টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

বাংলাদেশে ফেসবুক ইউটিউবের ব্যবসা বাড়ছে

চট্টগ্রাম, ০২ জানুয়ারি ২০১৭ (সিটিজি টাইমস):: ফেসবুক-গুগল-ইউটিউব খুললেই ভেসে ওঠে দেশীয় কোম্পানির বিজ্ঞাপন। নিজেদের পণ্য ও সেবার প্রচারে দেশীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে এখন এ প্ল্যাটফরমে (ডিজিটাল) বিজ্ঞাপন প্রচারে আগ্রহ বাড়ছে। আর এর মধ্য দিয়ে বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের এসব বৈশ্বিক জায়ান্ট। যদিও বাংলাদেশে কোনো ধরনের নিবন্ধন ও বিনিয়োগ নেই প্রতিষ্ঠানগুলোর। অর্জিত আয় থেকে কর দিচ্ছে না সরকারকেও। এমনকি বাংলাদেশে আইনি কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর।

যদিও অন্যান্য দেশে নীতিমালার মধ্যে থেকেই ব্যবসা করছে ফেসবুক, ইউটিউব ও গুগল। পার্শ্ববর্তী ভারতেও সেখানকার রেজিস্ট্রার অব কোম্পানিজে (আরওসি) নিবন্ধনের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে ফেসবুক। দেশটিতে রয়েছে তাদের নিজস্ব অফিস ও জনবল। ভারতে অর্জিত আয় থেকে সে দেশের সরকারকে নির্দিষ্ট হারে করও পরিশোধ করছে ফেসবুক। গত অর্থবছরও ভারতে ১৬ কোটি রুপি মুনাফার ওপর ৩৩ শতাংশ হারে কর পরিশোধ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। দেশটিতে একই নিয়মনীতি মেনে ব্যবসা করছে ইউটিউব-গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান।

ইন্টারনেটে কনটেন্ট সরবরাহের মাধ্যমে আয় হয় এমন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কর আদায় করছে ইন্দোনেশিয়া। শুধু ২০১৫ সালের জন্য কর বাবদ প্রায় ৪২ কোটি ডলার ইন্দোনেশিয়া সরকারকে পরিশোধ করছে গুগল। আর ‘ইউটিউব ট্যাক্স’ নামে কর চালু করতে যাচ্ছে ফ্রান্স। দেশটির আইনসভায় এরই মধ্যে এটি পাস হয়েছে।

বাংলাদেশেও এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম একটি নীতিমালার আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে কোনো ধরনের আইনি কাঠামো ছাড়াই ফেসবুক, ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা করছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম একটি নীতিমালার আওতায় আনা প্রয়োজন। শিগগিরই এ ব্যাপারে একটি নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেবে বিটিআরসি।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এখনই দেশে ইন্টারনেটভিত্তিক বিজ্ঞাপন বাজারের আকার ১ হাজার কোটি টাকার বেশি। ক্রমেই বড় হচ্ছে এ বাজারের আকার। সেই সঙ্গে বাড়ছে ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব, অ্যালেক্সার মতো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা। কোনো ধরনের কর পরিশোধ ছাড়াই অর্জিত এ অর্থ দেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে তারা।

ফেসবুক-ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা একটি নীতিকাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা সরকারের দায়িত্ব বলে মনে করেন অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এএএবি) সভাপতি রামেন্দু মজুমদার। তিনি বলেন, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ব্যবসা করুক, আমরাও সেটা চাই। তবে সরকারও যেন রাজস্ব পায়। সামগ্রিকভাবে এ ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্রগুলো আরো সংগঠিত হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের স্বার্থেই সেটা হওয়া উচিত।

এ ধরনের লেনদেনের নীতিমালা না থাকায় বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোকেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে জানান রামেন্দু মজুমদার। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমাদের বিজ্ঞাপনী সংস্থা থেকে একজন ক্লায়েন্টের জন্য ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। এর বিপরীতে দেশের বাইরে অর্থ পরিশোধ করতে সমস্যায় পড়তে হয়। আমরা যথাযথ উপায়ে করলেও অনেকে এটা নাও করতে পারে। সরকারের নীতিগত কাঠামোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারলে এ ধরনের সমস্যা এড়ানো যেত।

এর আগে দেশী কোম্পানিগুলোর বিদেশী টেলিভিশন চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচার বাবদ বড় অংকের অর্থ দেশের বাইরে চলে যেত। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মালিকরা এ নিয়ে আপত্তি তোলার পর সম্প্রতি তা বন্ধ হয়েছে।

ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের আওতায় রয়েছে ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন ও ডিজিটাল অ্যাডভার্টাইজিং। বিভিন্ন ওয়েবসাইটে নিবন্ধিত গ্রাহককে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এর বিনিময়ে নিবন্ধিত গ্রাহককে বিশেষ কিছু সুবিধা দিয়ে থাকে এসব প্রতিষ্ঠান। সাধারণভাবে অ্যালেক্সায় ওয়েবসাইটের র্যাংকিংয়ের নানা তথ্য বিনামূল্যেই দেখার সুযোগ পায় যে কেউ। তবে বিশ্লেষণমূলক সেবা পেতে প্রতিষ্ঠানটিকে দিতে হয় নির্দিষ্ট অংকের অর্থ।

ডিজিটাল মিডিয়ার কনটেন্ট ব্যবহার হয় মূলত চার ধরনের— টেক্সট, সেলফোন অ্যাপ্লিকেশন, গ্রাফিকস ও ভিডিও বা অ্যানিমেশন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় টেক্সট ও স্ট্যাটিক গ্রাফিকস। টেক্সটের মধ্যে রয়েছে হালনাগাদ তথ্য। আর স্ট্যাটিক গ্রাফিকসের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ছবি, ইনফোগ্রাফিকস ও কমিক চিত্র। ভিডিওর ক্ষেত্রে প্রথম ২০-৩০ সেকেন্ড দর্শককে আকৃষ্ট করার বিষয় রয়েছে। এ সময়ের মধ্যেই বিষয়টি সম্পর্কে আগ্রহী করে তুলতে হয় দর্শককে, যাতে পুরো ভিডিওটি তারা দেখতে চায়।

ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে ব্যয়ের শীর্ষে রয়েছে দেশের টেলিকম খাত। রায়ানস আর্কাইভের তথ্যমতে, এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আবার ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করছে গ্রামীণফোন। ব্যয়ের দিক দিয়ে এর পরে রয়েছে যথাক্রমে বাংলালিংক, রবি ও টেলিটক।

জানতে চাইলে গ্রামীণফোনের হেড অব ডিজিটাল অ্যান্ড সোস্যাল মিডিয়া জাকিয়া জেরিন বলেন, ডিজিটাল মিডিয়ায় যেতে বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। এর কারণ দেশের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনো সেবাটির বাইরে রয়ে গেছে। তবে দ্রুতই এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। দেশের তরুণরা ডিজিটাল মিডিয়ার প্রতি ক্রমেই আগ্রহী হয়ে উঠছে।

ভোগ্যপণ্য উত্পাদন ও বিপণনকারী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানও ডিজিটাল প্লাটফরমে বিজ্ঞাপন বাবদ বড় অংকের অর্থ ব্যয় করে। অনলাইন বিজ্ঞাপনে ব্যয়ের দিক দিয়ে এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এগিয়ে আছে ইউনিলিভার, পিঅ্যান্ডজি, কোকাকোলার মতো প্রতিষ্ঠান। একইভাবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও ডিজিটাল প্লাটফরমে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাণ, পারটেক্স, স্কয়ার, আবুল খায়ের ও আকিজ গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠান।

ক্ল্যাসিফাইড বিজ্ঞাপন প্রদর্শনকারী প্রতিষ্ঠানও অনলাইনের মাধ্যমে তাদের সেবার বিজ্ঞাপন দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। রকেট ইন্টারনেট, এখানেই ডটকম, বিক্রয় ডটকম, সহজ ডটকম প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান এ প্লাটফরমে বিজ্ঞাপন প্রদর্শনে বড় ধরনের ব্যয় করে। ছোট ছোট অনেক প্রতিষ্ঠানও তাদের বিজ্ঞাপন এ প্লাটফরমে দিয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন বুটিক শপ, রেস্টুরেন্ট ও ট্রাভেল এজেন্ট।

এসব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও পণ্য ও সেবার প্রচারে ফেসবুক-গুগল-ইউটিউবের মতো ডিজিটাল প্লাটফরমকে বেছে নিচ্ছেন। তারা বলছেন, টেলিভিশন, রেডিও বা প্রিন্ট মিডিয়ায় পণ্যর পরিচিতিমূলক বিজ্ঞাপন দিতে বড় বাজেট রাখতে হয়। কিন্তু ডিজিটাল প্লাটফরমে পণ্য ও সেবার বিজ্ঞাপন তুলনামূলক সুলভ। এছাড়া নির্দিষ্ট গ্রাহকের মনোযোগ আকর্ষণ করাও সম্ভব হয় এ মাধ্যমে।

এমনই একজন তরুণ উদ্যোক্তা তাসলিমা মিজি। নিজ প্রতিষ্ঠানের পণ্যের প্রচারে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অংকের অর্থ বরাদ্দ রাখছেন ফেসবুকে বিজ্ঞাপন বাবদ। এ অর্থ পরিশোধে তিনি ব্যবহার করছেন আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড। সরাসরি ফেসবুকের নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে জমা হচ্ছে এ অর্থ।

এ উদ্যোক্তা বলেন, আমাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার বাবদ আমরা ফেসবুক-ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানকে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ পরিশোধ করি। সরকারেরও উচিত ফেসবুক-ইউটিউবের এ আয় থেকে কর আদায় করা। এজন্য তাদের কার্যক্রমকে একটা নীতিমালার আওতায় আনতে হবে।- বণিক বার্তা

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত