টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামে ব্যস্ততম সড়কগুলোর ফুটপাত হকারদের দখলে

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ১৮ ডিসেম্বর  ২০১৬ (সিটিজি টাইমস): : চট্টগ্রাম নগরীর ব্যস্ততম সবকটি সড়কের ফুটপাথ হকারদের দখলে। এসব ফুটপাথ দখল করে মাসিক ২০-২৫ হাজার টাকা চুক্তিতে ভাসমান হকারদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব দোকান থেকে সমিতির নামে দৈনিক ১০ টাকা হারে চাঁদাও আদায় করা হচ্ছে।

হকারদের হিসেব মতে, নগরীর ফুটপাথগুলোতে গড়ে উঠা প্রায় ১০ হাজার দোকান থেকে একাধিক হকার্স সমিতি চাঁদা আদায় করছে। আদায়কৃত চাঁদা থেকে ভাগ পান সংশ্লিষ্ট সবাই।

চট্টগ্রাম ফুটপাত হকার সমিতির হিসাব মতে, নগরীতে স্থায়ী ও ভাসমান মিলে প্রায় ১৫ হাজার হকার রয়েছে। যারা চট্টগ্রাম ফুটপাত হকার্স সমিতি, মেট্রোপলিটন হকার্স সমিতি, হকার্স লীগসহ বিভিন্ন সমিতির সদস্য। যাদের থেকে বড় অঙ্কের চাঁদা আদায় নিয়ে প্রায় সময় সংঘর্ষসহ অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর নিউ মার্কেট, বহদ্দারহাট, ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, চকবাজার, কাজির দেউরি, দেওয়ানহাট মোড়, আগ্রাবাদ, আন্দরকিল্লা, নাসিরাবাদ, কর্ণফুলী নতুন ব্রিজ, লালদিঘির দুই পাড়, তিনপুলের মাথা, বন্দর ফকিরহাট, পতেঙ্গা ইপিজেড এলাকা, অক্সিজেন মোড়সহ অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ফুটপাথে ৩০ বছর ধরে গড়ে উঠেছে এসব অবৈধ স্থাপনা।

এরমধ্যে সবচেয়ে বড় ফুটপাথ ব্যবসা হচ্ছে নিউমার্কেট এলাকায়। স্টেশন রোড থেকে শুরু করে রেয়াজ উদ্দিন বাজার প্রবেশ মুখ, পিডিবি অফিস, নূপুর মার্কেট, নিউমার্কেট মোড়, জলসা মার্কেট, মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট, আমতল পর্যন্ত। ওই দিকে শাহ আমানত মার্কেট থেকে বঙ্গবন্ধু ল টে¤পল পর্যন্ত। ওই এলাকায় ছোট বড় সব মিলিয়ে প্রায় তিন হাজারের উপরে দোকান রয়েছে।

একই অবস্থা নগরীর বহদ্দারহাট এলাকায়। বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারের সামনে ফুটপাথ ও গাড়ি পার্কিংয়ের নির্দিষ্ট স্থান দখল করে বসানো হয়েছে প্রায় ৫০টি দোকান। মোড়ে নালার ওপর অবৈধভাবে রয়েছে ৬০টি ফলের দোকান। তাছাড়া ওই এলাকায় সন্ধ্যার পর রাস্তার ওপর বসে কাঁচাবাজার ও শতাধিক ভ্রাম্যমাণ দোকান। অধিকাংশই স্থানীয় সন্ত্রাসীদের দখলে।

একই অবস্থা কর্ণফুলী তৃতীয় সেতু এলাকায়। ফুটপাথের বিশাল জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে প্রায় ২০টি ফলের দোকান। ফলে যানজট লেগে থাকে সব সময় ওই এলাকায়। স্থানীয় সন্ত্রাসীরা সাপ্তাহিক হারে চাঁদা নেয় তাদের কাছ থেকে।

বহদ্দারহাটের মতো নগরীর মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট, নাসিরাবাদ, অক্সিজেন মোড় বাসস্টেশন, চান্দগাঁও বাসটার্মিনাল, আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড়, বাণিজ্যিক এলাকার ব্যাংকপাড়া, কাজির দেউরি, আন্দরকিল্লা, দেওয়ানহাট মোড়সহ নগরীর অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সন্ত্রাসীরা ফুটপাথ এমনকি রাজপথ দখল করে আছে।

এসব এলাকর ফুটপাথ ও রাজপথে অস্থায়ী ও ভাসমান হকারের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজারের উপরে। তবে দোকান নিয়ে ব্যবসায় করছে প্রায় ১০ হাজার হকার। মেট্রোপলিটন হকার্স সমিতি, হকার্স লীগ, ফুটপাথ হকার্স সমিতি নামে তিনটি সংগঠন ওই এলাকায় ফুটপাথ ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ করছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ফুটপাত হকার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শফিকুর রহমান শফি বলেন, হ্যাঁ আমরা ফুটপাথে ব্যবসা করে পেট চালাই। এ জন্য আমাদেরকে খরচও দিতে হয়। কাকে খরচ দিতে হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাকে দিতে হয় সবাই জানে। আপনি জানেন না?।

প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফুটপাতে ব্যবসার কারনে যানজট সৃষ্টি হয় না। ভাসমান হকারদের কারনে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। তবে আমরা চাই সরকার আমাদের পুনর্বাসন করুক। আমরা ফুটপাথ থেকে সরে যাব। ফুটপাথের হাজার হাজার ব্যবসায়ীর পেটে লাথি দিয়ে তো দেশের উন্নয়ন হতে পারে না।

হকাররা জানান, তারা মাসিক ২০-২৫ হাজার টাকা চুক্তিতে এসব ফুটপাথ কিনে নিয়েছে। সমিতির নামেও প্রতিদিন প্রতিটি দোকান থেকে ১০ টাকা চাঁদা তোলা হয়। তার থেকে বিভিন্ন স্থানে চাঁদা দেয়া হয়। এ ছাড়া প্রায় ৪০ জন কমিউনিটি পুলিশের বেতন দেয়ার পর বাকি যা থাকে সব সমিতির ফান্ডেই জমা হয়।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তাদের দোকানের সামনে একেবারে আড়াল করে চলছে ফুটপাথ ব্যবসা। ফুটপাথ ও রাজপথ দখল করে দোকান বসানোর কারণে বঙ্গবন্ধু ল টে¤পল, মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুল ও অধিকাংশ মার্কেট দেখা যায় না। অনেকবার বলার পরও কোনো কাজ হয় না। এ ব্যাপারে চসিক ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশ একবার উচ্ছেদ করলেও কয়েকঘন্টার মধ্যে আবারও দখল হয়ে যায় ফুটপাত।

ফুটপাত দখলের কারণে পেশাজীবি মানুষের পাশাপাশি স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরাও পড়ে নানা দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনায়। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র তৌহিদুল হাছান বলেন, হকারদের কারণে ফুটপাত ছেড়ে রাস্তায় হাঁটতে হয়। ফলে যানবাহনে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলতে হয়। কোন সময় দুর্ঘটনা ঘটে এই শঙ্কায় থাকতে হয়।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, ফুটপাত দখলে ভাসমান হকারদের পূনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। হকার্স সমিতির সাথে এ ব্যাপারে আলোচনাও হয়েছে। এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।

ফুটপাথ দখলে পুলিশ প্রশাসনের যোগসাজশ সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, ফুটপাথ দখল উচ্ছেদে পুলিশ তো অভিযান চালায়। এরপরও পুলিশ প্রশাসনের যোগসাজশ থাকার কথা বলা ঠিক নয়। বরং রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে ফুটপাথ দখল করে হকাররা ব্যবসা করছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, পুলিশ এদিকে উচ্ছেদ করলে কিছুক্ষণ পর আবার ফুটপাথ দখল হয়ে যায়। পুলিশ তো আর হকারদের সারাক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখতে পারবে না।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত