টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

রামগড় ১৭৯৫: বিজিবি’র গোড়পত্তন

করিম শাহ
রামগড় (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি

চট্টগ্রাম, ২০ ডিসেম্বর, সিটিজি টাইমস :: পাশাপাশি চারটি পিলারে চারটি স্তরে উপরে বর্ণমালা নিচে সংখ্যায় সাজানো বামদিক থেকে প্রথমটিতে “রা ১”, দ্বিতীয়টিতে “ম ৭”, তৃতীয়টিতে “গ ৯”, চতুর্থটিতে “ড় ৫”। এগুলোকে একত্রে মিলিয়ে পড়লে হবে রামগড়-১৭৯৫। রামগড়টি হচ্ছে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার একটি উপজেলা আর ১৭৯৫ সংখ্যাটি হচ্ছে ইংরেজী সাল। খাগড়াছড়ির পার্বত্য জেলা সদর হতে ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পচিমাঞ্চলের ভারত সীমান্তবর্তী ফেনী নদীর শান্তজলের কোল গেসে গড়ে উঠা প্রাচীন মহকুমা শহর রামগড় উপজেলার প্রশাসন সংলগ্ন এলাকায় এলেই দেখা মিলবে এই চারটি অংকিত বর্ণ ও সংখ্যাকে ঘিরে গড়ে উঠা বাংলাদেশের একটি প্রসিন্ধ লুকানো সুদীর্ঘ ইতিহাস। পর্যটক হতে শুরু করে সরকারী বেসরকারী বিভিন্ন মহলের যেই আসুক না কেন পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশের পূর্বেই রামগড়ে অবস্থিত এই স্থানটি গুরু যেতে কেউ ভুল করেন না। এখানে এলেই সহজে আপনাকে টেনে নেবে ইতিহাসের এক অনন্য আকরের দিকে। জানা যাবে বাংলাদেশের সীমান্ত বাহীনি বার্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)’র জন্ম ইতিহাস।

আজ ২০ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)’র বিজিবি দিবস ২০১৬ পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে রামগড়স্থ ৪৩ বিজিবি’র ব্যাটালিয়নে দিনব্যাপি নানা কর্মসূচি পালিন করছে। কর্মসূচির মধ্যে দিবসের প্রভাতে দোয়া মিলাদ মাহফিল, রেজিমেন্টাল পতাকা উত্তোলন, বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা, প্রীতিভোজ, সাংস্কৃতি অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালন করা হবে।

জানা যায়, এখন থেকে ২২২ বছর আগে ১৭৯৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে লুসাই বিদ্রোহ দেখা দিলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ১৭৯৫ সালের ২৯ জুন ৪৪৮ জন সৈন্য ৬ পাউন্ড গোলা, ৪টি কামান ও ২টি অনিয়মিত অশ্বরোহী দল নিয়ে রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন নামে এই বাহিনীটি গঠন করেন। ১৭৯৫ থেকে ১৮৬০ সাল পর্যন্ত বাহিনীটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরবর্তীতে ১৮৬১ সালে পূর্বাঞ্চলের নিয়মিত ও অনিয়মিত পুলিশ বাহিনীর সমন্বয়ে রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়নকে নতুন ভাবে ফ্রন্টিয়ার গার্ডস নামে পূর্ণগঠিন করা হয়। যার সদস্য সংখ্যা ১৪৫৮ জনে উর্ত্তিন্ন করে চট্টগ্রামে সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়। ১৮৭৯ সালে স্পেশাল রির্জাভ কোম্পানী নামে এ বাহিনী তৎকালীন সদস্যদের নিয়ে পিলখানায় প্রথম ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। সে থেকে অদ্যাবধি পিলখানায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)র কর্মকান্ড পরিচালিত হয়ে আসছে। ১৮৯১ সালে বাহিনীর নতুন নামকরণ করা হয় বেঙ্গল মিলিটারী পুলিশ। ঢাকা, খুলনা, ভাগলপুর ও গ্যাংটকে ৪টি ব্যাটালিয়নে ভাগ করে কোম্পানীগুলোকে স্থানান্তর করে একজন ইউরোপীয় সুবেদারের অধীনস্থ করা হয়। ১৯২০ সালে কালের বির্বতনে বেঙ্গল মিলিটারী পুলিশকে ইন্টান ফ্রন্টিয়ার রাইয়েল্স নামে পুনঃ নামকরণ করে ১৬টি প্লাটুনে বিভক্ত করে সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাত্তা রক্ষায় নিয়োজিত করা হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তের পর এ বাহিনীর নামকরণ করা হয় ইষ্ট পাকিস্তান রাইয়েল্স (ইপিআর)। কলকাতা মেট্রোপলিটন আর্মড পুলিশের একটি দল পরবর্তীতে আরও তিন হাজার বাঙ্গালীকে নিয়োগ করে এ বাহিনীকে পূর্ণগঠিত করে দক্ষ নেতৃত্ব এবং দিক নির্দেশনার প্রয়োজনে সামরিক বাহিনী থেকে অফিসার নিয়োগ করা হয়। ১৯৫৮ সালে এ বাহিনীকে প্রদান করা হয় চোরাচালান দমনের দায়িত্বে। এ বাহিনীর কার্যক্রম চলে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। দেশ স্বাধীনের পর নতুন আইন সংশোধন এর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের ৩ মার্চ ইপিআর এর পোশাক পরিবর্তন সহ নতুন নামকরণ করা হয় বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেল্স) । ৩রা মার্চ ১৯৮০ রাইফেলস্ প্যারেড সপ্তাহ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ রাইফেলস্কে প্রথম জাতীয় পতাকা হস্তান্তর করা হয়। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী ঢাকার পিলখায় বিডিআর বিদ্রোহের পর ২০১০ সালের ৮ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদে “বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ আইন ২০১০” পাশ হলে ২০ ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়। ২০১১ সালের ২৩ জানুয়ারি বাহিনীটির নাম ও পোশাক পরিবর্তন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ( বিজিবি)র পতাকা উত্তোলন করেন এবং মনোগ্রাম উম্মোচনের মধ্যদিয়ে শুরু হয় এ বাহিনীর নতুন পথ চলা। ঐ বছরের ২০ ডিসেম্বর থেকে পালিত হচ্ছে বিজিবি দিবস।

এ বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাগণ পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ, গেরিলা যুদ্ধ ও শত্রুঘাঁটি নিশ্চিহৃ করেত আত্মঘাতী আক্রমণসহ অসংখ্য দুর্ধর্ষ অপারেশন পরিচালনা করে। মুক্তিযুদ্ধে ইপিআরের ৮১৭ জন সৈনিক শহীদ হন। এদের মধ্য শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ এবং শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আবদুর রউফকে সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব “বীর শ্রেষ্ঠ” পদক দেয়া হয়। এছড়া আর জনকে “বীর উত্তম”, ৩২ জনকে “বীর বিক্রম” ও ৭৮ জনকে “বীর প্রতীক” খেতাব দেয়া হয়। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ বাংলাদেশ রাইফেল্সকে স্বাধীনতা পুরস্কার ২০০৮ প্রধান করা হয়।

২০০৫ সালের ৬ জুন রামগড় ৩৩ রাইফেল্স ব্যাটালিয়নের উদ্দ্যেগে তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেল্স এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোঃ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এনডিসসি.পিএসসি রামগড়ের অফিসটিলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর দৃষ্টিনন্দন “রাইফেল্স স্মৃতিস্তম্ব” শুভ উদ্ভোদন করেন। কালের বিবর্তনের ফলে এখানে স্থাপন করা হয় বাহিনীটির প্রতিকায়নের ইতিহাস, বাহিনীটির বিবর্তনে ফোড়ামাটির তৈরী ৮টি প্রতীকি অবয়ব, পশ্চিম পাশে সীমান্ত পিলারের অনুকরণে ৪টি আর সি সি পিলার স্থাপন করা হয়েছে যাতে রামগড় ১৭৯৫ অলংকিত করা হয়েছে এবং স্মৃতিস্তম্বের মাঝখানে ধাতব পদার্থ স্থাপন করা হয়েছে যাতে সৈনিকদের রাইফেলস এর প্রতিকী ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে।

তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট রামগড়বাসীর দাবী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)’র বিশ্বদরবারে বাহীনিটর জন্ম ইতিহাস অলংকিত রাখতে রামগড় বিজিবি ব্যাটালিয়কে সেক্টর পর্যায়ে রুপান্তর করে এখানে লোক ভর্তি কেন্দ্র স্থাপন সহ রামগড়ে একটি বিজিবি স্কুল এন্ড কলেজ নির্মান করে আগামীর নব প্রজন্মকে গড়ে তুলার আহবান জানান।

মতামত