টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

শীতবস্ত্রের প্রতীক্ষায় বন্দরনগরীর ফুটপাতের শীতার্ত মানুষ!

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ১৯ ডিসেম্বর, সিটিজি টাইমস :: রাত ১১টা। চট্টগ্রাম মহানগরীর লালদীঘি মাঠের রক্ষা দেয়ালের পাশে বসে শীতের ঘন কুয়াশা আর ঠান্ডা হাওয়ায় থরথর করে কাঁপছিল মরিয়ম বেগম (৩৩)। এক বছরের সন্তান বেলালকে কোলে নিয়ে বুকের মাঝে চেপে ধরে গরম রাখার চেষ্টা করছিলেন তিনি।

কাছে গেলেই মরিয়ম বলেন, একখান গরম কাপড় দইন বাপধন। ছাওয়ালডারে বাচইন। (অর্থাৎ একটা গরম কম্বল দেন বাবা। বাচ্চাটারে বাচান) নিজের ভাষায় তিনি আরও যা বললেন, শীতবস্ত্রের জন্য রাস্তায় বসে থাকলেও কেউ দেয়নি। শরীরে জড়ানোর মত একখানা ছেড়া কাপড়ও নেই তার। ফলে ঠান্ডায় ঘুম আসছে না তার। ঠান্ডা সহ্য করতে না পেরে কাঁদছে বেলালও।

মরিয়ম জানান, তার বাড়ি কুমিল্লার লাকসাম উপজেলায়। স্বামীর সাথে দুই বছর আগে চট্টগ্রাম শহরে আসেন তিনি। কিন্তু সন্তান হওয়ার পর স্বামীও ফেলে চলে যায়। ফলে ভিক্ষা করে জীবন কাটাচ্ছেন। সন্তানের মাথায় দেওয়ার জন্য গরম টুপি ভিক্ষা করে আনলেও তার জন্য কেউ একটি মোটা কাপড়ও দেননি।

রাত সাড়ে ১২টায় কাজীর দেউরি এলাকায় আউটার স্টেডিয়ামের পাশে সিটি কর্পোরশেনের গড়ে তোলা যাত্রী ছউানির ভেতর পাতলা কাপড় জড়িয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছেন ৬৫ বছরের বৃদ্ধ আকবর আলী। তার বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার আকুর টাকুর পাড়ায়।

তিনি বলেন, শীতের রাতে বয়ে যাওয়া ঠান্ডা হাওয়ায় আমি বরফের মত হয়ে গেছি। অনেক চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারছি না। ঠান্ডায় কাঁশি হওয়ায় অনেক কষ্ট পাচ্ছি। আর কয়েকদিন এরকম থাকলে হয়তো আমাকে আর বেঁচে থাকতে হবে না।

তিনি জানান, প্রায় ১৪-১৫ বছর আগে চট্টগ্রামে কাজের সন্ধানে ছুটে আসেন তিনি। বিয়ে অনুষ্ঠানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বয়স বেড়ে যাওয়ায় গত এক থেকে দেড় বছর ধরে কাজ করতে পারছেন না। ফলে ভিক্ষা করে পেট চালান। শীত নিবারনের জন্য একটি গরম কাপড় ভিক্ষা করলেও কেউ দেয়নি।

শীতের কবলে পড়ে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন নগরীর জেল রোডের ফুটপাতে বসে থাকা ৭৫ বছরের বৃদ্ধ নোয়াজিশ আলম খান, আমানত শাহ মাজার সড়কের মুখে মনিরুল ইসলাম (৬৬), জেলা পরিষদের সামনে সড়রে ফুটপাতে আছেন আবদুল মবিন (৬০), চট্টগ্রাম পুরাতন রেলওয়ে স্টেশনের বাইরে ৪ সন্তান নিয়ে সড়কে বসে রাত কাটাচ্ছেন মদিনা খাতুন (৩৪), বিআরটিসি এলাকায় বসে রাত কাটাচ্ছেন প্রতিবন্ধি নুুরুল ইসলাম (৩৭)।

নগরীর প্রবর্তকের মোড় এলাকায় বসে রাত কাটাচ্ছেন আমির হোসেন (৫৬), চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অভ্যন্তরে সড়কে ফুটপাতে বসে আছেন দিদারুল আলম (৪৬), লালখান বাজার গরিব উল্লাহ শাহর মাজার সড়কের ফুটপাতে বসে রাত কাটাচ্ছেন বাদশা মিয়া (৫৯) ও ফরিদা খাতুন (৩৯)।

বহদ্দারহাট এলাকায় ফ্লাইওভারের নীচে বসে রাত কাটাচ্ছেন নবীর হোসেন (৫৫)। তাদের পাশে বসে থাকা অনেকে তখন শীতের কামড়ে কাঁপছিল। তাদের কেউ ছেড়া টুকরা কাপড় পুড়িয়ে আগুনের তা নিয়ে শীত নিবারনের চেষ্টা করছেন। এছাড়া শীত বস্ত্রের অভাবে এসব এলাকায় শত শত মানুষ প্লাস্টিকের ছেড়া বস্তা, ছেড়া কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুমুচ্ছিল।

গত শনিবার দিনগত রাত ১১টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগরীর জনকোলাহলপূর্ণ বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখার সময় আলাপ হয় শীতার্ত এসব মানুষের সাথে। যারা গরম কাপড়ের অভাবে শীতে প্রচন্ড কষ্ট পাওয়ার কথা বলেন। এ সময় শীতার্তদের অনেকে গরম কাপড় চেয়ে বসেন এ প্রতিবেদকের কাছে।

শীতার্তরা বলেন, প্রতিবছর শীতে দানশীল লোকেরা শীতবস্ত্র দিত। এবার এখনো তেমন কেউ দেয়নি। সড়কের পাশে বসে শীতে কাপলেও সড়ক দিয়ে যাতায়াত করা দানশীল লোকেরা কেউ ফিরে তাকাচ্ছে না।

তারা আরও বলেন, দিনভর ভিক্ষা বা কাজ করে পেট বাঁচালেও সন্ধ্যার পর ঠান্ডা থেকে নিজেদের শরীর বাঁচাতে পারছি না। সন্ধ্যার পর কেউ কেউ আগুন জ্বালিয়ে ঠান্ডা থেকে বাঁচার চেস্টা করলেও রাতে নিথর হয়ে রাস্তার পাশে বসে থাকছে একটি গরম কাপড়ের আশায়।

তারা জানান, আগুন জ্বালানোর জন্য রাস্তার পাশে কাগজ-ঠোঙা ও টুকরা কাপড় কুঁড়িয়েও পাওয়া যায় না। গার্মেন্টস মালিকরা ছেঁড়া টুকরা কাপড়ও বিক্রির জন্য রেখে দেয়। কাগজ ও ঠোঙা কুঁড়িয়ে অনেকে তা বিক্রি করে। ফলে আগুন জ্বালানোর উপকরণও পাওয়া যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম মানবাধিকার কমিশনের ফোকাল পারসন ওয়াহিদুল আলম ওয়াহিদ জানান, নগরীতে প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার আশ্রয়হীন মানুষ আছে। সারাবছর তারা কোন না কোন প্রাকৃতিক দুযোর্গ ও প্রতিকুলতা মোকাবেলা করে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে গরম কাপড়ের অভাবে প্রচন্ড কষ্ট পায় এসব মানুষ।

তিনি বলেন, দানশীল মানুষের বিগত বছরগুলোতে ভাসমান মানুষের জন্য শীতবস্ত্র নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। এবার এখনও পর্যন্ত তেমন কেউ বা কোন সংগঠন এগিয়ে আসেনি। ফলে শীতের রাতে প্রচন্ড কষ্ট পাচ্ছে আশ্রয়হীন মানুষগুলো।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত