টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামে বাড়িভাড়া বৃদ্ধিতে যেন একজোট বাড়ির মালিকরা!

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ০৩ জানুয়ারি ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: চট্টগ্রামে আবাসিক এলাকাগুলোর বাসায় বাসায় প্রতিবছরের মতো ভাড়া বাড়ানোর তাগিদ চলছে। বাড়িভাড়া বৃদ্ধিতে যেন একজোট বাড়ির মালিকরা। আছে মালিকদের কল্যাণ সমিতিও। যাদের দাপটের কাছে একেবারে অসহায় ভাড়াটিয়ারা।

বাড়ির মালিকদের বুকে একটাই সাহস। ভাড়াটিয়ার অভাব নেই। তাই বর্ধিত ভাড়াসহ তাদের ইচ্ছেমতো না চললে সোজা বলেন-বাসা খালি করেন। শুধু কি তাই, বর্ধিত ভাড়া না দেওয়ায় বাড়ির মালিক ও ছেলেদের মারধরের সম্মুখীনও হয়েছেন ভাড়াটিয়া।

চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকার মোহাম্মদপুর আবাসিক এলাকার বাসিন্দা দুলাল মিয়া(৩৯) ভাড়া বাড়াতে অস্বীকার করায় বাড়ির মালিকের তিন ছেলে বেদম পিটুনি দেন। দুলাল মিয়া বলেন, ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে ব্যবসার কারনে মোহাম্মদপুর আবাসিক এলাকায় ১১ হাজার টাকায় হাজী ভবনের চার তলায় বাসা ভাড়া নিই। দুই মাসের ভাড়া অগ্রিম জমা নেন বাড়ির মালিক হাজী নজরুল ইসলাম।

কিন্তু ২০১৫ সালের ডিসেম্বরেই এক হাজার ৫০০ টাকা ভাড়া বাড়িয়ে দেয়। এ নিয়ে আপত্তি করলে মালিকের তিন ছেলে মারধর করে। শেষমেষ বাসা ছেড়ে দিয়ে চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় ১২ হাজার ৫০০ টাকায় ভাড়া বাসা নিই। সেখানেও এক বছর যেতে না যেতে দেড় হাজার টাকা ভাড়া বাড়িয়েছে।

নাসিরাবাদ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ডা. কাউছার আলম জানান, পেশাগত কারণে চট্টগ্রাম শহরে ভাড়া বাসায় থাকি দীর্ঘ ৮ বছর ধরে। কিন্তু বছর ঘুরতেই বাসা ভাড়া বাড়িয়ে দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিবছর ভাড়া বাড়াচ্ছে বাড়ির মালিকরা।

সুগন্ধা আবাসিকের বাসিন্দা জগলুল হুদা জানান, চাকরির কারনে শহরের বাসিন্দা আমি। কিন্তু বাসা ভাড়ার কারনে সংসারে অভাব আর অভাব। বেতন যা পাই তার তিনভাগের দুই ভাগ বাসা ভাড়ায় চলে যায়। তম্মধ্যে বাজারে নিত্যপণ্যের দামেও উর্ধ্বগতি। এতে সংসারে টানাপড়েন লেগেই আছে বলে জানান তিনি।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বিষয়ক সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সূত্র জানায়, গত ১০ বছরে চট্টগ্রামে বাড়িভাড়া বেড়েছে তিনগুণ। ১০ বছর আগে যে বাসা ভাড়া ৬ হাজার টাকা ছিল তা এখন ১৮ হাজার টাকায় উঠেছে। সে হিসেবে একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ।

সূত্র জানায়, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে ২৫ বছর আগে আইন হলেও বিধিমালা হয়নি। নেই আইনের প্রয়োগও। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ কমিশন গঠনের জন্য সর্বোচ্চ আদালত রায়ও দিয়েছিলেন। দেড় বছর পেরোলেও সেই কমিশন এখনো গঠিত হয়নি। এ সুবাধে বছর ঘুরতেই বাড়ি ভাড়া বাড়াচ্ছে মালিকরা।
তবে নাসিরাবাদ আবাসিকের বাড়িওয়ালা ফয়েজ উদ্দিন বলেন, নির্মাণসামগ্রী, রক্ষানবেক্ষণসহ সবকিছুর দাম বাড়ছে। বাড়িভাড়া বাড়বে না কেন? বাস্তবতার সঙ্গে সংগতি রেখেই বাড়িভাড়া বাড়ানো হচ্ছে। তবে বাড়িভাড়া নির্ধারিত থাকলে সে হারেই ভাড়া নিতেন বলে জানান তিনি।

ক্যাবের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদ কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী এ প্রসঙ্গে বলেন, নির্মাণসামগ্রী, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার অজুহাতে বাড়িভাড়া বাড়ানোর বিষয়টিও অযৌক্তিক। ভাড়াটেদের চাহিদার সুযোগ নিয়ে বাড়ির মালিকেরা ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, সরকার কখনোই ভাড়াটেদের পক্ষে ন্যায্য পদক্ষেপ নেয়নি। ১৯৯১ সালের যে বাড়িভাড়া আইন আছে, সেটিও কার্যকর নেই।

তিনি বলেন, কেবল মাসিক ভাড়া নয়, অগ্রিম হিসেবেও দুই থেকে তিন মাসের ভাড়া নিচ্ছেন বাড়ির মালিকেরা। যা বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশের পরিপন্থি। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ-স¤পর্কিত অধ্যাদেশটি প্রথম জারি করা হয় ১৯৬৩ সালে। বর্তমানে প্রচলিত বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনটি ১৯৯১ সালের। কিন্তু সরকার এখনো এই আইনের বিধি করেনি।

আইনে বলা হয়েছে, কোনো ভাড়াটের কাছে জামানত বা কোনো টাকা দাবি করতে পারবেন না বাড়িওয়ালা। এক মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়া যাবে না। প্রতি মাসে ভাড়া নেওয়ার রসিদ দিতে হবে, নইলে বাড়িওয়ালা অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন। দুই বছর পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো যাবে না। ভাড়াটেদের স্বার্থরক্ষায় এমন আরও অনেক কথাই উল্লেখ আছে এই আইনে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই।

বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ কার্যকর করতে ২০১০ সালে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিল। রিট আবেদনের পক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, আইনটি বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। আদালতের মাধ্যমে ভাড়া-সংক্রান্ত বিরোধ নি®পত্তির কথা আইনে বলা আছে।

এইচআরপিবির রিট আবেদনটির পরিপ্রেক্ষিতে রুল ও চ‚ড়ান্ত শুনানি শেষে গত বছরের ১ জুলাই আদালত রায় দেন। রায়ে বলা হয়, বিদ্যমান আইনটি কার্যকর না হওয়ায় ভাড়াটেকে সুরক্ষা দেওয়া যাচ্ছে না। আইনটি কার্যকরে রাষ্ট্রকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে; অন্যথায় সাধারণ মানুষ এ থেকে পরিত্রাণ পাবে না।

রায়ে সারা দেশে এলাকাভেদে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ম বাড়িভাড়া নির্ধারণের জন্য সরকারকে একটি উচ্চক্ষমতাস¤পন্ন কমিশন গঠনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। রায় ঘোষণার ছয় মাসের মধ্যে কমিশন গঠন করতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। কিন্তু রায় ঘোষণার দেড় বছর পেরোলেও বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ কমিশন গঠিত হয়নি।

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, আমরা আশা করেছিলাম কমিশন গঠন হলে ভাড়াটেরা অর্থনৈতিকভাবে যে নি®েপষিত হচ্ছেন, তা বন্ধ হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেড় বছর হলেও রায়ের কপি পাইনি। আশা করছি সরকার দ্রæত একটি কমিশন করে ভাড়াটেদের স্বার্থ রক্ষা করবে।

রায়ে আরও বলা হয়েছিল, কমিশনের সুপারিশ প্রতিবেদন আকারে আসার আগ পর্যন্ত সরকার আর্থিক সক্ষমতা সাপেক্ষে প্রতি ওয়ার্ডে ভাড়া নিয়ন্ত্রক (রেন্ট কন্ট্রোলার) নিয়োগের উদ্যোগ নেবে। সেই নির্দেশনাটিরও বাস্তবায়ন হয়নি।

ন্যায্য বাড়িভাড়ার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে বিভিন্ন সংগঠন। চট্টগ্রাম ভাড়াটিয়া স্বার্থ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি মনজুরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, বাড়িভাড়া নিয়ে দেশে যে অরাজকতা চলছে, রায় কার্যকর হলে তা বন্ধ হত। কিন্তু দেড় বছরেও তা না হওয়ায় ভাড়াটেদের স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে না।

তিনি বলেন, প্রতিবছরই বাড়িওয়ালাদের ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়ছে। আমরা ভাড়াটেরা নিরুপায়। নতুন বছর এলেই ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য শুরু হয়। ভাড়াটেদের স্বার্থ দেখার মতো এ দেশে কেউ নেই।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত