টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামে বিদেশি ব্যান্ডের মোড়কে বিক্রী হচ্ছে ভেজাল প্রসাধনী

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ২০ জানুয়ারি ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: চট্টগ্রামে বিদেশি র্ব্যান্ডের মোড়কে বিক্রী হচ্ছে ভেজাল প্রসাধনী। ফুটপাত থেকে শুরু করে অভিজাত মার্কেটগুলোতেও বিক্রি হচ্ছে এসব মানহীন পণ্য। এতে প্রতারিত হচ্ছে ক্রেতারা। আক্রান্ত হচ্ছে নানা রকম ত্বক রোগে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশ্বমানের ব্র্যান্ড গার্নিয়ার, লরেল, রেভলন, হেড এ্যান্ড শোল্ডার, লাক্স লোশন, মাস্ক লোশন, এ্যাকুয়া মেরিন লোশন, পেনটিন, নিভিয়া লোশন, ফেড আউট ক্রিম, ডাভ সাবান, ইমপেরিয়াল সাবান। সুগন্ধির মধ্যে হুগো, ফেরারি, পয়জন, রয়েল, হ্যাভক ও কোবরা। অলিভ অয়েল, কিওকারপিন, আমলা, আপটার সেভ লোশন, জনসন, ভ্যাসেলিন হেয়ার টনিক, জিলেট ফোম, প্যানটিক প্রোভি ও হারবাল এ্যাসেনশিয়াল লোশনের নামে ভেজাল প্রসাধনী বিক্রী হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

এ নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা নেই স্থানীয় প্রশাসনের। এ সুযোগে লোভনীয় অফারে ক্রেতাদের কাছে টানছে প্রসাধনীর দোকানগুলো। ক্রেতাদের বোকা বানিয়ে চড়া দামে গছিয়ে দিচ্ছে এসব পণ্য। কিন্তু চকচকে মোড়কের আড়ালে কী কিনছেন এ নিয়ে ভ্রুক্ষেপ নেই কারও।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরীতে এক ডজনেরও বেশি ভেজাল প্রসাধনী কারখানা রয়েছে। নগরীর বাইরে রয়েছে আরও অসংখ্য ভেজাল কারখানা। এসব কারখানার ভেজাল পণ্যে বিদেশি র্ব্যান্ডের মোড়ক মোড়িয়ে বিপণন করা হচ্ছে নগরীর বিপণি বিতানগুলোতে।

নগরীর শপিং-সেন্টারে নামকরা এক দোকান থেকে সাবান, লোশন, ক্রিম, শ্যা¤পু কিনেন হাজেরা তজু ডিগ্রী কলেজের বিবিএ তাহমুনা তৈমুর। কিন্তু লোশনটা যেন কি রকম। বাকী প্রসাধনীর বিষয়েও সন্দিহান, বললেন তৈমুর।

তাহমুনা তৈমুর বলেন, নামকরা এই দোকানে বাইরের জিনিস থাকে। ভেজাল জিনিস থাকবে না বলে মনে হয়। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্যি বিদেশী র্ব্যান্ডের মোড়কে এ দোকানেও বিক্রী হচ্ছে প্রসাধনী। ফুটপাতে ভেজাল প্রসাধনীর মতোই এখন এসব দোকানের অবস্থা। ব্রান্ডেট পণ্যের সাথে ভেজাল সামগ্রীও রাখেন তারা। অবস্থা বুঝে ক্রেতাকে বোকা বানিয়ে বুঝিয়ে দেন ভেজাল সামগ্রী!

সরেজমিনে দেখা যায়, শপিং সেন্টারের কসমেটিকসের অন্য দোকানগুলোতেও সমান ভিড়। দেশে তৈরি পণ্যের পাশাপাশি এসব দোকানে রয়েছে বিদেশি নামকরা ব্রান্ডের পণ্য। জানতে চাইলে এক দোকানের মালিক বলেন, বিদেশিগুলো ইমপোর্ট করি, দেশিগুলো কো¤পানি দিয়ে যায়। তবে এর মধ্যে কি উপাদান আছে, সেগুলো আসল না নকল সেটা স¤পর্কে একদমই ধারণাই নেই আমার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ক্ষতিকারক উপাদানের কসমেটিকস্ উৎপাদন ও বিপণনের মুল জায়গাগুলোর মধ্যে নগরীর রেয়াজুদ্দিন বাজার, আগ্রাবাদস্থ আশপাশের কসমেটিকস মার্কেটের দোকানগুলো অন্যতম। উক্ত স্থানগুলোতে দেখা যায় রাস্তার দু‘ধার এবং দুই-তিন তলা মার্কেটে সারি সারি কসমেটিকসের দোকান। মূলত এ দোকানগুলো থেকে পাইকারি হারে বিক্রি হয় এসব পণ্য। এখানে দেশি, বিদেশি পণ্য যেমন পাওয়া যায় তেমনি পাওয়া যায় তাদের ভাষায় দুই নম্বর কসমেটিকসও। তবে দু‘নম্বরের মধ্যে দেশি-বিদেশি নামকরা ব্রান্ডের পণ্যও রয়েছে।

জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিক্রেতা বলেন, ভেজাল কসমেটিকসের মধ্যে নাই এহেন কোন পণ্য নেই, তবে উল্লেখযোগ্য পণ্যের মধ্যে- পন্ডস পাউডার, সানসিল্ক শ্যা¤পু, ডাভ, হেড এন্ড শোল্ডার, হিমালয়া ফেসওয়াস, তেলের মধ্যে ভাটিকা, কুমারিকা, আমলা এসব আছে। এছাড়া ক্রেতার যেমন আর যে ব্রান্ডই হোক লিস্ট দিলে নিয়ে আসা কোন বিষয়ই নয় তাদের কাছে!

তিনি বলেন, চায়না থেকে উপকরণ আসে। আমরা এখানে তৈরি করি। ফলে মার্কেটের চেয়ে অর্ধেক দামে কিনতে পারবেন এসব প্রসাধনী। ঢাকা, কুমিল্লা, যশোর, রাজশাহী, খুলনা, কুষ্টিয়া, হবিগঞ্জসহ প্রায় সব অঞ্চলেই সাপ্লাই হয় এসব প্রসাধনী। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব পণ্যেরই নির্দিষ্ট ছাঁচ আছে, ছাঁচে ফেলে বিদেশি ব্রান্ডের সাবান থেকে শুরু করে সব পণ্য নকল করা হয়।

স্বাস্থ্য বিভাগের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে যে পরিমাণ কসমেটিকস অর্থাৎ, ক্রিম, শ্যাপু , সাবান, লোশন, আফটার-শেভ লোশন, পারফিউমসহ যেসব পণ্যের চাহিদা রয়েছে তার ১৫ শতাংশ পূরণ হচ্ছে দেশিয় কোম্পানি থেকে। আর ১৫ শতাংশ আমদানি করা হয় দেশের বাইরে থেকে। বাকি ৭০ শতাংশ কসমেটিকস নকল ও ক্ষতিকারক উপাদান দিয়ে তৈরি হচ্ছে। পুরান ঢাকার চকবাজার, জিঞ্জিরা, ইসলামপুরসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে এ ভেজাল কসমেটিকস তৈরির কারখানাগুলো গড়ে উঠেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি ক্লিনিকের চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ সামুশুন্নাহার নিশু বলেন, ভেজাল করার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সুগন্ধিটি ছাড়া বাকিটা ক্ষতিকারক উপাদানে তৈরি। তিনি বলেন, যে পরিমাণ ফরমালডিহাইড থাকলে ক্ষতি হবে না, সেটা অনেক বেশি পরিমাণে হচ্ছে, প্রিজারভেটিভ এবং এন্টি অক্সিডেন্ট ব্যবহারের মাত্রা থাকে অনেক অনেক বেশি। দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পণ্যেও এসব উপাদান ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক নিয়ম মানা হয় না। এসব প্রসাধনী ব্যবহারে প্রথম উপসর্গ হিসেবে রোগীর এলার্জি দেখা দেয়।

এসব পণ্যের ক্ষতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিউটিশিয়ান তানিয়া আলম বলেন, ত্বকাক্রান্ত যেসব মানুষ আমাদেও কাছে আসে তাদের প্রায়েরই মুখে কালো দাগ, র‌্যাশ, গোটা, লালা হয়ে যাওয়া, এলার্জি, অত্যাধিক ঘাম ঝরা অন্যতম। আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে যখন জানতে চাইলে তারা কিছু ক্রিম, লোশনের কথা বলে। যেগুলোতে আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদান থাকে। এই উপাদানগুলোর ইমিডিয়েট এলার্জিক রিয়্যাকশনে মানুষ মারা পর্যন্ত যেতে পারেন। এছাড়া দীর্ঘদিন এসব ব্যবহারে ত্বকসহ কিডনি এবং শরীরে অন্য অংশে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

তিনি বলেন, পণ্যের গুণগতমান সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই ভোক্তার। কারণ, পণ্যের গায়ে ব্যবহৃত উপকরণ সম্পর্কে ভোক্তা জ্ঞানশূণ্য। তাছাড়া পণ্যের গায়ে ও লেভেলে মেড ইন আমেরিকা, জাপান, ফ্রান্স, দুবাই, ইংল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাম লেখা থাকে। অথচ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত নিম্মমানের পণ্যই ওইসব বোতলে ভরে বাজারজাত করেছে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাব্বির রহমান সানি বলেন, ভেজালের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিগত সময়ে নগরীর বিভিন্ন মার্কেট ও দোকান থেকে বিপুল পরিমাণ নকল প্রসাধনী জব্দ করেছে। জরিমানাসহ নানারকম সাজাও দেওয়া হয়েছে বিক্রেতাদের। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত