টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

আখেরী মুনাজাতে শান্তি-সমৃদ্ধি কামনায় চট্টগ্রামে ইজতেমা শেষ

আবু তালেব
হাটহাজারী থেকে

চট্টগ্রাম, ৩১ ডিসেম্বর, সিটিজি টাইমস::  ঈমান, তালিম, দাওয়াতীকাজ, ইসলামী শিক্ষা, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের মুক্তির প্রত্যাশায় হেদায়াতি বয়ান শেষে মসজিদভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয় চিত্তে ধারণ করে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য-সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব, সুখ-সমৃদ্ধি ও বিশ্বশান্তি এবং কল্যাণ কামনায় আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হলো হাটহাজারীর চারিয়া গ্রামে প্রথম বারের মত অনুষ্ঠিত ৩ দিন ব্যাপী চট্টগ্রাম জেলা আঞ্চলিক বিশ্ব ইজতেমা। আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে ইজতেমাস্থলে লাখো লাখো মুসল্লির ঢল নামে। চারিয়া গ্রাম, ইজতেমাস্থল ও এর আশপাশ এলাকা পরিণত হয় জনসমুদ্রে। যত দূর চোখ যায়, শুধু মানুষ আর মানুষ দেখা যায়।

আজ শনিবার (৩১ ডিসেম্বর) ভোর থেকেই আখেরি মোনাজাত অংশ নিতে কনকনে শীত উপেক্ষা করে দেশ-বিদেশের লাখো লাখো মুসল্লিরা মহাসড়কে হেঁটে ও ট্রেনে করে চারিয়া গ্রামে ইজতেমা ময়দানে এসে সমবেত হন। সকাল নাগাদ ইজতেমার মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। মুসল্লিরা মাঠের আশপাশের রাস্তা ও অলিগলিতে অবস্থান নেন। এছাড়া প্রায় ১০ লক্ষাধিক মুসল্লির ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন ১৩১ একর ইজতেমাস্থলের শামিয়ানায় পৌঁছাতে না পারা তথা ইজতেমাস্থলে স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেক মুসল্লি মহাসড়ক ও সড়কে অবস্থান নেন। তাঁরা পুরোনো খবরের কাগজ, পাটি, সিমেন্টের বস্তা ও পলিথিন বিছিয়ে বসে পড়েন। পার্শ্ববর্তী কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বাসাবাড়ি, দোকান ও যানবাহনের ছাদে অবস্থান নেন মুসল্লিরা।

সকাল সাড়ে ১০টায় আখেরি মোনাজাত শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা প্রায় ২ ঘণ্টা পর দুপুর ১২টা ১৭ মিনিটে শুরু হয়। বিনম্র সুরে আল্লাহর কাছে আকুতি জানিয়ে বাংলা ভাষায় মোনাজাত পরিচালনা করেন  মারকাজ কাকরাইল মসজিদের খতিব আল্লামা হাফেজ জুবাইর আহমদ। তাঁর সঙ্গে লাখো মুসল্লি দুই হাত তুলে “আমিন, আমিন ধ্বনি” তোলেন। এ সময় লাখো লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লির “আমিন, আমিন ধ্বনিতে” মুখরিত হয়ে ওঠে হাটহাজারীর চারিয়া গ্রামসহ আশপাশের এলাকা। এছাড়া বিশ্ব সেই ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে।

দুপুর ১২টা ১৭ মিনিটে থেকে ১২টা ৩২ মিনিট পর্যন্ত প্রায় ১৫ মিনিটি ব্যাপী আখেরি মোনাজাতে মহান আল্লাহর দরবারে দুই হাত তুলে কেঁদে কেঁদে নিজেদের পাপমোচনে মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন মুসল্লিরা। তাঁরা পাপ থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে আকুতি-মিনতি করেছেন। দেশ-জাতি-মানবতার কল্যাণ ও সমৃদ্ধি চেয়েছেন। মানুষের জন্য রহমত ও শান্তি কামনা করেছেন। একই সঙ্গে ইসলামের আলোকে নিজেদের জীবন গঠন এবং সেভাবে জীবনযাপনে আল্লাহর সাহায্য কামনা করেন। এ সময় ইজতেমার ময়দান ও আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে লাগানো মাইকে অনেক ধর্মপ্রাণ মুসল্লি বাসা-বাড়ি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে যে যার মতো করে মোনাজাতে শরিক হন।

আখেরি মোনাজাতের চট্টগ্রাম জেলা আঞ্চলিক বিশ্ব ইজতেমার শেষে দিনে বাদ ফজর আমবয়ান করেন মারকাজ কাকরাইল মসজিদের মুরব্বি মাওলানা মোশারফ সাহেব এবং হেদায়েতি বয়ান করেন বাংলাদেশে দাওয়াতে তাবলীগের প্রাক্তন প্রধান প্রকৌশলী মাওলানা আবদুল মুকিব এর পুত্র মাওলানা আবদুল বার। বয়ানে তিনি দাওয়াতি কাজ হেঁটে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘হেঁটে বেশি মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া সম্ভব হবে। এতে পায়ে যে ধুলাবালি লাগবে, তা জাহান্নামের আগুনকে ঠান্ডা করে দেবে।

এদিকে স্থানীয় চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. নুরুল আবছার এ প্রতিবেদককে জানান, কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই অত্যান্ত ভাব ও গাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে মুসলিম উম্মার ৩ দিন ব্যাপী ইজতেমা শেষ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আখেরী মোনাজাতকে কেন্দ্র করে প্রশাসন আলাদা প্রস্তুুতি নেয়। নিয়ন্ত্রণ করা হয় চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি রুটের বাস চলাচল। বন্ধ করে দেওয়া হয় ইজতেমা প্রাঙ্গণের আশপাশের সড়কগুলো। র‌্যাব ও পুলিশসহ নিরাপত্তা বাহিনী গুলোর শত শত সদস্য ইজতেমায় নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। পাঁচ স্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তার ব্যবস্থার পাশাপাশি সাদা পোশাকে অতিরিক্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ কতৃপক্ষ। এছাড়া মুসুল্লিদের নির্বিঘ্নে যাতায়াত সুবিধার জন্য চট্টগ্রাম বটতলী রেলস্টেশন থেকে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মুসল্লীদের নিরাপদ যতায়তের জন্য রাত ১০টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত মহাসড়কে ভারী গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখার সিন্ধান্ত থাকলেও জনস্ত্রোতের কারণে সকাল ৭টা থেকে মহাসড়কে গাড়ী চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। তাছাড়া ইজতেমা প্রাঙ্গনের আশেপাশের বাড়িঘরের উঠান ও আঙ্গিনায় বিপুল সংখ্যক মহিলারা ও আখেরি মোনাজাতে অংশ গ্রহন করেন।

পানিসম্পদ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রি ব্যরিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনের সংসদ সদস্য ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন নদভী, বাংলাদেশ কল্যাণ পাটির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) ইবরাহিম বীর প্রতীক, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক সামশুল আরেফিন, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা, অতিরিক্ত এসপি (উত্তর) মুহাম্মদ মশিউর রহমান ও (দক্ষিণ) এমরান হোসেন, হাটহাজারী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাহাবুবুল আলম চৌধুরী, উপজেলা পরিষদ ভাইস-চেয়ারম্যান মাওলানা নাছির উদ্দিন মুনির, সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফুল ইসলাম সরদার, হাটহাজারী থানার ওসি বেলাল উদ্দিন জাহাংগীরসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং জনপ্রতিনিধিগণ মোনাজাতে অংশ নেন।

মতামত