টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

পাচার হচ্ছে পাহাড়ি শিশু

চট্টগ্রাম, ১১  জানুয়ারি ২০১৭ (সিটিজি টাইমস)::  বান্দরবানের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরিব সংখ্যালঘু নৃ-গোষ্ঠী শিশুদের পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ১ জানুয়ারি রবিবার রাতে জেলা শহরের একটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে এমন চার আদিবাসী শিশুকে উদ্ধার করে পুলিশ। অভিযোগ উঠেছে, গত কয়েক বছর ধরে একটি স্বার্থান্বেষী মহল এমন অপতৎপরতা চালালেও এ ব্যাপারে প্রান্তিক নৃ-গোষ্ঠীর অভিভাবকদের সচেতনতা তৈরিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

গত ১ জানুয়ারির ওই ঘটনায় বান্দরবান শহরের অতিথি আবাসিক হোটেল থেকে চার আদিবাসী শিশুকে উদ্ধারের পাশাপাশি পাচারচেষ্টার অভিযোগে বান্দরবান বাসস্টেশন এলাকার বাসিন্দা মংশৈ প্রু ত্রিপুরা ওরফে আবু বকর এবং মো. হাসান নামে দুই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

উদ্ধারকৃত শিশুরা হচ্ছে নুসিং উ মার্মা, মেসিং প্রু মার্মা, মং থুইহ্লা মার্মা, মাসিং শৈ মার্মা। তারা জেলার রোয়াংছড়ির বেতছড়া এলাকার বৈদ্যপাড়া, হেডম্যানপাড়া এবং বেতছড়ামুখ পাড়ার বাসিন্দা। এদের বয়স ৯ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে।

পাচার হতে যাওয়া একটি শিশুর অভিবাবক রোয়াংছড়ির হেডম্যানপাড়ার বাসিন্দা অং থোয়াই চিং মার্মা অভিযোগ করেন, ঢাকায় ভালো স্কুলে ভর্তি করানোর কথা বলে আমার সন্তানকে নিয়ে এসেছিল ওরা। পরে তাদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টাও করে।

বান্দরবান সদর থানার এসআই কৃষ্ণ কুমার দাস জানান, উদ্ধারের পর দিন ২ জানুয়ারি সোমবার এই চার শিশুকে আদালতের মাধ্যমে অভিভাবকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এসব শিশু উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ১ম থেকে ৫ম শ্রেণিতে পড়ালেখা করে।

তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় পাচারকারী মংশৈ প্রু ত্রিপুরা ওরফে আবু বকরের ৪দিনের এবং হাসানের ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অভিভাবকদের কাছে ঢাকার ভালো বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করানোর প্রলোভন দেখিয়ে ওই চার শিশুকে গ্রাম থেকে বান্দরবান শহরে নিয়ে আসা হয়। সেখানে একটি আবাসিক হোটেলে তাদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা চালায় পাচারকারীরা। এ খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় শিশুদের উদ্ধার ও এই দুই যুবককে গ্রেফতার করা হয়।

তবে পাচারকারীদের সঙ্গে থাকা রাঙ্গামাটি জেলার রাজস্থলীর বাসিন্দা সুমন খেয়াং নামে এক ব্যক্তি এসময় পালিয়ে যায়। এ ঘটনার সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত আছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। তাদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এই ঘটনায় সদর থানায় মানবপাচার আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন, উন্নত জীবন ও আধুনিক শিক্ষার ব্যাপারে তাদের প্রলোভন দেখিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব শিশুকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এমনকি শিশুদের ধর্মান্তরিত করার অভিযোগও করেছেন কোনও কোনও অভিভাবক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু বান্দরবান থেকে গত সাত বছরে এমন প্রলোভনের শিকার হওয়া অন্তত ৭২টি শিশুকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে ২০১০ সালের ১৩ জানুয়ারি জেলা শহরের অতিথি বোর্ডিং থেকে বৌদ্ধ অনুসারী ৩৩ আদিবাসী শিশুকে উদ্ধার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। এসময় বান্দরবানের গর্ডেন ত্রিপুরা ওরফে রুবেল, ঢাকার দারুল এহসান মাদ্রাসার ছাত্র আবু হোরাইয়া এবং শ্যামলী এলাকার আবদুল গণিকে আটক করা হয়। উদ্ধার করা শিশুদের বাড়ি জেলার থানচি উপজেলার বলিপাড়া এলাকায়। তাদের ঢাকার ধানমণ্ডি আদর্শ মদিনা স্কুলে ভর্তির কথা বলে নিয়ে আসা হচ্ছিল। যদিও এই নামে কোনও স্কুলের অস্তিত্ব নেই বলেই জানা গেছে।

ওই বছরেরই ১ ফেব্রুয়ারি শহরের হাবিব আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে আরও ১৬ শিশুকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় পাচার কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে মোহন ত্রিপুরা নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়। এসব শিশুকে শহরের হাফেজঘোনার বাংলাদেশ ট্রাইবাল অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাপ্টিস্ট চার্চে ভর্তি করার কথা বলে নিয়ে আসা হচ্ছিল যদিও ওই নামে ওই এলাকায় কোনও প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই ছিল না।

এর পর ২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি পুলিশ ও র্যালব বৌদ্ধ ধর্মানুসারী ২১ নৃগোষ্ঠী শিশুকে ঢাকার সবুজবাগের আবুজর গিফারি মাদ্রাসা ও মসজিদ কমপ্লেক্স এবং দাওয়া বাংলাদেশ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ধার করে। পরে তাদের অভিভাবকের কাছে ফেরত পাঠানো হয়।

২০১৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়ি ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ছয় ত্রিপুরা শিশুকে উদ্ধার করে। এসব শিশু জানায়, তাদের সঙ্গে আরও ১৩টি শিশুকে পাচারকারীরা নিয়ে এসেছিল। তবে ওরা কৌশলে চট্টগ্রামেই বাস থেকে নেমে পালিয়ে গেছে। এসময় বিনয় ত্রিপুরা নামে এক পাচারকারীকে আটক করে পুলিশ।

এ ব্যাপারে বান্দরবানের পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায়ের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বান্দরবানের প্রত্যন্ত এলাকার নৃগোষ্ঠী পরিবারগুলো খুবই গরিব। সেখানে ভালো বিদ্যালয়ও নেই। তাই এসব এলাকার অভিভাবকদের কাছে তাদের শিশুদের ঢাকায় ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করানো ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখাচ্ছে পাচারকারীরা। এ ব্যাপারে অভিভাবকদের আরও সজাগ হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

এই ব্যাপারে মানবাধিকার কমিশন বান্দরবান সদর উপজেলা শাখার সভাপতি অং চ মং বলেন, হেডম্যান কারবারিদের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকায় প্রচার চালাতে হবে, অভিবাবকরা সচেতন হলে আদিবাসী শিশু পাচার ও ধর্মান্তকরণ কমে আসবে।- বাংলা ট্রিবিউন

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত