টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামের পাবলিক লাইব্রেরীগুলো পাঠক হারাচ্ছে ক্রমেই!

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ২৯ ডিসেম্বর, সিটিজি টাইমস::  ১৯৬৩ সালের ২০ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের শহীদ মিনারের সামনে মুসলিম হলের জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম বিভাগীয় সরকারি গণগ্রন্থাগার। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে এই লাইব্রেরির চারতলা ভবন নির্মাণ করে বাংলাদেশ সরকার। পরের বছর জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এটি।

সিটি করপোরেশন পাবলিক লাইব্রেরিটি আরও পুরনো, একেবারে ব্রিটিশ আমলের। ১৮৫৯ সালে শুরু হয় চট্টগ্রাম পৌরসভার কার্যক্রম। আর ১৯০৪ সালে পৌরসভা ভবনকে রূপান্তরিত করা হয় পাবলিক লাইব্রেরিতে।

এরমধ্যে বিভাগীয় সরকারি গণগ্রন্থাগারটি একাডেমিক বইয়ের জন্য আর সিটি করপোরেশনের পাবলিক লাইব্রেরিটি রেফারেন্সের জন্য খ্যাত। গণগ্রন্থাগার দুটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাঠকের সমাগম থাকলেও গত কয়েকবছর ধরে দিনদিন কমছে পাঠকের সংখ্যা।

পাঠকদের অভিযোগ, দুই পাবলিক লাইব্রেরির কোনোটিতেই আধুনিকতার লেশ মাত্র নেই। প্রতিষ্ঠার পর একই রুপ, একই ধাঁচ বিরাজ করছে দুই লাইব্রেরীতে। দুটি পাঠাগারে বইয়ের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। যা ঘুরে ফিরে পড়ছে পাঠকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি গণগ্রন্থাগারের চারতলা ভবনে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৯১ হাজার। সিটি করপোরেশন পাবলিক লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা ৩৫ হাজার। গণগ্রন্থাগারে গত নভেম্বর মাসে দৈনিক পাঠক সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩১২ জন। এর আগে অক্টোবর মাসে দৈনিক পাঠক ছিল ১ হাজার ৭১৯ জন।

আর সিটি করপোরেশন পাবলিক লাইব্রেরিতে নভেম্বর মাসে পাঠক সংখ্যা ছিল দৈনিক একশ জন। অক্টোবর মাস ছিল ১০৯ জন। এর আগে দুই লাইব্রেরীতে আরও বেশি পাঠক ছিল। কিন্তু চাহিদামত বই না পাওয়ায় আগের মতো পাঠক টানছে না লাইব্রেরী দুটি।

সরেজমিনে দেখা যায়, সরকারি গণগ্রন্থাগারের তিনতলায় গুটিকয়েক পাঠক থাকলেও চতুর্থ তলায় সাধারণ পাঠকক্ষে পাঠক সংখ্যা কিছুটা বেশি। যেখানে বেশিরভাগই বিসিএস পরীক্ষার্থী। পরীক্ষার্থীরা জানায়, শিক্ষার্থীদের অনুরোধে গত জুলাই মাসে ১ সেট করে টেক্সট বই ও বিসিএস গাইড বই কিনেছে পাঠাগার কর্তৃপক্ষ। যা দেখতে আসছেন শিক্ষার্থীরা।

যে কোনো সময় অনুরোধ বা আবেদনপত্র দিলে কর্তৃপক্ষ চাহিদামতো বইয়ের ব্যবস্থা করে দেয় বলে জানালেন মো. করিম নামের এক পাঠক। তবে কর্তৃপক্ষ জানান, বই কেনার জন্য অধিদপ্তর থেকে আলাদা করে কোনো টাকা দেওয়া হয় না। বাৎসরিক বাজেট থাকে প্রায় ১ লাখ টাকা। বাৎসরিক বরাদ্দ থেকে টাকা থাকলে তবেই লাইব্রেরির জন্য আলাদা বই কেনা যায়।

সরকারি গণগ্রন্থাগারে ইন্টারনেটের কাজ চলে একটি টেলিকম কো¤পানির বদৌলতে। তৃতীয় তলায় পাঠকক্ষের মাত্র একটি ইন্টারনেট কর্নারে ২০ মিনিট বসতে পারে পাঠকরা, যা শুধুমাত্র ইন্টারনেট ব্রাউজ ও ই-মেইল পাঠানোর জন্য।

গণগ্রন্থাগারের প্রধান লাইব্রেরিয়ান ও উপ-পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, আমি অনেক দেশের লাইব্রেরি দেখেছি। দেখে যা মনে হয়, জাতি হিসেবে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। পাঠকের কী বই দরকার, সেটা জানার জন্য তাদের সঙ্গে মতবিনিময় প্রয়োজন। কিন্তু সেটা এখানে হয় না। আমরা চাই পাঠক বাড়ুক। পাঠক বাড়ার জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন।

লাইব্রেরির আধুনিকায়নের জন্য সরকারের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের এ টু আই প্রকল্পের আওতায় পুরো লাইব্রেরি ওয়াইফাই জোন করা হবে। তখন প্রতিটি পাঠকের জন্য একটি করে ক¤িপউটার থাকবে। কিন্তু এটা মন্ত্রণালয় যখন চাইবে, তখন সম্ভব হবে। আপাতত মনে হচ্ছে অনেক সময় দেরি হবে।

এদিকে সিটি করপোরেশন পাবলিক লাই্রবরেীর ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ভবনের ছাদ চুঁইয়ে পড়ে পানি। কোনোরকম সংস্কার কাজ হয়নি বললেই চলে। বর্ষাকালে ভিজে যায় বই। তাই বর্ষাকালে কোনো পাঠকের দেখা মেলে না এখানে।

তিনতলা ভবনের দোতলায় রয়েছে মূল লাইব্রেরি। তৃতীয় তলায় সিটি করপোরেশন ফুটবল একাদশ ক্যা¤প। পত্রিকা পড়ার একটি কক্ষ, একটি কার্যালয় ও দুই কক্ষবিশিষ্ট পাঠাগার। একই কক্ষে বইয়ের তাক। এখানেই রয়েছে সমৃদ্ধ আর্কাইভ।

প্রতিষ্ঠাকালের আগের গেজেট, পেটেন্ট, মোহাম্মদী, সওগাত, প্রভাতী, বেগম, পূর্বাশা, সবুজপত্র সহ হাজার খানেক ঐতিহাসিক পত্রিকা সংগৃহীত এখানে। জীবনী সংগ্রহের পাশাপাশি রয়েছে পুস্তক আকারে নবম শতাব্দী থেকে শত শত জীবনী সংগ্রহের লিস্ট। আরো রয়েছে গল্প, উপন্যাস, ছড়া, কবিতার আধুনিক ও পুরোনো বই। এখানে পড়ার বই কম, রেফারেন্স বই বেশি।

সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো লাইব্রেরিতে পাঠক নেই বললেই চলে। স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়াদের বদলে কিছু বয়স্ক ব্যক্তির দেখা মেলে। ডাক্তারি, প্রকৌশলী ও ক¤িপউটার শিক্ষার বইয়ের কক্ষ দুটি তালাবন্ধ।

জানা যায়, ডাক্তারি ও প্রকৌশল বিষয়ক বইগুলো অনেক দামী। কিন্তু পাঠক একেবারেই কম। এক বছর কিনলে পরের বছর বই পুরোনো হয়ে যায়। তাই তালাবন্ধই থাকে এ দুটি কক্ষ।

কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০১৩ সালে সর্বশেষ ১ লাখ ২০ হাজার টাকার বরাদ্দ পায় এ লাইব্রেরী। সেই টাকা দিয়ে কেনা হয় আসবাবপত্র ও বই। ২০১৪ সালে ঢাকার অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে ১ লাখ টাকার নতুন বই কেনা হয়। ইন্টারনেটে সবাই বই পড়ে ফেলার কারণে এখন আর লাইব্রেরীতে আসতে চায় না। তাই লাইব্রেরীতে আধুনিক বই থাকলেও পাঠক নেই।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পাবলিক লাইব্রেরির সহকারী লাইব্রেরীয়ান কালাম চৌধুরী জানান, এ পাবলিক লাইব্রেরিটি ভেঙে ১১তলা ভবন নির্মাণের একটি প্রকল্প রয়েছে জাইকার। মিলনায়তন, ডিজিটাল আর্কাইভ করা হবে, সেমিনার হল করা হবে। এটি প্রায় ১০০ কোটি টাকার প্রকল্প, যেটি সিটি করপোরেশনকে প্রস্তাব করেছে জাইকা। প্রক্রিয়াধীন এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চেহারা পাল্টে যাবে এ লাইব্রেরীর।

মতামত