টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মিরসরাইয়ের অরক্ষিত বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি 

চট্টগ্রাম, ১২  ডিসেম্বর  ২০১৬ (সিটিজি টাইমস):  মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৪৫ বছর পরও চিহ্নিত হয়নি মিরসরাইয়ের বধ্যভূমিগুলো। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন উপজেলার বেশ কয়েকটি স্থানে গণকবর দেয়া হলেও সেসব বধ্যভূমিগুলো রয়েছে এখনো অরক্ষিত। উপজেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের পক্ষ থেকেও এ যাবত কোন উল্লেখযোগ্য তৎপরতাও লক্ষ্য করা যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাটি মিরসরাইয়ে মাইক্রোফোনের মাধ্যমে প্রচার করা হয়। তারপরই সারাদেশের ন্যায় মিরসরাইয়ে মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে নেমে পড়েন আবাল বৃদ্ধ থেকে শুরু করে সব পেশাজীবীরা। মিরসরাইয়ের প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন। মিরসরাই ছাড়াও পাশ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা-উপজেলাগুলোতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন মিরসরাইয়ের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তির লড়াইয়ে শহীদ হন মিরসরাইয়ের ৪২ মুক্তিযোদ্ধা। এছাড়া মিরসরাইয়ের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধকালীন গণকবর দেয়া হয়। উপজেলার সবচেয়ে বড় বধ্যভূমিটি হচ্ছে মিরসরাই রেল স্টেশন রোডের লোহারপুল এলাকায়। স্বাধীনতার ৪০ বছর পর এই বৃহত্তম বধ্যভূমি এলাকায় চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের উদ্যোগে ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় স্মৃতিস্তম্ভ। নির্মানাধীন স্মৃতিস্তম্ভে ২০১১ সালে প্রথমবারের মতো মিরসরাই হানাদার মুক্ত দিবস উপলক্ষ্যে ৮ ডিসেম্বর স্বাধীনতার শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। বর্তমানে দু:সহ স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিরসরাই রেল ষ্টেশনের লোহার ব্রীজ। এখানে হানাদাররা মুক্তিকামী মানুষদের ধরে এনে এই ব্রীজে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করতো। পরে নিচের খালে ভাসিয়ে দেয়া হতো নিরীহ গ্রামবাসী ও মুক্তিযোদ্ধাদের লাশ।

এছাড়া উপজেলার ১ নম্বর করেরহাট ইউনিয়নের পাহাড়ীয়া লোহারপুল, করেরহাটের ফেনী নদীর পাড়, হিঙ্গুলী সেতু সংলগ্ন, মিরসরাই সদরের অছি মিয়ার পুল, হিঙ্গুলী কোর্টের পাড়, ছুটি খাঁ দিঘীর পাড়, মস্তাননগর হাসপাতাল, ঝুলনপোলসহ অর্ধশতাধিক স্থানে নীরিহ মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করে গণকবর দেয়া হয়। মিরসরাই রেল স্টেশন এলাকায় শতাধিক লোককে একই স্থানে কবর দেয়া হয় বলে জানা গেছে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ১৯৭২ সালের ৩ মে উপজেলার ২ নম্বর হিঙ্গুলী ইউনিয়নের পশ্চিম হিঙ্গুলী গ্রামে জঙ্গলঘেরা একটি অন্ধকার পুকুর থেকে ৮৩ টি নরকঙ্কাল পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, সাধারণ মানুষকে হত্যার পর ওই পুকুরে ফেলে দেয়া হয়েছিল। পাক বাহিনীর আক্রমণ থেকে পরিত্রান পেতে মুক্তিযোদ্ধারা ফেনী নদীর ওপর বয়ে যাওয়া ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল সড়কের দক্ষিনাংশ ধ্বংস করে দিলে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে পাক বাহিনীর সদস্যরা। তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানের প্রায় ২৪০ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে ফেনী নদীতে ভাসিয়ে দেয়। পরবর্তীতে ওই স্থানটিও বধ্যভূমিতে পরিণত হয়। শুভপুর ব্রীজের দুই পাশে এবং ব্রীজের মাঝখানে বহু লোককে পাকবাহিনীরা হত্যা করে ফেনী নদীতে ফেলে দিয়েছিল। হিঙ্গুলী ব্রীজের উত্তর পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন একটি বধ্যভূমি রয়েছে। এখানে ও বহু লোককে হত্যা করে ফেলে রাখা হতো। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে তাদের হাড়, মাথার খুলি খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল ওই স্থানে।

জানা যায়, হিঙ্গুলী ব্রীজের উত্তর পার্শ্বের বধ্যভূমিতে নুরুল হুদা মেম্বার, মিয়া সওদাগর, মুন্সি মিয়া, আমিন মিয়া, আবু তাহের, আবুল কালাম ও তার ভাই সিদ্দিক আহম্মদ, মকবুল আহম্মদ, সাবিদ আলী, খায়েজ আহম্মদ, নুর আহম্মদ, হোরা মিয়া, দলিলুর রহমান, সিদ্দিক আহম্মদ, উপেন্দ্র বাবুসহ অসংখ্য মানুষকে ধরে এনে পাকবাহিনী হত্যা করে। পাশ্ববর্তী হিঙ্গুলী কোর্টের পাড় ও জামালপুর বধ্যভূমিতে অন্তত অর্ধশতাধিক লোককে হত্যা করে ফেলে দেয়। হিঙ্গুলী ব্রীজ সংলগ্ন বধ্যভূমিটিতে মুক্তিযুদ্ধের পরপর ১৯৭২ সালে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও বর্তমান মিরসরাই উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সহকারী কমান্ডার এমএম কামাল পাশাসহ একাধিক ব্যক্তি ও মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতায় একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়। ২০১২ সালে ওই বধ্যভূমিটিতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।

সূত্র মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী দেশের নিরীহ মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করে একেকটি কবর ১৫-২০ টি লাশ ফেলে রেখেছিল। পরবর্তীতে সরকার ওই স্থানগুলোকে বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করে এর যথাযথ সুরক্ষার নির্দেশ দেয়। কিন্তু দীর্ঘ ৪৫ বছরেও মিরসরাইয়ে কোন বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়নি। সবগুলো বধ্যভূমি বর্তমানে বিলীন হওয়ার পথে রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনী ফেনী নদীর উপর নির্মিত রেল সেতুর দক্ষিণ অংশ (মিরসরাইয়ে হিঙ্গুলী ইউনিয়নে অবস্থিত) ধ্বংস করলে পাকবাহিনী ক্ষিপ্ত হয়ে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার একটি গ্রাম থেকে ২৪০ জন নিরীহ লোককে ধরে এনে এখানে হত্যা করে যা বধ্যভূমিতে পরিণত হয়। প্রত্যক্ষদর্শী মুক্তিযোদ্ধাদের মতে এমন কোন দিন ছিল না এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেনি। জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের ছুটি খাঁ দীঘির দক্ষিণ পূর্ব কোনে ছিল বধ্যভূমি। সেখানে নাম না জানা বহু লোককে হত্যার পর লাশ ফেলে রাখা হয়েছিল। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চলাচলরত বাসসহ অন্যান্য যানবাহন থেকে বাঙালীদের ধরে এনে হত্যা করে ছুটি খাঁ দিঘীর পাড়ে ফেলে দেয়া হতো। মস্তাননগর হাসপাতালের পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন একটি বধ্যভূমি রয়েছে। শতাধিক মানুষকে ধরে এনে বিভিন্ন সময় পাকবাহিনী ও রাজাকাররা হত্যা করে ইছাখালী ইউনিয়নের ঝুলনপোলের পশ্চিম পাশের বধ্যভূমিতে ও বাঙালীদের লাশ ফেলে রাখা হয়েছিল। মিরসরাই সদর ইউনিয়নের তালবাড়িয়া বধ্যভূমিতেও পাকবাহিনী বহু বাঙালীর লাশ ফেলে রাখা হতো। বধ্যভূমি ছাড়াও মিরসরাইয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য গণকবর। নিরীহ গ্রামবাসীও মুক্তিযোদ্ধাদের সারিবদ্ধ করে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যার পর বড়সড় একটি কবর খুঁড়ে একই সাথে ১৫-২০টি পর্যন্ত লাশ কবর দিয়ে দেয়া হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে মিরসরাই উপজেলা বধ্যভূমির তালিকা চাওয়া হয়েছিল। এবিষয়ে মিরসরাই মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও উপজেলা প্রশাসনের কোন উদ্যোগ এখনো পর্যন্ত চোখে পড়েনি। প্রতিবছর ডিসেম্বর আসলে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানমালা আর মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলা উদ্যাপন করেই দায়িত্ব সারেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের কাছে দেশের মুক্তিযুদ্ধে মিরসরাইয়ের ভূমিকা তুলে ধরার জন্য কোন ইতিহাস সৃষ্টির পক্ষে কারো কোন তৎপরতা নেই। এভাবে চলতে থাকলে নবপ্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধে মিরসরাইয়ের অংশগ্রহণ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা অজানা থেকে যাবে।

মিরসরাইয়ের ৭ নম্বর কাটাছরা ইউনিয়নের তেমুহানী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আগামী প্রজন্মের কাছে ইতিহাস হিসেবে শেষ চিহ্ন হলো বধ্যভূমি। তাই বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া এখনই জরুরী।’

মিরসরাই সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এবং মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক জাফর উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী বলেন, ‘বধ্যভূমিগুলো আমাদের স্বাধীনতার স্মৃতির উপকরণ। সুতারাং এখনই বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া একান্ত অত্যাবশ্যকীয় কাজ।’

মিরসরাই উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা ডেপুটি কমান্ডার আবুল হাশিম জানান, ‘বধ্যভূমির একটি তালিকা ২০১১ সালের শুরুতে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ বরাবরে পাঠিয়েছিলাম। এরপর উপজেলার মিরসরাই রেল ষ্টেশন রোড়ের লোহারপুল বধ্যভূমি ও মহালংকা বধ্যভূমিতে জেলা পরিষদ থেকে দুইটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। এছাড়া অন্যান্য বধ্যভূমিগুলো সরকারীভাবে উদ্যোগ নেয়া হলে সংরক্ষণ করা যাবে। যারা দেশের জন্য প্রাণ দিয়ে গেছেন তাদের শেষ স্মৃতিটুকু রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।’

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত