টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

ভূমিকম্পের সর্বাধিক ঝুঁকিতে চট্টগ্রামের স্কুল ভবনগুলো!

চট্টগ্রাম, ১৪ জানুয়ারি ২০১৭ (সিটিজি টাইমস): সাম্প্রতিক জরিপানুযায়ী চট্টগ্রামের স্কুল ভবনগুলো ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে সবচাইতে বেশি। চট্টগ্রামে রিখটার স্কেলে ৭ থেকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে তলিয়ে যাবে নগরীর ৭০ শতাংশ উঁচু ভবন। এর মধ্যে স্কুল ভবনই সবচেয়ে বেশি। ফলে রীতিমত ভূমিকম্পাতঙ্কে রয়েছে এইসব স্কুলের ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট)’র এক গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গবেষণা রিপোটে বলা হয়েছে চট্টগ্রামের স্কুল পড়ুয়া শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

চুয়েটের সাবেক উপাচার্য (ভিসি) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ৭ থেকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে চট্টগ্রাম শহরের নির্মিত ৭০ ভাগ ভবন ধূলিস্যাৎ হয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে স্কুল ভবনগুলো। বিশেষ করে সরকারি বিদ্যালয় ও কেজি স্কুল ভবনগুলো অযত্ন-অবহেলায় রয়েছে। ফলে ভূমিকম্পের শঙ্কার মুখে পড়েছে শিশুরা।

চট্টগ্রামে সাম্প্রতিককালে সংঘটিত ভূমিকম্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ঘটে ১৯৯৭ সালের ২১ নভেম্বর। তখন নগরীর কেন্দ্রস্থল হামজারবাগে অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত একটি পাঁচতলা ভবন ধসে গিয়ে ২৫ জন নিহত হয়। ১৯৯৯ সালের ২২ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত মহেশখালী ভূমিকম্প, ২০০৩ সালের ২৭ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত রাঙামাটির বরকল ভূমিকম্পটিও উল্লেখযোগ্য।

চুয়েটের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপরিকল্পিত ও ত্রুটিপূর্ণ নগরায়ণে এ অঞ্চলে মাঝারি থেকে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে অধিকাংশ ভবনই টিকবে না। অথচ বৃহত্তর চট্টগ্রামে রিখটার স্কেলে ৭ বা ততোধিক মাত্রার শক্তিশালী ভূ-কম্পনের আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু ভূমিকম্প মোকাবিলায় সংশ্লিষ্টদের নেই কোনও কর্মপরিকল্পনা বা প্রাক-প্রস্তুতি।

এদিকে বিশ্বজুড়ে একের পর এক ভূমিকম্পে মানুষ এখন আতঙ্কগ্রস্ত। আর এই আতঙ্ক থেকে বাদ যাচ্ছে না বাংলাদেশের মানুষও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঝেমধ্যে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার যে ভূকম্পন হচ্ছে তা বড় ভূকম্পের ইঙ্গিত। আর এটিই এখন আতঙ্কের বড় কারণ। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে বিশেষ করে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে তা নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে যে চিত্র উঠে আসে তা সত্যিই আঁতকে ওঠার মতো।

ভূতত্ত্ববিদদের মতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভূ-স্তরে ৪টি বিপজ্জনক ফাটল লাইন প্রবল ভূমিকম্পের দিকনির্দেশ করে। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সীতাকুন্ড এলাকা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নগরীর খুলশী, মোহরা, মদুনাঘাট এলাকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।

ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালটেন্ট (ডিসিসি) নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপে বলা হয়, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড টেকনাফ ফল্ট বা ভূফাটল লাইন এবং রাঙামাটির বরকল ফল্ট ও মিরসরাই থেকে টেকনাফ পর্যন্ত দীর্ঘ ভূ-ফাটল লাইন থেকে যে কোন সময় ৬ বা এর ঊর্ধ্বমাত্রায় ভূমিকম্প হতে পারে।

এছাড়া চট্টগ্রাম কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ভূমিকম্প গবেষণা কেন্দ্রের সাম্প্রতিক জরিপ রিপোর্ট অনুসারেও ভূস্তরের পাটাতনে ফাটলের কারণে ইউরেশিয়ান ও ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান প্লেটের ভূমিকম্পের জোনের মধ্যেই রয়েছে চট্টগ্রাম। এ প্লেট দুটি অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এ কারণে সম্প্রতি ঘন ঘন হালকা থেকে মাঝারি মাত্রায় ভূমিকম্প হচ্ছে।

সাদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম আলী আশরাফ  বলেন, ‘অতীতেও এ অঞ্চলে ভয়াবহ মাত্রায় ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল।’

তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পে ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার বেল্ট বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ভূ-পাটাতনের (টেকটোনিক প্লেট) একটি ফাটল বা ফল্ট লাইন চট্টগ্রাম সমুদ্র উপকূল হয়ে আন্দামান পর্যন্ত চলে গেছে। অনেকগুলো ভূ-ফাটল লাইন, ভূমিকম্পের উৎসস্থল (ইপি সেন্টার) চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে কাছাকাছি অবস্থানে সক্রিয় রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ছোট ছোট ভুমিকম্প শক্তিশালী ভূমিকম্পের পূর্বাভাস। যদিও ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে দিনক্ষণ-সময় সুনির্দিষ্ট করে পূর্বাভাস দেয়া আজও সাধ্যের বাইরে। তবে ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগত কিছু আলামত ভূমিকম্পের আলামত বহন করে। যা থেকে আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।’

চুয়েটের সদ্য বিদায়ী ভিসি মো. জাহাঙ্গীর আলম এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘চট্টগ্রামে অপরিকল্পিত ও যথেচ্ছভাবে, গুরুতর ত্রুটিপূর্ণ উপায়ে যেনতেন প্রকারে নির্মিত বাড়িঘর, ভবনের হার শতকরা ৭৮ ভাগ। ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নকশা লঙ্ঘন করে অপরিকল্পিত, ত্রুটিপূর্ণভাবে এসব বাড়িঘর ও ভবন নির্মিত হয়েছে। যা মাঝারি-শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে অধিকাংশ ভবন টিকবে না।’

সিডিএমপির জরিপ মতে, বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ১ লাখ ৮০ হাজার ভবনের মধ্যে ১ লাখ ৪২ হাজার বাড়িঘর, ব্যবসা-বাণিজ্যিক ভবন ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। রিখটার স্কেলে ৭ থেকে ৮ মাত্রার মধ্যে ভূমিকম্প সংঘটিত হলে সেসব ভবন কম-বেশি বিধ্বস্ত হতে পারে।

খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিডিএমপি) আওতায় দেশে প্রথমবারের মতো পরিচালিত একটি ডিজিটাল জরিপের ফলাফলে আইন লঙ্ঘন করে নির্মিত, ঝুঁকিপূর্ণ বসতঘর, বহুতল ভবন সম্পর্কে নাজুক চিত্র বেরিয়ে এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. এএসএম মাকসুদ কামালের জরিপ রিপোর্ট মতে, জনসংখ্যার অব্যাহত চাপে ক্রমবর্ধিষ্ণু চট্টগ্রাম মহানগরীতে অপরিকল্পিত, দুর্বল-ভঙুর, কারিগরি নির্মাণ-ত্রুটি ও ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িঘরসহ বিভিন্ন ধরনের ভবনের হার দেশের অন্যান্য শহর নগরের তুলনায় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।’

বৃহত্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবানসহ বেশকটি শহর ও শহরতলীতে নির্বিচারে পাহাড় টিলা কেটে খুঁড়ে ধ্বংস, গাছপালা সাবাড় করে ফেলা অথবা পুকুর, দীঘি ভরাটের মাধ্যমে রাতারাতি বাড়িঘর, আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন, কল-কারখানা স্থাপন করা হয়েছে ও তা অব্যাহতভাবে চলছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রাম ও এর আশপাশে, নগরীর পুরনো এলাকাগুলোতে জরাজীর্ণ বাড়িঘর এবং অন্যান্য জায়গায় নির্মিত অপরিকল্পিত, কারিগরি বিবেচনায় নির্মাণকাজে মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ এমনকি নিম্নমানের বহুতল আবাসিক ও অফিস, ব্যবসা-বাণিজ্যিক ভবনের প্রকৃত সংখ্যা সিডিএমপির জরিপে বর্ণিত সংখ্যার চেয়েও আরও অনেক বেশি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূগর্ভের শক্তি নিঃসরণের মাত্রা বা চাপের উপর নির্ভর করে ভূমিকম্পের মাত্রা এবং এর ফলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কী হতে পারে এ বাস্তবতার আলোকে ভারতসহ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের দেশসমূহ ভূমিকম্প সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং যাবতীয় নির্মাণকাজে ভূমিকম্প প্রতিরোধক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কিন্তু বাংলাদেশ এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ পিছিয়ে রয়েছে। এমনকি নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করছেন নীতিনির্ধারকরাও।

মতামত