টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

‘বন্দর নগরীর পথে পথে ডাক্তার খানা’

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ১৬ জানুয়ারি ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: চট্টগ্রাম মহানগরীতে এমনিতেই গজে উঠেছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক। যত্রতত্র আছে ডাক্তারের চেম্বারও। এরপরও নগরীর সড়কগুলোতে অভাব নেই ডাক্তার খানার। রোগীও আছে। তবে এসব ডাক্তার খানার রোগীরা একটু অন্যরকম।

যারা প্রধানত যৌন সমস্যা, হাঁপানি, বাত-ব্যথা, ওজন বৃদ্ধি, জন্ডিস ও ডায়াবেটিসসহ নানা দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত। যারা এসব রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল বলে হাসপাতাল বা ক্লিনিকের চিকিৎসকদের কাছে যাওয়ার সাহস করে না। কম ব্যয়ে পথের ডাক্তার খানায় চিকিৎসা নেন এরা।

কম ব্যয় মানে কম খরচ নয়, তুলনামুলক কম হওয়ায় এসব দুরারোগ্যের চিকিৎসা করেন পথের ডাক্তার খানায়। যারা ১০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেন এসব রোগের চিকিৎসায়। তবে হাসপাতাল বা ক্লিনিকের চিকিৎসায় হাজার থেকে লাখ টাকাও খরচ লাগে এসব রোগের চিকিৎসায়।

রোগীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, হাসপাতাল বা ক্লিনিকের চিকিৎসায় যন্ত্রপাতি ও কারখানায় উৎপাদীত ওষুধে হয়। কিন্তু পথের ডাক্তার খানায় চিকিৎসা হয় সম্পুর্ণ গাছ-গাছরা ও লতাপাতায়। যাকে বলা হয় ভেষজ চিকিৎসা।

চিকিৎসকরা রোগীদের বলেন, রাসায়নিকের মিশ্রনে গাছ-গাছরার নির্যাস দিয়েই ডাক্তারি ওষুধ তৈরী হয়। আর আমরা সরাসরি এসব গাছ-গাছরার নির্যাস ওষুধে ব্যবহার করি। ফলে যে কোন চিকিৎসায় তারাতারি উপকারও পাওয়া যায় রোগীরা।

রোগীদের কেউ কেউ ডাক্তার খানার এসব ডাক্তারদের কথায় সায় দিলেও কেউ কেউ উপকার না পাওয়ার কথাও বলেন। যাকে সম্পূর্ণ অপচিকিৎসা বলে আখ্যায়িত করেন হাসপাতাল বা ক্লিনিকে কর্মরত এমনকি চেম্বারের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণও।

চট্টগ্রাম মহানগরের মামস কেয়ার হাসপাতালের চিকিৎসক তাপস নন্দি এ প্রসঙ্গে বলেন, পথের ডাক্তার খানায় এসব কোন চিকিৎসা নয়, অপচিকিৎসা। এখানকার ওষুধে রোগ ভাল হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই, বরং তাতে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্ভাবনা পদে পদে। এসব ওষুধ খেয়ে অনেকের পেটের পীড়া থেকে শুরু করে যকৃৎ ও কিডনির গুরুতর সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বহু। কোন কোন সময় এসব কথিত ওষুধের উপাদান মানুষের শরীরে বিষক্রিয়া ঘটায়। শরীরে মারাত্মক এলার্জির মত হয়। যে অসুখ একসময় নিরাময়যোগ্য ছিল তা এতটাই খারাপ হয় যে প্রচলিত চিকিৎসায় আর ভাল করা যায় না। হাতুড়ে চিকিৎসায় কোন উপকার তো মেলে না, বন্ধ হয়ে যায় আরোগ্যের পথ।

তিনি বলেন, নিম্মবিত্ত শ্রেণীর মানুষেরা এসব ডাক্তার খানায় রোগের চিকিৎসা নিচ্ছেন না বুঝে। এ ব্যাপারে জনগণকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। তারা যেন এসব অপচিকিৎসার ধারে-কাছে না যায়। এভাবে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা করে যারা মানুষকে মৃত্যুঝুঁকিতে ঠেলে দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়াও আবশ্যক বলে মনে করেন তিনি।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানার মোড় এবং আশেপাশে ফুটপাথে প্রতিদিন বসে ডাক্তার খানা। শুধু তাই নয়, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, যোলশহর, জিইসির মোড়, চকবাজার, আন্দরকিল্লা, নিউমার্কেট এলাকা, আগ্রাবাদ, অক্সিজেন, বাকলিয়া, পতেঙ্গাসহ ব্যস্ততম সব সড়কগুলোতে দেখা মেলে এসব ডাক্তার খানা।

যারা শুধুমাত্র একখানা ছোট টেবিলে নানা রকম ওষুধি গাছ ও লতাপাতা সাজিয়ে রাখে। সাথে বাত-ব্যাথার মালিশ, টেবলেট ও যৌন রোগের নানারকম সিরাপের বোতল সাজিয়ে রাখে। আর চেয়ারে বসে থাকেন ডাক্তার সাহেব। সুযোগ পেলেই ধরে ফেলে শিকার।

পথচারী লোকজন, নিম্মবিত্ত মানুষেরা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনেন তাদের কথা। চটকদার কথাবার্তায় মানুষ বিভ্রান্ত হন। সবক্ষেত্রে শতকরা একশ ভাগ সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয়া হয়। এদের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরে মানুষ হন প্রতারিত।

স্বাস্থ্য বিভাগ, সিটি কর্পোরেশন কারও যেন কোন দায়-দায়িত্ব নেই এসব চিকিৎসার নামে মানুষের সাথে প্রতারণা রোধে। কেবল এখানে নয়, এ ধরনের তথাকথিত চিকিৎসক ছড়িয়ে আছে নগরীর অন্যান্য এলাকায়ও। তাদের নেই কোন পেশাগত ডিগ্রি। তারা নিজেরা চিকিৎসক হয়ে বসেছেন।

আলাপকালে এমন এক চিকিৎসক দাবি করেন, তার কাছে এমন ওষুধও আছে যেগুলো সর্বরোগের মহৌষধ, দামও বেশি। তবে কথা বললেই বুঝা যায় যে তাদের নেই প্রাথমিক বিদ্যালয় পাশের জ্ঞানটুকু। তবে সহজ-সরল মানুষদের ঠকানোর ফন্দি-ফিকিরে বেশ দক্ষ।

তিনি জানান, বছরের পর বছর ধরে ফুটপাথে রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। কেউ কখনও বলেননি যে তিনি অপচিকিৎসা করেন। স্বীকার করেন যে তার পড়াশোনা একেবারে কম এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো প্রশিক্ষণ তার নেই। তবে, তিনি দাবি করেন লোকে ভালো ফল পায় বলে চিকিৎসা নেন ফুটপাথে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তথাকথিত এসব চিকিৎসক নিয়মিত এক জায়গায় বসেন না। একেক জায়গায় একেকদিন বসেন। নগরীর সবখানে বিচরণ রয়েছে এদের।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত