টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামের বিভিন্ন হোটেলে খাওয়ানো হচ্ছে দূষিত পানি!

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ০৬ জানুয়ারি ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: পেটের ক্ষিধে মেটাতে বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় এক নাস্তা খেতে ঢুকেন তানভির মাসুম (৩৫)। নাস্তা খাওয়ার পর পানি চাইলে হোটেল বয় বলেন, বোতলজাত পানি আনবে কি না। না বলায় হোটেল বয় দেখিয়ে দেন টেবিলে রাখা পানি।

কিন্তু সেই পানি লালচে দেখে গ্লাস পরিস্কার করে তা বদলে দেওয়ার জন্য বললে হোটেল বয় চুপ। আরও কয়েকবার বলার পর পরিস্কার পানি না দেওয়ায় রেগে যান তানভির মাসুম। শেষ পর্যন্ত হোটেল বয় জবাবে বলেন, পরিষ্কার পানি হবে বোতলের; আর হবে না।

অবশেষে রেগে দাত কটমট করে পানি না গিলেই বেরিয়ে গেলেন তানভির মাসুম। বিষয় কি জানতে চাইলে তানভীর মাসুম বলেন, কি আর ভাই; এই দেশে জন্ম নেওয়ায় যে পাপ হয়েছে তার প্রায়শ্চিত্ত করছি। নানা অনিয়ম আর নৈরাজ্যের মধ্যে হাবুডুবু যেমন খাচ্ছি। তেমনি হরহামেশায় গিলছি বিষাক্ত ভেজাল খাবার। হোটেলেও খাওয়ানো হচ্ছে মারাত্মক দুষিত পানি।

বিশুদ্ধ পানি মানে বোতলজাত পানি। যা কিনে খেতে হবে। শুধু তাই নয়, পানি খাওয়ার গ্লাসগুলোও মনে হয় কোন দিন পরিস্কার করেনি। কি লালচে। দেখলে বমি আসে। আরও নাকি অভিজাত বিশুদ্ধ খাবারের বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হোটেল চৌরঙ্গি।

তানভীর মাসুমের বকবকানি শুনে আশপাশের লোকজন নানা মন্তব্য শুরু করেন। বেশিরভাগ লোকই বলেন, চৌরঙ্গি কেন? চট্টগ্রামের অধিকাংশ হোটেলেই অপরিস্কার-অপরিচ্ছন্ন খাবার বিক্রীর পাশাপাশি খাওয়ানো হচ্ছে দুষিত পানি। এগুলো খেতে না চাইলে কিনে খেতে হয় বোতলজাত পানি। যাও বিশুদ্ধ নয়।

লালচে দুষিত পানি খাওয়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে হোটেল চৌরঙ্গির ম্যানেজার মো. ইউনুচ সিটিজি টাইমস ডটকমকে বলেন, ওগুলো দুষিত নয়। তবে একটু লালচে হয়েছে আর কি। এরপর আরও কয়েকটি প্রশ্নে উত্তেজিত হয়ে তিনি বলেন, ফ্রিতে ভাল পানি পাইলে তো ভাই কিনে খাবে না কেউ। ব্যবসা করার জন্য বসছি। ১৫ টাকায় হাফ লিটার পানি কিনলে ৫ টাকা লাভ হবে। লাভ না করে সেবা করবে কে; বলুন?

হোটেলে খেতে আসা লোকজনের অভিযোগ, চৌরঙ্গিসহ চট্টগ্রামের সবকটি হোটেলে দুষিত পানি দিয়ে বিভিন্ন রকমের খাবার ও চা-নাস্তা তৈরী করা হয়। আগে ওয়াসার পানি খাওয়ানো হলেও এখন নদী নালার পানি খাওয়ানো হচ্ছে হোটেলে খেতে আসা মানুষদের। যা খেয়ে মানুষ নানারকম মারাত্মক পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শফিউল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, হোটেল-মোটেলে দুষিত পানি গ্রহণের ফলে সাধারণ মানুষ রক্ত ডায়রিয়া, রক্ত আমাশয়, জন্ডিস ও ডায়াবেটিসের মতো মারাতœক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। চট্টগ্রামে নানা রোগে আক্রান্ত মানুষের ৭০ ভাগই পানিবাহিত রোগে ভুগছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তর এ বিষয়ে দেখার কথা থাকলেও তা দেখছে না।

চট্টগ্রাম মহানগর পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মকবুল আহমেদ বিষয়টি না দেখার কথা সঠিক নয় উল্লেখ করে বলেন, বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরদারিতে রয়েছে। নগরীর হোটেল ও রেস্টুরেন্টে ব্যবহৃত খাবার পানি পরীক্ষায় মাত্রাতিরিক্ত কলিফর্ম নামক এক ধরণের জীবাণু’র উপস্থিতি শনাক্ত করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। নগরীর বেশ কয়েকটি হোটেল ও রেস্টুরেন্টের ব্যবহৃত খাবার পানির নমুনা সংগ্রহ ও তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এই জীবাণু’র উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, গত অক্টোবর মাসে মহানগরীর ৫৬টি হোটেল ও রেস্টুরেন্টের ব্যবহৃত খাবার পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরিবেশ অধিদপ্তর। পরে সংগৃহীত পানি তাদের গবেষণাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ২২টি হোটেল ও রেস্টুরেন্টকে দূষণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এসব হোটেল ও রেস্টুরেন্টের ব্যবহৃত খাবার পানিতে মাত্রাতিরিক্ত কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি রয়েছে বলে অভিযোগ পরিবেশ অধিদপ্তরের।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানান, নিয়মিত নগরীর হোটেল-রেস্তোরার পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এক্ষেত্রে যেসব হোটেলের পানিতে কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যাচ্ছে তাদের নোটিশ প্রদান এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে শাস্তি প্রদান করা হয়ে থাকে।

চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবুল বাসার বলেন, ‘যেখানে ক্ষতিকারক কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে প্রথম ধাপে আমরা তাদেরকে নোটিশ দিয়ে সতর্ক করি। আর যদি এমন হয় যে হোটেলটি ক্রমাগত একই ধরনের অপরাধ করছে সেক্ষেত্রে আমাদের সদর দফতরে যে এনফোর্সমেন্ট টিম আছে তাদের মাধ্যমে এটি বন্ধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।’

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত