টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

স্বপ্ন দেখিয়েই ওয়াসার বছর পার

চট্টগ্রাম, ১২  জানুয়ারি ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা) একটি প্রকল্পের উদ্বোধনের স্বপ্ন দেখিয়েই শেষ করেছে বিদায়ী বছর ২০১৬। বছরের শুরুতেই ‘কর্ণফুলি পানি সরবরাহ প্রকল্প’নামের এ প্রকল্পের উদ্বোধনের ঘোষণা দেয় ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। এরপর নানানভাবে সময় বাড়িয়ে উদ্বোধনের দিনক্ষণ পেছানো হয়।

চরমভাবে পানি সংকটে থাকা নগরবাসী বুকবেধে এ প্রকল্পের পানির অপেক্ষায় থাকে। তাই প্রকল্পের উদ্বোধনের খবরে সজাগ থেকে নগরবাসী। কিন্তু বছরের শুরুতে উদ্বোধন হতে যাওয়া এ প্রকল্পের উদ্বোধন পুরো বছরেও শেষ হয়নি। তবে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছে চলতি বছরের শুরুতে এ প্রকল্পের উদ্বোধন হতে পারে।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম ওয়াসার ‘কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্পর পানি ২০১৫ সালের ডিসেম্বরেই নগরে যুক্ত হওয়ার কথা ঘোষণা দেয় কর্তৃপক্ষ। এতে নগরীর পানি সমস্যার ৭০ শতাংশ সমাধান হওয়ার কথাও জানানো হয়। ডিসেম্বর আসলে সময় বাড়িয়ে করা হয় ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি। এরপর মার্চ, জুন, সেপ্টেম্বর এবং সর্বশেষ ডিসেম্বর অথবা ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পের উদ্বোধনের ঘোষণা দেয় ওয়াসা। নানা বাহানায় ওয়াসা বারবার প্রকল্পের উদ্বোধনের সময় পেছায়। একইভাবে এ প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ানো হয় দুই দফায়। তবে চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে এ প্রকল্পের পানি নগরীতে আসতে শুরু করে।

ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইঞ্জিনিয়ার একেএম ফজুলুল্লাহ বলেন, কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্পের পানি নগরীতে আসছে। এতে বিভিন্ন জায়গায় সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এটি কিছুদিন টেস্ট্রিং এ রাখা হবে। ত্রুটিগুলো দূর হলে, আমরা মন্ত্রণালয়ে জানাবো। এরপর প্রধানমন্ত্রী কোন একটি নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি উদ্বোধন করবেন। এটি আগামী ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারির প্রথম দিকে হতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজ ২০০৬ সালে শুরু হয়ে ২০০৯ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শুরুতেই প্রকল্পটিতে অশুভ ছায়া ভর করে। যার কারণে বারবার বাড়ানো হয় সময়, বাড়ে ব্যয়ও। এ অবস্থায় কাজের কিছুটা অগ্রগতি হলে গত বছরের শুরু থেকেই প্রচারণায় নামে ওয়াসা।

২০১৫ সালের মার্চে সংবাদিকদের প্রকল্পের মূল পয়েন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। ওয়াসা এমডি ঘোষণা দেন, যে কোন পরিস্থিতিতে ডিসেম্বরের (২০১৫ সালের) আগেই নগরবাসী এ প্রকল্পের পানি পাবে। কিন্তু সময় যখন ঘনিয়ে আসতে থাকে, তখন ওয়াসা কর্তৃপক্ষ সেই আগের বাহানাতেই ফিরে যায়। আবার বলতে শুরু করে নানা সমস্যার কথা। এ অবস্থায় বিভ্রান্ত হতে থাকেন গ্রাহকরা। ২০০৬ সালে ওয়াসা কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প হাতে নয়।

চট্টগ্রাম শহর থেকে ২৮ কিলোমিটার উত্তরে কর্ণফুলী নদীর পারে প্রকল্পটির অবস্থান ঠিক করা হয়। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা-জাইকার আর্থিক সহযোগিতায় এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৬৩ কোটি টাকা। চায়না ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইম্পোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন (সিএনটিআইইসি) ও বেইজিং সাউন্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে (বিএসইইসি) কাজ দেয়া হয়। ২০০৯ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্পের কাজ শুরু করতেই লেগে যায় ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়।

চার বছরেও ঠিকাদার কাজ শুরু করতে না পারায় ২০১০ সালে আবার এ প্রকল্প রিভাইজড বা সংশোধন করা হয়। এতে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয় ১ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রকল্প মেয়াদ অনুযায়ী ২০১২ সালের জুনে কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু দেখা গেছে, এ মেয়াদেও কাজ শুরু করতে পারেনি মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিএনটিআইইসি ও বিএসইইসি। ফলে তারা ২০১১ সালে এসে সাব কন্ট্রাক্টে ওই প্রকল্পের পরিকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশি কোম্পানি প্রজেক্ট বিল্ডার্স লিমিটেডকে (পিবিএল) দেয়।

শর্ত অনুযায়ী ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে তাদের কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে পিবিএল মাত্র ২৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কাজ শেষ করতে না পারায় সাব-কন্ট্রাক্টর পিবিএলকে বরখাস্ত করা হয় এবং চুক্তির নিয়মানুযায়ী ১৪ দিনের মধ্যে প্রকল্প এলাকা থেকে তাদের মালামাল সরিয়ে নিতে বলে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে মামলা ঠুকে দেয় পিবিএল। ফলে বন্ধ হয়ে যায় কাজ। সব সংকট কাটিয়ে ২০১৪ সালে আবার কাজ শুরু করা হয়।

এদিকে গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেকের) সভায় কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্পের আরডিপিপি (২য় সংশোধিত) অনুমোদন দেয়া হয়। একনেকে এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ১৮৪৮ দশমিক ৫২ কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়। যার মধ্যে জাইকা ৯৪০.৩০ কোটি টাকা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ৮৮৪.২২ কোটি টাকা এবং চট্টগ্রাম ওয়াসা ২৪.০০ কোটি টাকা ব্যয় করবে।

উল্লেখ্য, এ প্রকল্পের আওতায় রাঙ্গুনিয়ার পোমরায় দৈনিক ১৪ কোটি লিটার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পানি শোধনাগার, ৬৯ কিলোমিটার ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন পাইপ লাইন এবং তিনটি জলাধার নির্মাণ করার কথা রয়েছে। তিন পর্বে ভাগ করা প্রকল্প কাজের মধ্যে পানি শোধন প্লান্টের কাজ করছে চিনা প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন। নগরীর নাসিরাবাদে জলাধার নির্মাণের কাজ করছে কারিয়ান প্রতিষ্ঠান কোলন গ্লোবাল কর্পোরেশন। আর প্রায় ৬০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানোর কাজ করছে জাপানি দুই প্রতিষ্ঠান কুবুতা ও মারুবিনি কনসোর্টিয়াম।

মতামত