টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

শাহ আমানতে পূনর্বাসনের জমি রেজিস্ট্রেশনে টাকা আদায়ের আভিযোগ

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ৩১ ডিসেম্বর, সিটিজি টাইমস:: চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের অধিকৃত এলাকার বাসিন্দাদের পূনর্বাসনে বরাদ্দ দেওয়া জমি রেজিস্ট্রেশনের নামে চলছে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়। টাকা দিতে না পরায় এখনো জমি রেজিস্ট্রেশন পায়নি প্রায় চার শতাধিক পরিবার। যার স্থানীয় প্রভাবশালী দালালচক্রের হাতে প্রায়ই জিম্মী।

পূনর্বাসিতদের অভিযোগ, জমি রেজিস্ট্রেশনের নামে প্লট প্রতি ৩০ হাজার টাকা আদায় করছে দালালচক্র। টাকা যারা দিয়েছে তারা জমি রেজিস্ট্রেশন পেয়েছে। যারা টাকা দেয়নি তারা এখনো জমি রেজিস্ট্রেশন পায়নি। আর টাকা আদায়ের পেছনে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও যোগসাজশ রয়েছে।

আলাপকালে পূনর্বাসিতরা জানান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মো. নুরুল আবছার পূনর্বাসিতদের কাছ থেকে জমি রেজিস্ট্রেশন বাবদ প্লট প্রতি ৩০ হাজার টাকা করে আদায় করেন। যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন তাদের জমি রেজিস্ট্রি হয়েছে। গত এক-দেড়বছর ধরে সোলায়মান মেম্বার নামে তার এক অনুসারি এই টাকা আদায় করছেন। অথচ পূনর্বাসনের এই জমি রেজিস্ট্রি দেওয়ার কথা বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষের।

তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে গত বুধবার রাতে সাবেক কাউন্সিলর নুরুল আবছারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে পরিচয় পেয়ে তিনি বলেন, আমি ফোনে সাংবাদিকের সাথে কথা বলি না। কথা বলতে চাইলে আমার অফিসে আসেন। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অফিসে গিয়ে দেখা যায় তিনি নেই। ফোন দিলে ধমক দিয়ে তিনি বলেন, আমি বলেছিলাম না ফোনে কথা বলব না। অফিসেই তো এসেছি বললে তিনি বলেন, সন্ধ্যায় আসেন। দূর থেকে সন্ধ্যায় আসা কষ্ঠসাধ্য বললে তিনি বলেন, আপনার প্রয়োজন থাকলে গভীর রাতেও আসতে হবে।

এ ব্যাপারে জানার জন্য নগরীর ৪১ নং ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর ছালেহ আহমদ চৌধুরীর অফিসে গেলে তিনি বাইরে থাকার কথা জানান। তবে এ বিষয়ে আলাপকালে তার ছেলে মো. ওয়াহিদ প্লট প্রতি পূনর্বাসিতদের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা আদায় করার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, দালালি করাই সাবেক কাউন্সিলর নুরুল আবছারের পেশা। এ কাজ করেই তো তিনি টাকা কামিয়েছেন।

মো. ওয়াহিদ বলেন, ১৯৯৭ সালে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের জন্য বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ পতেঙ্গার পোড়াপাড়া, মিয়াজি পাড়া, ডুরিয়া পাড়া (আংশিক), চরবস্তি (আংশিক) এলাকায় প্রায় ৫০০ পরিবারবে উচ্ছেদ করে ক্ষতিপুরণসহ বিজয় নগর এলাকায় পুর্নবাসন করেন।

এ সময় বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর ছিলেন নুরুল আবছার। তিনি এলাকার লোকজনকে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলেন; আবার উচ্ছেদে সহযোগীতার নামে বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে মোটা অঙ্কের কমিশনও হাতিয়ে নেন নুরুল আবছার।

অথচ সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক অধিকৃত এলাকা ছেড়ে বিজয় নগরেই পূনর্বাসিত হন লোকজন। এতে বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় ব্লক-এ, ব্লক-বি, ব্লক-সি ভাগে বিভক্ত করে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। যা অল্প সময়ের মধ্যে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে হস্তান্তর করার কথা।

সেই থেকে এ পর্যন্ত প্লটগুলোতে ঘরবাড়ি তৈরী করে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে পূনর্বাসিতরা। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন নিয়ে শুরু হয় গড়িমসি। রেজিস্ট্রেশনের জন্য বার বার ধর্ণা দেওয়া হলেও দেখা মিলে না বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষের। কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলার জন্য বিমান বন্দরে গেলেও ঢুকতে দেওয়া হয় না পূনর্বাসিতদের।

শেষ মেষ সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা নুরুল আবছারকে দালাল নিয়োগ করেন বিমান বন্দরের সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ। তিনি পূনর্বাসিতদের বলেন জমি রেজিস্ট্রেশনের জন্য প্লট প্রতি ৩০ হাজার টাকা দিতে হবে। সেই থেকে এ পর্যন্ত দাবিকৃত টাকা দিয়েই জমি রেজিস্ট্রি নিয়েছে শতাধিক পূনর্বাসিত পরিবার।

৩০ হাজার টাকা দিয়ে জমি রেজিস্ট্রি নেওয়ার কথা স্বীকার করে বিজয় নগরের বাসিন্দা আলতাফ হোসেন বলেন, উচ্ছেদের সময় বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষ বিনামূল্যে জমি রেজিস্ট্রি দেয়ার কথা দিলেও গত দেড়যুগ ধরে পায়নি। তাই মাথা গোঁজার ঠাই নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। ফলে বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে জমি রেজিস্ট্রি নিয়েছি।

তিনি বলেন, টাকা না দেওয়ায় পূনর্বাসনের আরও ৪০০ পরিবার এখনো জমি রেজিস্ট্রি পায়নি। এদের অনেকেরই টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই বলে জানান তিনি।

পতেঙ্গা ভুমি অফিসের পিয়ন মো. হানিফ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, টাকা দিতে না পারায় আমিও জমি রেজিস্ট্রি পায়নি। টাকা নিয়ে সাবেক কাউন্সিলর নুরুল আবছার বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষকে বললেই জমি রেজিস্ট্রি হই। প্লট প্রতি আদায় করা ৩০ হাজার টাকা নুরুল আবছার ও বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষ ভাগবাটোয়ারা করে খাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

একই কথা বলেন, বিজয় নগর বি ব্লককে পূনর্বাসিত পরিবারের অভিবাবক লাইলী বেগম। তিনি বলেন, আমার স্বামি বেচে থাকা অবস্থায় অধিকৃত জমি ছাড়লেও পূনর্বাসনের জমি রেজিস্ট্রি দেখে মরতে পারেনি। অভাবগ্রস্ত হওয়ায় জমি রেজিেিস্ট্রশনের জন্য দালালকে টাকাও দিতে পারছি না। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

এ-ব্লকের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বলেন, জমি রেজিস্ট্রেশন না পেয়ে পূনর্বাসিত আরও ৪০০ পরিবারের সদস্যরা চরম দুশ্চিন্তায় দিনাতিপাত করছে। জমি রেজিস্ট্রশনের জন্য আগে সাবেক কাউন্সিলর নুরুল আবছার কাছে এখন তার প্রতিনিধি সোলায়মান মেম্বারের কাছে ধর্ণা দিচ্ছে।

যোগাযোগ করা হলে সোলায়মান মেম্বার টাকা আদায়ের কথা অস্বীকার করে বলেন, এসবের সাথে আমি জড়িত নই। সাবেক কাউন্সিলর নুরুল আবছার ও বর্তমান কাউন্সিলর ছালেহ আহমদ জড়িত। তারাই টাকা প্লট প্রতি ৩০ হাজার টাকা করে নিচ্ছে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সিভিল এভিয়েশনের ম্যানেজার উইং কমান্ডার রিয়াজুল কবির বলেন, পূনর্বাসিতদের বরাদ্দকৃত জমি রেজিস্ট্রেশনের জন্য টাকা আদায়ের বিষয়ে আমি অবগত নই। পূনর্বাসিতরা যোগাযোগ করলেই আমরা জমি রেজিস্ট্রেশন দিচ্ছি। জমি রেজিস্ট্রেশনের নামে কারা টাকা আদায় করছে সে ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

মতামত