টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

ঘুষ-দূর্নীতির হাট চট্টগ্রামের ভুমি অফিসগুলো!

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ০৮ জানুয়ারি ২০১৭ (সিটিজি টাইমস): : ঘুষ-দুর্নীতির হাট বসেছে চট্টগ্রাম মহানগরীর ভ‚মি অফিসগুলোয়। কোনো রাখঢাক ছাড়া প্রকাশ্যে চলছে ঘুষ লেনদেন। এখানে টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না। নড়ে না ফাইল। টানা দুদিন নগরীর কয়েকটি ভূমি অফিসে সরেজমিন অবস্থান করে দেখা গেছে, ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের ভয়াবহ চিত্র।

সব ভূমি অফিস দালাল পরিবেষ্টিত। তাদের কাছে কোনো কাজই অসাধ্য নয়। জমির বৈধ মালিক যেই হোক, চাহিদামতো টাকা এবং দাগ খতিয়ান নম্বর দিলেই তা হয়ে যায় অন্যের। আবার বৈধ কোনো কাজে গিয়েও প্রকৃত ভ‚মি মালিকদের হতে হয় হয়রানির শিকার।

নামজারির জন্য যেখানে সরকার নির্ধারিত ফি ২৫০ টাকা, সেখানে ১৫ হাজার টাকার নিচে কোনো কাজে হাতই দেয় না কেউ। প্রত্যেকটা ভ‚মি অফিসে দালালের উৎপাতে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ।

দালাল-কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই মিলে গড়ে তুলেছে বিরাট সিন্ডিকেট। কোনো লুকোচুরি নেই, কোনো লাজলজ্জা, ভয়ভীতির বালাই নেই। এমনভাবে ঘুষের দরদাম করা হয় যেন এ তাদের ন্যায্য পাওনা।

ভ‚মি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ সাম্প্রতিক সময়ে নগরীর একাধিক ভূমি অফিস আকস্মিক পরিদর্শন করে ঘুষের হাটের ভয়াবহ চিত্র প্রত্যক্ষ করেন। ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শাসান। ঘুষখোর ১ কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক সাময়িক বরখাস্ত এবং ২ জনকে শোকজ ও শাস্তিমূলক বদলি করেন। কিন্তু তারপরও অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপারে ভ‚মি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মন্ত্রী কঠোরভাবে সতর্ক করলেও নগরীর তিন সার্কেলের অধীনে থাকা ৯ ভ‚মি অফিসের কোনোটিরই চিত্র পাল্টায়নি। যথারীতি আগের মতোই চলছে ঘুষের মহোৎসব।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দ্বিতীয় তলা ছাড়া প্রতি তলাতেই গিজগিজ করছে লোকজন। পাঠানপাড়া থেকে আসা জাকির হোসেন গোমড়া মুখে এ কক্ষ থেকে ও কক্ষে ঘুরছিলেন। কাকুতি-মিনতি করছিলেন তার কাজ করে দেয়ার জন্য।

তিনি জানান, তার ৯ শতক জমি অন্য এক লোক নিজের নামে নামজারি করে ফেলেছে। তিনি নারাজি দিয়েছেন। তদন্ত রিপোর্টের জন্য দাবি মতো ৫ হাজার টাকা ঘুষ দিয়েছেন। তবুও কাজ না করে চার মাস ধরে ঘোরাচ্ছে। অপরপক্ষ দেড় লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছে। তাই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তার পক্ষে কাজ করছে।

বিবিরহাট থেকে আসা আবদুল মালেক জানান, তার চাচা চান্দগাঁও এলাকায় ১৬ শতক জমি কিনেছেন। বছরে খাজনা আসে ২ হাজার টাকা। কিন্তু ভ‚মি অফিসের লোকজন দাবি করছে ওই দাগে যে কয়েকশ শতক জমি আছে সেসব জমিও হিসেবে ধরে প্রায় লাখ টাকা খাজনা দিতে হবে। দেন-দরবারের পর এখন বলছে সব ম্যানেজ করবে কিন্তু ৩০ হাজার টাকা লাগবে। ভ‚মি অফিসের বাইরে ঘুর ঘুর করছিলেন ফোরকান নামে এক দালাল। পরিচয় গোপন করে শুল্কবহরের একটি বিরোধপূর্ণ জমি নিজের নামে করা যাবে কিনা জানতে চাইলে সে জানায়, এটা কোনো ব্যাপার নয়। জমি যারই হোক, দলিল সঠিক হোক বা ভুয়া হোক, যে কারও নামে করে দেবে সে। টাকা লাগবে জমির ধরন বুঝে। উদাহরণ দিয়ে সে জানায়, মুরাদপুরে এন মোহাম্মদ প্লাস্টিক কারখানার পাশে হাঁচি কলোনিতে এভাবেই সে সাতকানিয়ার এওচিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আহমদুল হকের নামে নামজারি করে দিয়েছিল।

ষোলশহরে ২০-২৫ দালাল সক্রিয় রয়েছে। ভূমি অফিসের ঠিক বিপরীত পাশে রাস্তার ওপারে চিটাগাং শপিং কমপ্লেক্সের নিচতলায় ফ্যামিলি ফেয়ার অ্যান্ড ফাস্টফুড এবং আলভি ফুড সেন্টার নামে দুটি চা নাস্তার দোকানে দালালদের জটলা।

জমিজমা সংক্রান্ত কাজে আসা লোকজনকে দালালরা ধরে এখানে নিয়ে আসে। চা নাস্তার ফাঁকে চলে লেনদেন।

ভূমি অফিসের ভেতরেও একটি চা দোকান রয়েছে। দোকানটি অবৈধভাবে বসিয়েছেন মুহুরি। সেখানেও দালাল এবং লোকজনের জমজমাট আড্ডা। লেনদেনও চলে। চা দোকানে বসা কিশোর সুমনের কাছে জানতে চাওয়া হয়, জমির একটা কাজ করতে হবে। কাকে দিয়ে করালে ভালো হয়।

সুমন জানায়, টাকা দিলে জসিম এবং দিদার নামে দুই দালাল সব কাজ করে দেবে। তাদের সঙ্গে এসি ল্যান্ড, তহশিলদারসহ সব স্যারের ভালো স¤পর্ক। এছাড়া ভূমি অফিসের এমএলএসএস লিয়াকতও এসব কাজ করে।

ষাটোর্ধ্ব আবদুল মান্নান ও নজরুল ইসলাম বলেন, ভ‚মি অফিসের দেয়ালও ঘুষ খায়। তহশিলদার ও কর্মচারীরা দিনে কয় লাখ টাকা যে ঘুষ নেয় আল্লাহ জানে। উপরের কর্মকর্তাদের কাছেও এর ভাগ যায়। নামজারি করাতে গেলে সরকার নির্ধারিত ফি ২৫০ টাকা। ষোলশহর ভূমি অফিসে দুদিন অবস্থান করে নামজারি করতে আসা প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা সর্বনিম্ম ১৫ হাজার টাকা এবং অনেকে এর চেয়েও বেশি দিয়েছেন। আরও বেশি হয়রানির ভয়ে এরা নাম প্রকাশে রাজি হননি।

প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেন এবং হয়রানি প্রসঙ্গে ষোলশহর ভূমি অফিসের তহশিলদার নিজাম উদ্দিন আহমদ জানান, তিনি যোগ দেয়ার পর থেকে পরিবেশ অনেক ভালো হয়েছে। দালাল অনেক কমেছে। এর বাইরে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি এসি ল্যান্ডের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) রেজাউর রহমান জানান, কিছুদিন আগে ৪ দালালকে বের করে দিয়েছি। আবেদনকারী সরাসরি না আসলে কথা বলি না। আগে এক ডেটে ৪টির বেশি শুনানি হতো না, এখন ৬৭টি পর্যন্ত শুনানি করি। নতুন ভ‚মি প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক অভিযান ভালো ফল দিচ্ছে। এখন কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সমস্যা হল জমি মালিকরা নিজেরা না এসে মুন্সিকে পাঠায়, মুন্সি গিয়ে তাকে বলে ২ লাখ টাকা লাগবে। আবার বাইরে দালালদের খপ্পরে পড়ছে অনেকে।

ভূমি অফিসে কর্মরত এক কর্মকর্তা জানান, চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১১টি ভূমি অফিস। এসব অফিসে পোস্টিং পেতে একজন তহশিলদারকে কমপক্ষে ২০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। পোস্টিং পেয়ে তারা সেই টাকা দু-তিন মাসের মধ্যে তুলে ফেলেন। দেখা যায়, নগরীতে কর্মরত তহশিলদাররা ঘুরেফিরে নগরীতেই থেকে যান। উপজেলায় বদলি ঠেকিয়ে দেন।

ভুক্তভোগীরা জানান, ষোলশহর, বাকলিয়া, সদরঘাট ছাড়াও নগরীতে ভূমি অফিস আছে আরও ৬টি। এগুলো হল নন্দনকানন, কাট্টলী, হালিশহর, পতেঙ্গা, চান্দগাঁও এবং চট্টেশ্বরী রোডে সদর ভূমি অফিস। গত এক সপ্তাহে প্রতিটি ভূমি অফিস সরেজমিন পরিদর্শনকালে কোথাও ভিন্ন চিত্র দেখা যায়নি। সব কটি অফিসেই চলছে ঘুষের প্রকাশ্য কারবার। দালাল এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাপটে অসহায় সাধারণ মানুষ।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত