টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামের দোকানগুলোই যেন শিশুদের মরণখাদ!

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ২৩ ডিসেম্বর, সিটিজি টাইমস:: চট্টগ্রাম মহানগর থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত বেশিরভাগ দোকানই যেন শিশুদের মরণখাদ। এসব দোকানে অবাধে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল শিশুখাদ্য। যা গ্রহণের ফলে শিশুরা ক্রমেই আক্রান্ত হচ্ছে নানা মরণব্যাধিতে।

গ্রাহকের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে এসব খাবারে মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত কাপড়ের রং, সুগন্ধি ও ট্যালকম পাউডার। এসব ভেজাল শিশুখাদ্যের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সরকারের মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্স অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই)।

বিএসটিআই কর্মকর্তারা জানান, শিশুদের বিভিন্ন র্ব্যান্ডের গুঁড়া দুধ, কেক, ফ্রুটস কেক, জেলি, চকোলেট, বিস্কুট, চিপস ও জুস বিক্রি হচ্ছে- যার বেশিরভাগই স্বাস্থ্যসম্মত নয় এবং মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তবে কতটা ক্ষতিকর তা পরীক্ষা করার মতো কোনো যন্ত্রও বর্তমানে বিএসটিআইয়ের নেই।

যেসব কৌটার গায়ে ইনফ্যান্ট ফর্মুলা ও সিরিয়াল ফর্মুলা লেখা থাকে, শুধু সেগুলোকেই শিশুখাদ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এসব খাদ্য ১ দিন থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুদের জন্য প্রযোজ্য। শিশুখাদ্য হিসেবে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন পাওয়া গুঁড়া দুধের র্ব্যান্ডগুলো হল- মাই বয়, ল্যাকটোজেন-১, বেবি কেয়ার, মাদার্স স্মাইল প্রাইম ও মাদার্স স্মাইল ল্যাকটোফিক্স, মামিল্যাক-১ ও ২, বায়োমিল সয়া, বায়োমিল এ আর, প্রি-বায়োমিল, গ্যাস্ট্রো ফিক্স ও বায়োমিল-১, ডানো ডি-১, ডাইল্যাক-১, সেলিয়া এআর, ন্যাকটালিয়া, ফট্রিমেন, ডিল্যাক-১, এলডো বেবি ও এলডো বেবি এলএফ। অথচ এসব র্ব্যান্ডের বাইরেও অনেক গুঁড়া দুধ শিশুখাদ্য হিসেবে বাজারে বেচাকেনা হচ্ছে; যা বিএসটিআইয়ের অনুমোদিত নয়।

এছাড়া বাজারে বিভিন্ন ফলের নাম দেয়া শরীরের জন্য ক্ষতিকর রং মিশ্রিত জুস ও ড্রিংকস, ফ্রুটস কেক, বিভিন্ন ধরনের চকোলেট, পাউরুটি চিপসসহ অন্তত ৫০ ধরনের খাদ্য বিক্রি হচ্ছে। একই সঙ্গে শিশুদের এসব প্রিয় খাদ্যের ৫৫ শতাংশই তৈরি হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। বাজারে বিক্রি করা ৫৯ শতাংশ আইসক্রিমও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এসব খাদ্যের বেশির ভাগেই কোনো না কোনোভাবে ভেজাল মেশানো হয়। এসব তরল ও মুখরোচক খাদ্যে উচ্চমাত্রায় ভেজালের প্রমাণও মিলেছে। এসব ভেজাল শিশুখাদ্যে উৎপাদন ও বিপণন দন্ডনীয় অপরাধ।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শাহ আলম জানান, ভেজাল খাবার একটি নীরব ঘাতক। শিশুদের মেধা বিকাশে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। এসব ভেজাল শিশুখাদ্য ধীরে ধীরে মানুষের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেয়।

শিশুরা নিয়মিত এসব ভেজাল খাদ্য গ্রহণ করলে একসময় দেখা যাবে, তার মুখ ফুলে যাচ্ছে, প্রস্রাবে সমস্যা হচ্ছে এবং অস্বাভাবিক আচার-আচরণ করবে। পরীক্ষা করলে ধরা পড়বে কিডনির সমস্যা। তিনি আরও বলেন, আমরা যাকে বলি কিডনি বিকল তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভেজাল খাবারের কারণে হয়ে থাকে।

আইন-প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও গবেষকেরা বলছেন, ভেজাল খাবার খেয়ে শিশুরা মারাতœক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। তাদের শরীরে এসব উপাদান ¯ে¬া পয়জনিং-এর মতো কাজ করছে। মূলত দুভাবে শিশুরা বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণ করছে।

প্রথমত, শিশুদের পছন্দের খাবার যেমন জুস, চকোলেট, জেলি ইত্যাদিতে নিম্মমানের ও ভেজাল রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন ধরণের দেশী-বিদেশী ফল, সব্জিতে অতি মাত্রায় কীটনাশকের ব্যবহার, মাছ বা সব্জিতে ফরমালিনের ব্যবহার।

স¤প্রতি চমেক হাসপাতালে গিয়ে কথা হয় নাহিদা আক্তার ও খোরশেদ আলম দ¤পতির সঙ্গে। ১৪ মাস বয়সী একমাত্র ছেলে রোদের জন্মের পরে দ্বিতীয় দফায় হাসপাতালে ভর্তি করতে হলো। সরকারি চাকুরে খোরশেদ বলেন, চিকিৎসকেরা বলেছেন তাঁদের ছেলে খাবারে বিষক্রিয়ায় শিকার হয়েছে। শিশুটির প্রচন্ড পেট খারাপের পরে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যাও তৈরি হয়েছিল। শিশুটির জন্য তার বাবা-মা দু‘রাত ধরে ঘুমান না। পরিবারের সবারই মন খারাপ।

বাংলাদেশের রোগ তত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) কারিগরি উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, আমরা প্রচুর পেটের পীড়ার শিশু রোগী পাই যারা সরাসরি ভেজাল খাদ্যের জন্য আক্রান্ত হয়। এর বাইরেও ভেজাল খাবার শিশুদের নানাভাবে ক্ষতি করে। কিন্তু কোনো শিশু শ্বাসতন্ত্র বা কিডনি বৈকল্যের শিকার হয়ে হাসপাতালে গেলে তখনতো আর খাদ্যে ভেজালের বিষয়গুলো সামনে আসে না।

তখন শুধু রোগগুলোর চিকিৎসা হয়। আবার খাবারে ক্ষতিকারক রঙের ব্যবহার, কীটনাশক ইত্যাদির কারণে শিশুর কিডনি ও লিভারসহ যেসব জায়গায় বেশি রক্ত চলাচল করে সেসব অঙ্গ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের সম্ভাবনা থাকে। এর বাইরে পেটের পীড়া, পেটে ঘা, আলসার, চর্মরোগ ইত্যাদি প্রভাবতো খুব বেশি দেখাই যাচ্ছে।

বিএসটিআই চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মো. হানিফ জানান, এসব ভেজাল শিশুখাদ্যের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি। তারপরও অসাধু ব্যবসায়ীরা এগুলো বাজারে বিক্রি করছে। এ সপ্তাহে আরও বৃহৎ পরিসরে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করা হবে।

হানিফ বলেন, মূলত বস্তি এলাকা বা শহরগুলোতে বিক্রির জন্য এ ধরনের ভেজাল পণ্য উৎপাদন করা হয়। আর মূলত শিশুরা এগুলোর ভোক্তা। প্রায়ই এরকম কারখানায় অভিযান চালানো হচ্ছে, কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না এ ভেজাল খাদ্যের ব্যবসা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডবিøউএইচও) হিসেব মতে, ভেজাল বা দূষিত খাবার প্রতিবছর প্রায় চার লাখ কুড়ি হাজার শিশুর মৃত্যু ঘটাচ্ছে। যাদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি হচ্ছে পাঁচ বছরেরও কম বয়সী।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত