টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

নগরজুড়ে নকল জুতার হাট, ঠকছেন ক্রেতারা

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ১৭ ডিসেম্বর  ২০১৬ (সিটিজি টাইমস):: নগরীর হালিশহর কে ব্লকের বাসিন্দা এনামুল করিম (৪২)। বেসরকারি একটি ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পানীতে চাকরি করেন। বেতন যা পান তা দিয়ে সংসারে টানাটানি। তাই বলে পেটের ক্ষুধা আর শরীরের কাপড় ও পায়ে জুতো না পড়ে পারছেন না।

এনামুল করিমের ভাষ্য, টাকার অভাবে অভিজাত মার্কেটের বড় দোকানগুলোর দিকে চোখ দিতেই আঁতকে উঠেন তিনি। শেষমেষ চোখ দেন নগরীর আগ্রাবাদ এলাকার ফুটপাতে জুতো ও কাপড় বিক্রীর দোকানের দিকে। সেখানে গিয়ে ৩৪০ টাকায় একজোড়া চামড়ার সেন্ডেল কেনেন তিনি।

একইভাবে কলেজ পড়ুয়া মেয়ের জন্য ২৫০ টাকায় এবং স্কুল পড়ুয়া ছেলের জন্য ৪০০ টাকায় এক জোড়া জুতো কিনে যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন তিনি। কিন্তু তিনদিন পর নিজের পায়ের সেন্ডেল হাতে নিয়ে অফিস থেকে বাড়ি ফিরেন তিনি। এ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন তিনি।

তিনি জানান, ঠিক পরের দিন কলেজ পড়ুয়া মেয়ে জুতো হাতে নিয়ে এসে বললেন, বাবা এগুলো কি জুতো কিনেছেন তলা উঠে গেছে। এ নিয়ে যা লজ্জা পেলাম সহপাঠিদের কাছে। ১৫ দিন পর জুতোর তলা আলাদা হওয়ার অভিযোগ স্কুল পড়ুয়া ছেলেরও। আর এ নিয়ে ভাবলাম, কি জুতো কিনলাম। সব নকল জুতো। হিসেব করে দেখলাম; এসব জুতো কিনে লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি হলো।

তিনি জানান, চট্টগ্রাম মহানগরীর আগ্রবাদ এলাকার ব্যাংক পাড়ায় প্রতিদিন নকল জুতার পসরা নিয়ে বসে বিক্রেতারা। যেখান থেকে জুতো কিনে প্রতিনিয়ত ঠকছেন ক্রেতারা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু ব্যাংকপাড়া নয়, নগরীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও ব্যস্ততম এলাকার বাদামতলী মোড়, সিলভার ¯পুন হোটেলের বিপরীতে, সোনালী ব্যাংকের সামনে, আখতারুজ্জামান সেন্টারের পশ্চিম পাশে রাস্তার ফুটপাতে ও পিছনে, হোটেল সেন্ট মার্টিনের পিছনে, ইস্টার্ন ব্যাংকের সামনে, কমার্স কলেজ রোড, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সামনে, অগ্রণী ব্যাংকের সামনে, আগ্রাবাদ হোটেল রোডসহ আরো অনেক এলাকায় ভাসমান হকাররা বসেছেন বাহারি পণ্যের পসরা সাজিয়ে। এ ব্যবসায় লাভবান হওয়ার কথা জানান ব্যবসায়ীরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা। অফিসগুলোতে ছুটির ঘণ্টা। আর এ সময় ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে ব্যস্ত বিক্রেতারা। সারাদিন বেচাবিক্রি চলতে থাকলেও সন্ধ্যার সময় জমজমাট ফুটপাতের এ দোকানগুলো।

দোকানগুলোতে বিভিন্ন র্ব্যান্ডের জুতার পাশাপাশি পরিধেয় নানা সামগ্রীও দেখা গেল। শার্ট, জিন্স, গাভার্ডিং কাপড়ের ট্রাউজারসহ ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শীতে কাপড়ও যুক্ত হয়েছে ভাসমান দোকানগুলোতে। প্রায় দেড়শ ভাসমান জুতা দোকানি রয়েছে ব্যাংকপাড়ার এ ফুটপাতে।

দাম কমায় থাকায় মধ্যবিত্ত ও নিম্মবিত্ত শ্রেণীর ক্রেতারা পছন্দের কেনাকাটাও করছে এসব দোকানগুলোতে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকেও কোনাকাটা করতে আসছে অনেকে।

আগ্রাবাদ সিডিএর বাসিন্দা রুবেল হোসেন বলেন, গত দুই বছর ধরে ফুটপাতের এসব জুতা কিনে পড়ছি আমি। অভিজাত মার্কেটে অতিরিক্ত দামের কারণে পছন্দের জুতা কেনা প্রায় অসম্ভব। ফটিপাতের জুতোগুলো নিম্মমানের হলেও স্টাইলিশ। কম দামে এমন জুতা বড় দোকানগুলোতে কখনও পাওয়া যায় না। জুতোগুলো কিনে ২০ থেকে ৩০ টাকায় সেলাই করে দিলে ৫-৬ মাস পড়া যায়।

কম দামে কীভাবে জুতা বিক্রি সম্পর্কে জানতে চাইলে দোকনদার হানিফ বলেন, আমাদের জুতাগুলো অরিজিনাল। এগুলো আমরা ঢাকা থেকে সংগ্রহ করি। অনেক জুতা আবার দালালরা কৌশলে বিভিন্ন ইপিজেড থেকে বের করে এনে আমাদের কাছে বিক্রি করে। রিজেক্টেড হওয়া জুতাও আমরা কম দামে সংগ্রহ করে থাকি। তবে রিজেক্টেড হলেও জুতাগুলো টেকসই ও আকর্ষণীয়। ঢাকার বঙ্গবাজার থেকেও এখানে বিভিন্ন র্ব্যান্ডের স্যান্ডেল আনা হয়। ফুটপাতে দৈনিক দুই থেকে চারশ টাকা ভাড়া দিতে হয়। ভাড়ার পরিমাণ কম বলেই এখানকার দোকানিরা সামান্য লাভে জুতা বিক্রি করতে পারলেই খুশি।

ফুটপাতের সম্মুখভাগের দোকানি কামাল উদ্দিন বলেন, এখানে সুলভ মূল্যে হাসপাপিস, ম্যাক্স হ্যারিস, পোলো, জারা, বেলভেট, লোপার কিংবা ওয়ানম্যান র্ব্যান্ডের সব জুতাই মিলে। যে কেউ এখান থেকে ভালো মানের জুতা কিনতে পারেন ১০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে। অথচ একই জুতা কিনতে অভিজাত শপিং মলগুলোতে কয়েক গুণ বেশি টাকা গুণতে হবে।

জুতা কিনতে আসা ব্যাংকার আসলাম চৌধুরী জানালেন, অভিজাত মার্কেট থেকে জুতা কিনতে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা লাগে। ফুটপাথ থেকে এক জোড়া জুতা ১০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। তাই সেখান থেকে কিনি। তবে এ জুতা বেশিদিন টিকে না। সেলাই করে পায়ে দিলে কিছুদিন ব্যবহার করা যায়। গরিব হয়ে জন্মেছি এর চেয়ে তো বেশি কিছু আশা করতে পারি না।

তিনি আরও বলেন, দাম কম হওয়ায় বছরের ৪ বার কিনলেও নতুন জুতো পায়ে দেওয়া যায়। তাছাড়া নতুন নতুন স্টাইলের জুতো পাওয়া যায়। তাই বেশি দামে টেকসই জুতো কিনে পায়ে না পড়ার এটাও একটি কারন বলে জানান আসলাম চৌধুরী।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত