টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মেলার দখলে খেলার মাঠ খেলতে পারছে না শিশুরা

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম 

চট্টগ্রাম, ২৫ ডিসেম্বর, সিটিজি টাইমস:: চট্টগ্রাম মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সবকটি খেলার মাঠ এখন মেলার দখলে। বিশেষ করে নগরীর আউটার স্টেডিয়াম, পলোগ্রাউন্ড মাঠ, হালিশহর আবাহনী মাঠসহ ইনডোরেও কিছু ভবনে চলছে মেলা। এসব মেলায় পণ্য বিক্রিই অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

দীর্ঘ সময় ধরে চলা মেলার কারনে খেলতে পারছে না নগরীর শিশু-কিশোররা। এতে তাদের মানসিক ও শারিরীক বিকাশ ঘটছে না এমন আশঙ্কা ক্রীড়ামোদী ও অভিভাবকদের। দেশের ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ও চট্টগ্রামের সন্তান ক্রিকেটার আকরাম খানও মেলার দখলে খেলার মাঠ চলে যাওয়ায় দু:খ প্রকাশ করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগরীর আউটার স্টেডিয়ামে মাসব্যাপী চলছে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা। হালিশহরের আবাহনী মাঠেও মাসব্যাপী চলছে মেট্রোপলিটন চেম্বারের আন্তর্জাতিক রপ্তানি ও বাণিজ্য মেলা। এর আগে নভেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে নগরীর পলোগ্রাউন্ডে উইমেন চেম্বারের ইন্টারন্যাশনাল এসএমই এক্সপো।

এর আগে নগরীর আগ্রাবাদের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এবং জিমনেশিয়াম চত্বরে জুনিয়র চেম্বারের মেলা চলে। এছাড়া নগরীর জিইসি কনভেনশন সেন্টারে চলছে আন্তর্জাতিক ফার্নিচার মেলা। এর আগে দ পেনিনসুলা চিটাগাংয়ে শেষ হলো আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা।

একসাথে পাঁচটি ভিন্ন জায়গায় মেলা আয়োজিত হলেও মেলাগুলোর পণ্য প্রায় একই। ব্যতিক্রম শুধু চেম্বারের এসএমই মেলা। সপ্তাহের কর্মব্যস্ত দিনগুলো ছাড়া ছুটির দিনেই কেবল ভিড় বাড়ছে মেলায়।

পলোগ্রাউন্ডে উইমেন চেম্বারের মেলাটিতে তেমন দর্শণার্থী ছিল না। বিকালে ও সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারে দর্শণার্থীর ভিড় ছিল কিছুটা। সে তুলনায় ১ ডিসম্বের বিজয় মেলা শুরু হলেও অল্প কদিনেই বেশ দর্শণার্থী হয়েছে এ মেলায় নগরীর কেন্দ্রস্থলে হওয়ায়। অবশ্য মেলায় এখনো কিছু কিছু স্টলে পণ্য তোলা হয়নি।

এদিকে দেশের রপ্তানিকারক ও উৎপাদকদের দ্রব্যাদি সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে মাসব্যপী মেলার আয়োজন করেছে মেট্রোপলিটন চেম্বার। সংগঠনটির সহ সভাপতি এ.এম. মাহবুব চৌধুরী জানান, দেশের ৫০টি উৎপাদক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মেলায় ২০৭টি স্টল দিয়েছে। রপ্তানিযোগ্য দ্রব্যাদি প্রদর্শন ও দেশীয় উৎপাদিত পণ্য ভোক্তাদের কাছে প্রদর্শন করাই ছিল মেলার উদ্দেশ্য।

ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তাদেরকে ব্যাংক ও ইন্স্যূরেন্স প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়ার জন্য চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের এক ছাদের নিচে আন্তর্জাতিক এসএমই বাণিজ্য মেলার আয়োজন করেছিলো চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স।

চিটাগাং চেম্বার ও মেট্রোপলিটন চেম্বারের মত বড় ও ব্যবসায়িকভাবে তেমন পরিচিত না হলেও তরুণদের জন্য এবারই প্রথমবারের মত আয়োজন করা হয়েছে তরুণ উদ্যোক্তা বাণিজ্য মেলা। নিজেদের আইডিয়া নিয়ে মেলায় স্টল ও প্যাভিলিয়ন সাজিয়েছিলেন তরুণ উদ্যোক্তারা।

কাজীর দেউড়ি এলাকায় বিজয় মেলা ও তরুণ উদ্যোক্তা মেলার কারণে যানজটের প্রভাব পড়েছে। তবে মেলার বাইরে ট্রাফিক সমস্যা নিরসনের জন্য যথেষ্ট উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে দাবি করে সিএমপির সহকারি পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মাসুদ উল হাসান। তিনি জানান, রাস্তা যেন ফ্রি থাকে, তার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত মেলায় উপচে পড়া ভিড় সৃষ্টি না হওয়ায় তেমন সমস্যা হচ্ছে না।

যানজটের মত আরেকটি বড় সংকট দেখা দিয়েছে মেলাগুলোর স্থান নিয়ে। একসাথে এতগুলো স্থানে না হয়ে পরিকল্পিতভাবে একটি স্থানেই মেলার আয়োজন করা উচিত ছিলো বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদেরা।

বাংলাদেশ প্ল্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন, চট্টগ্রামের সভাপতি প্রকৌশলী এম আলী আশরাফ বলেন, মেলার জন্য আলাদা মাঠ থাকলে ভালো হত। আগে নগরীর জাম্বুরী মাঠে সব মেলা হত। এখন মেলার জন্য সে রকম নির্দিষ্ট মাঠ নেই। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মত প্রতিষ্ঠান উদ্যোগ নিলে মেলার জন্য বাণিজ্যিকভাবে কোনো মাঠ বা কনভেনশন হতে পারে।

একই মতামত জানালেন আরেক প্রকৌশলী ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার মজুমদার। তিনি বলেন, মেলার ভালো খারাপ দুটি দিকই আছে। তবে মেলার জন্য সুনির্দিষ্ট স্থান থাকলে ভালো হত। তাহলে এতগুলো স্থানে মানুষকে যেতে হত না। এছাড়া কোন মেলা কখন হবে তা পরিকল্পিতভাবে ঠিক করা যায়। কারণ বড় বড় মাঠ দখল করে যেসব মেলা হচ্ছে এতে শিশু ও খেলোয়াড়রা বঞ্চিত হচ্ছে। বিজয় মেলা তো ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আয়োজিত হয়ে আসছে। এটি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এছাড়া আগে মেলা হত শীতকালে। এখন শীতকালসহ বছরজুড়ে মেলা হওয়ায় এখানে উচ্চস্বরে মাইক বাজানোর ফলে পরীক্ষার্থীদেরও সমস্যা হচ্ছে।

চট্টগ্রামের ক্রীড়াবিদরা মেলায় দেশীয় পণ্য ও ঐতিহ্য থাকলেও পরিকল্পনা করে মেলার আয়োজন করা উচিত ছিলো বলে মনে করেন তিনি। কারণ, ইনডোর মেলাসমূহ ছাড়া বাকি সব মেলাই হচ্ছে নগরীর বড় বড় সব মাঠে। চিটাগাং মেট্রোপলিটন চেম্বারের মেলাটি হালিশহরের আবাহনী মাঠে, উইমেন চেম্বারের মেলা নগরীর পলোগ্রাউন্ড এবং বিজয় মেলা আউটার স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শহরের ছেলেমেয়েরা নগরীর যে প্রধান ও বড় তিনটি মাঠে একটু খেলার সুযোগ পায় সেসব এখন ব্যস্ত রয়েছে মেলায় বিভিন্ন পণ্যের প্রচারণায়। এছাড়া প্রায় সারাবছর নগরীর বাওয়া স্কুলের মাঠটিতেও মেলা লেগেই থাকে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ স¤পাদক সিরাজুদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় থাকা মাঠগুলো আমরা খেলার জন্য বরাদ্দ চাইলে নানা অজুহাতে আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অথচ সেই মাঠ আবার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়াও দেওয়া হয়। এই মাঠের অভাবে দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।’

তিনি বলেন, ‘ক্লাবগুলো এখন অনুশীলন করার জন্য মাঠ পায় না। অথচ মাঠগুলো সব মেলার দখলে চলে গেছে। বিশেষ করে গত ৪/৫ বছরে কিছুলোক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনে পড়ে মাঠগুলোকে শেষ করে দিচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে মেলা শুধু ১৫ দিন কিংবা এক মাসের জন্য হচ্ছে। পলোগ্রাউন্ডে চট্টগ্রাম চেম্বার ও মহিলা চেম্বারের আড়াই মাসের যে মেলা হয়, তা আগের প্রস্তুতি এবং মেলা শেষে পড়ে থাকা ইট-সুরকির কারণে প্রায় ৬ মাসই খেলার অনুপযোগী থাকে। এভাবে আমাদের সন্তানদের খেলার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে।’

জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠক আশীষ ভদ্র এ বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, স্টেডিয়ামে যখন খেলা চলে, বাইরের মেলার কারণে তাতে ব্যাঘাত ঘটে। এছাড়া নগরীতে এমনিতেই খেলার মাঠ নেই। সেখানে মাঠগুলো যদি বছরজুড়ে নানান মেলায় ব্যস্ত হয়ে থাকে তাহলে শিশুরা খেলবে কোথায়? আউটার স্টেডিয়ামে খেলোয়াড়েরা র্প্যাকটিস করে। এখন সেটাও বন্ধ থাকছে। মেলার জন্য আলাদা জায়গা বরাদ্দ থাকলে ভালো হত বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, নগরীতে খোলা জায়গা তেমন নেই। এখন মেলার জন্য প্রায় সময়ই সব মাঠ বরাদ্দ থাকে। মেলার জন্য আলাদা জায়গা থাকলে ভালো হত। তাহলে সবসময় সেখানেই মেলা হত। মাঠগুলো খালি থাকতো। বিষয়টি কর্তপক্ষের চিন্তা করে দেখলে ভালো হয়।

হালিশহর এইচ বøকের বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘এই এলাকায় বড় মাঠ বলতে আবাহনী মাঠ। বর্তমান ক¤িপউটার গেমসের যুগে আমি নিজেই ছেলেকে বিকেল বেলা মাঠে খেলতে পাঠাতাম। কিন্তু মেলার নামে গত একমাস ধরে সেটা বন্ধ। কমপক্ষে আগামী দুইমাস এই মাঠে খেলা সম্ভব হবে না। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। অথচ এই সময়ে খেলতে না পেরে ছেলে মনমরা হয়ে বাসায় বসে থাকে। এটা ছোট ছেলেমেয়েদের মানসিক বিকাশের জন্য খুব খারাপ লক্ষণ।’

দীর্ঘদিন ধরে মাঠে খেলতে না পেরে মন খারাপ নগরীর পলোগ্রাউন্ড সংলগ্ন রেলওয়ে কলোনির রিফাতের। মেলার জন্য গত দেড় মাস ধরে পলোগ্রউন্ডে খেলতে পারছে না। আবার এই মেলা শেষ হতে না হতেই মার্চ মাস থেকে শুরু হবে চট্টগ্রাম চেম্বারের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা। মেলা শেষে ইট পাথরের কারণে আরও এক থেকে দেড় মাস মাঠ ব্যবহার করা যায় না। আক্ষেপ করে রিফাত বলেছে, ‘আসলে আমরা বছরে ৬ মাসই মাঠে খেলতে পারি না। এই সময়টা আমাদের খুব কষ্টে কাটে।’

নন্দিত ক্রিকেটার আকরাম খান সম্প্রতি চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত এক গুণি সংবর্ধনায় বলেন, ক্রিকেট খেলার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে সুনামের সাথে পরিচিতি লাভ করেছে। অত্যন্ত দু:খজনক হলেও সত্য যে চট্টগ্রামে খেলার মাঠসমূহ মেলার মাঠে পরিণত হয়েছে। খেলোয়াড় সৃষ্টির লক্ষ্য মাঠকে মেলামুক্ত রাখার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত