টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামের অধিকাংশ ইটভাটাই পরিবেশ সম্মত নয়!

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: পরিবেশ দূষণ রোধে সরকার ইটভাটাগুলোকে আধুনিক জিগজ্যাগ পদ্ধতি করার নির্দেশ দেয় ২০১২ সালে। কিন্তু কে শুনে কার কথা। ইটভাটা মালিকরাই যে সরকারি দলের বড় নেতা। এ পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ওপর।

ইটভাটা মালিকরা এমন যে, দেশের বুক ছিড়ে বনের কাঠ পুড়িয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নিবে; তাতে দেশের মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি হলেও কিই বা যায় আসে তাদের। এদিকে সরকারি নির্দেশ পালনের নিমিত্তে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা আইন অমান্যকারী ইটভাটা মালিকদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দিলেও থেমে নেই পরিবেশ ধ্বংসের কার্যক্রম।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রামে ৪০৮টি ইটভাটার মধ্যে মাত্র ৪৩টি ইটভাটা রয়েছে জিগজ্যাগ পদ্ধতির। বাকী সব ইটভাটার একটিও এ পদ্ধতি অনুসরণের প্রয়োজন মনে করেনি। পরিবেশ অধিদপ্তরের যথাযথ তদারকির অভাবে এ পদ্ধতি ব্যবহারে কাক্সিক্ষত সাড়া মেলেনি বলে অভিযোগ পরিবেশবাদীদের।

পরিবেশবাদি সংগঠন বাপা চট্টগ্রামের সদস্য হাবিবুর রহমান জানান, চট্টগ্রামের মধ্যে সবচেয়ে ইটভাটা বেশি রাঙ্গুনিয়ায়। এখানে ইটভাটার সংখ্যা ১৩৭টি। এরপর দ্বিতীয় রাউজান। এখানে ইটভাটার সংখ্যা ৮৫টি। এরপর বোয়ালখালী, হাটহাজারী, সীতাকুন্ড, পটিয়া, সাতকানিয়া, আনোয়ারা, লোহগাড়া, বাঁশখালী উপজেলায়ও ইটভাটা রয়েছে।

তিনি বলেন, ইটভাটার প্রধান উপকরণ কাঠ, পাহাড়ি বালু ও জমির মাটি। আর এসব উপকরণ সহজলভ্যতার উপায় হিসেবে সংরক্ষিত বনের ভেতর গড়ে তোলা হয়েছে ইটভাটা। সেই সাথে আশপাশের ফসলি জমির বুক ছিড়ে তুলে আনছে মাটি। এতে ক্রমেই দুষিত হচ্ছে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য।

তিনি আরও বলেন, এসব ইটভাটার কার্যক্রম সংরক্ষিত বন আইনের আওতায় যেমন পড়ে না। তেমনি পড়ে না কৃষি জমি সংরক্ষণ আইনেও। আর পরিবেশ আইনে তো দেশদ্রোহিতার সামিল। কিন্তু এসব আইন কার্যকরের উদ্যোগ নেই বনবিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের।

বরং অভিযোগ রয়েছে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে চুপ রয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা। এর বাইরে সরকারের নির্বাহী বিভাগও এ আইন প্রয়োগের দায়িত্বে রয়েছেন। বিশেষ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারাও মোটা অঙ্কের টাকায় খান। ভাগ পান থানার ওসিরাও।

আলাপকালে একাধিক ইটভাটার মালিক স্বীকারও করেছেন মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ প্রদানের। যা জেলা প্রশাসক থেকে ইউএনও, পরিবেশ অধিদপ্তর, বনবিভাগ, কৃষি কর্মকর্তা, এমনকি সংবাদত্রের স্থানীয় প্রতিনিধিরাও ভাগ পান।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মকবুল হোসেন ইটভাটার টাকা ভাগ পাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, সরকারি দলের নেতা পরিচয়ে ইটভাটা সমিতি করে প্রভাব খাটান মালিকরা।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০১৫ সালের ‘মার্চের শেষে হাইকোর্ট থেকে নির্দেশনা এসেছে। জিগজ্যাগ পদ্ধতি গ্রহণ না করা মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সূত্র জানায়, জিগজ্যাগ হচ্ছে ইট পোড়ানোর আধুনিক পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে ২৫০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ৮০ ফুট প্রস্থের চুল্লি বানাতে খরচ পড়ে প্রায় সাত কোটি টাকা। আঁকাবাঁকা এ চুল্লিতে থাকে আবার ৫৫ ফুট উচ্চতার একটি চিমনি। যাতে ধোঁয়া ফিল্টার হয়ে পরিবেশে যায়।

এ চুল্লিতে কাঁচা ইটগুলোর জন্য ৪৪ থেকে ৫২টি পর্যন্ত আলাদা চেম্বার থাকে, যাতে ধোঁয়া আঁকাবাঁকাভাবে পানির ওপর দিয়ে বের করা হয়। যাতে বিষাক্ত বা দূষিত বস্তুগুলো পরিবেশে না ছড়িয়ে পড়ে। একটি নির্দিষ্ট সময় পর আবার পানি পরিবর্তন করে দূষণ সৃষ্টিকারী বস্তুগুলো বের করা যায়। আঁকাবাঁকা চুলা দিয়ে ধোঁয়া বের হওয়ার ফলে কমে দূষণের মাত্রা। এ পদ্ধতিতে শুধুমাত্র কয়লার মাধ্যমেই ইট পোড়ানো যায়।

সূত্র আরও জানায়, সরকার ২০১২ সালে জিগজ্যাগ পদ্ধতি ব্যবহারের নির্দেশ দেয় ইটভাটা মালিকদের। রূপান্তরের জন্য প্রথমে ইটভাটা মালিকদের কিছুদিন সময় দেওয়া হয়। এরপর এক লাখ টাকা জরিমানা করে নতুন পদ্ধতি গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। তার পরও কাক্সিক্ষত সাড়া না মেলায় ২০১৪ সালের জুনে দুই লাখ টাকা জরিমানা নির্ধারণ করা হয়। এ কারণে ইটভাটা মালিক সমিতি হাইকোর্টে রিট করে। রিটের আদেশ অনুযায়ী, নতুন আইন বলবৎ করা যাবে ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সাতকানিয়া ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি ফরিদুল আলম বলেন, ‘এ পদ্ধতিতে কয়লার মাধ্যমে ইট পোড়ানো হয় বলে পরিবেশের তেমন ক্ষতি হয় না। তবে কয়লা সহজলভ্য না হওয়ায় প্রয়োজনীয় ইট পোড়ানো সম্ভব হবে না। আবার এ পদ্ধতি ব্যয়বহুলও। তাই এ পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হলে সরকারকে অবশ্যই কয়লায় আমদানি সহজলভ্য করতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ‚গোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল হক বলেন, ‘ইটভাটায় এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হলে পরিবেশে কার্বন নির্গমন কম হবে। কয়লার ব্যবহার হওয়ার কারণে গাছপালার ওপরও চাপ কমবে। চট্টগ্রামে জিগজ্যাগ পদ্ধতির ব্যবহার কম হওয়ার পেছনে গাফিলতি দায়ী। পরিবেশ অধিদপ্তরের উচিত মনিটরিং এবং অভিযান জোরদার করা।’

মতামত