘেদের দেখতে অনেকেই নগরীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন। বিশেষ করে শুক্রবারসহ বন্ধের দিনে অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশি ভিড় থাকে। বাঘ মামার সাথে মশকরা করতে কেউ কেউ নিরাপত্তা জালের ওপর নাড়া দেয়। তীক্ষè শব্দ শুনতে অভ্যস্ত মামা ও মামীও গর্জে উঠে একেবারে খাঁচার কাছে চলে আসে।

তিনি জানান, বাঘ দেখে সবার খুশি বাড়ায় অনেকেই অতি উৎসাহী হয়ে খাঁচার নিরাপত্তা রেলিং টপকে অনেক কাছে চলে যান। তাই বেশি কাছে গিয়ে কেউ যাতে বাঘের থাবায় না যায়, তার জন্য রেলিংয়ের ওপর লোহার জাল দিয়ে দর্শনার্থীদের সাথে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে এতেও কারো উৎসাহ থেমে নেই। বরং জালেই নাড়া দিয়ে যেনো যোগাযোগ করছেন বাঘ-বাঘিনীর সাথে।

ডা. শাহাদাত হোসেন শুভ বলেন, আগে শুধু ভালুক, হরিণ, বানর, পাখি -এসব দেখতেই অভ্যস্ত ছিল দর্শনার্থীরা। কিন্তু এখন কেউ এলেই প্রথমে চলে যান বাঘের খাঁচার দিকে। এরপর পাশের সিংহের খাঁচার কাছে। বাঘ আনার পর থেকে দর্শনার্থী আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন অন্যদিনের তুলনায় সংখ্যাটা আরো বেশি থাকে।

সরেজমিনে দেখা যায়, খাঁচার ভেতর বানানো গাছের ওপর, বসে আছে বাঘ মামা। তখনই চিড়িয়াখানায় মা-বাবার সাথে আসা ৬-৭ বছরের শিশু রাহাত বিস্ময়ে তাকিয়ে বলল, কত বড় বাঘ! সে বলল, ও বাবা, বাঘটা যে এদিকে আসছে। খাঁচার কাছে আসতেই উত্তেজনায় বাবাকে জড়িয়ে মুখ লুকায় সে।

এ সময় রাহাতের বাবা সোলায়মান আলম বলেন, বাচ্চাকে নিয়ে আগেও কয়েকবার চিড়িয়িাখানায় এসেছিলাম। তখন এখানে বাঘ ছিল না। শুনলাম বাঘ এসেছে। সেটা অবশ্য বেশ কিছুদিন আগে। কিন্তু সময় করে উঠতে পারিনি। তাই আজ ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে এসেছি। বাঘ ও সিংহ দেখে খুব ভাল লেগেছে।

একইভাবে চাকরিজীবী আরিফুর রহমানও একমাত্র কন্যাশিশু মিতুকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় এসেছেন বাঘ দেখতে। চিড়িয়াখানায় ঢুকতেই গন্তব্য সোজা বাঘের খাঁচায়। তারপর গভীর মনোযোগ দিয়ে বাঘের গতিবিধি নজরে রাখার কাজটি বেশ উৎসাহের সাথেই করছে ছোট্ট শিশুটিও।

সোলায়মান ও আরিফের মতো এমন আরো অনেকে এসেছেন, শুধু বাঘ আনার খবর পেয়ে। বাঘ, সিংহ, ভালুক দেখেই দিন পার করছেন অনেকে। বাঘ আসায় যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা।

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার কিউরেটর মঞ্জুর মো. মোর্শেদ সিটিজি টাইমস ডটকমকে বলেন, বাঘ ও সিংহ আসার পর চিড়িয়াখানায় যে প্রাণ ফিরে এসেছে তা কখনোই আর লুপ্ত হতে দেয়া যাবে না। তাই প্রাণপ্রাচুর্য্যে ভরিয়ে তুলতে চিড়িয়াখনার সামনে পাখির অভয়ারণ্য তৈরির প্রস্তুতি চলছে। এভিয়ারি পার্কে পাখিদের বৈচির্ত্য দেখতে তখন দর্শনার্থীদের পদচারণা আরো বাড়বে বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত