টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

সবজি ও শুটকির বিষাক্ত গন্ধ চট্টগ্রামে হাটবাজারগুলোতে

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ০৯  ডিসেম্বর  ২০১৬ (সিটিজি টাইমস):  চট্টগ্রামের হাটবাজারে আসছে শীতকালীন সবজি ও শুটকি। কিন্তু এসব সবজি ও শুটকিতে নাক দিলেই বিষাক্ত গন্ধ। যা প্রতিনিয়ত খেয়ে দীর্ঘমেয়াদি নানা অজানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে জনস্বাস্থ্য।

ক্রেতারা জানান, নগরীর সবকটি বাজারেই শুটকির দোকানের পাশ দিয়ে হাটা যায় না। বিষাক্ত গন্ধে নাক ঢেকে রাখতে হয়। একই অবস্থা সবজির দোকানেও। তবে সবজির বিষের গন্ধ সচারচার নাকে লাগে না। সবজি নাকে লাগালেই পাওয়া যায় বিষের গন্ধ।

বিক্রেতারাও জানেন, সবজি ও শুটকিতে বিষ মিশ্রিত আছে। তবে তাদের অনেকে মনে করেন এসব সবজি খেলে মানুষ মরে না। ফলে বিষয়টি তাদের কাছে ত’চ্ছ একটি ব্যাপার।

আজ শুক্রবার সকালে নগরীর বহদ্দারহাটে সরেজমিনে কথা হয় সবজি বিক্রেতা আবুল হাসেমের সাথে। তার বাড়ি চন্দনাইশ সাতবাড়িয়া এলাকায়। তিনি বলেন, চন্দনাইশের চাগা চর থেকে সবজি এনে বিক্রী করি আমি।

কিন্তু সবজিগুলো বিষমুক্ত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষ না দিলে সবজিতে পোকা ধরবে, রোগা হবে। বিষ না দিলে সবজি হবে কি করে। একইভাবে শুটকি বিক্রেতা নজির আহমদ বলেন, পোকা না ধরার জন্য শুটকিতে ওষুধ (বিষ) মিশাতে হয়। তবে এ ওষুধে মানুষ মরে না।

পোকা ও রোগ দমনে সবজি ও শুটকিতে দেদারছে ব্যবহার হচ্ছে কীটনাশক মেশানোর কথা স্বীকার করেন অসংখ্য ব্যবসায়ী।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম ও আশপাশের জেলার উপজেলাসমূহে উৎপাদীত নানারকম সবজি ও শুটকির নমুনা পরীক্ষায়ও পাওয়া গেছে মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশকের উপস্থিতি।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরিতে (এনএফএসএল) চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন হাটবাজার থেকে সংগৃহীত ৬৩টি সবজির নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এরমধ্যে ১৭ শতাংশে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের এ পর্যন্ত ৪৩২ট সবজির নমুনা পরীক্ষা করে ২৩ শতাংশে মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক পায়। নমুনাগুলোর মধ্যে সবকটি সবজিই মানুষ নিত্যদিন খাচ্ছে বলে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্র জানায়।

সুত্র জানায়, ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় ১০টি শিমের নমুনার মধ্যে চারটিতে, কাঁচা মরিচের ১৫টি নমুনার মধ্যে চারটি, আলুর ১২টি নমুনার মধ্যে তিনটি, টমেটোর ১৬টি নমুনা ও বেগুনের ১০টি নমুনার সবকটিতে মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক পাওয়া যায়। শুঁটকির ১৮টি নমুনার মধ্যে তিনটিতে ও দুটি র্ব্যান্ডের হলুদের গুঁড়োয় মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক পাওয়া যায়।

কৃষি গবেষণা ইনিস্টিটিউটের পরীক্ষায় চিচিঙ্গা, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পটল, বেগুন, শসা, ঢেঁড়শ, করলা ও ধনেপাতার মোট ৪৩২টি নমুনা পরীক্ষা করেন। এরমধ্যে ২৩ শতাংশে মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক পাওয়া যায়। শুঁটকির ৪৩টি নমুনার ৭৪ শতাংশে, চিংড়ির ৪৯টি নমুনার সাতটিতে কীটনাশক পাওয়া গেছে।

প্রতিষ্ঠান দুটির গবেষণা বিবরণী মতে, সবজিতে ডাইমেটওয়েট, এসিটামিপ্রিড ও মেথালিক্সিন জাতীয় কীটনাশক বেশি পাওয়া গেছে। হলুদের গুঁড়োয় পাওয়া গেছে ক্লোরেপাইরিফিস নামের কীটনাশক। তবে শুঁটকিতে অ্যালড্রিন ও ডিডিটি পাওয়া গেছে। ডিডিটির ব্যবহার সারা বিশ্বে নিষিদ্ধ।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শফিউল আজম জানান, কীটনাশক দীর্ঘদিন ধরে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি হারে মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে তা একসময় দুরারোগ্য রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের হুমকির মুখে আলাদা ব্যবস্থায় সবজি চাষের ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু দেশের মানুষের জন্য সরকারের উদ্যোগ নেই।

তিনি বলেন, ১৯৮১ সালে শুরু হয়ে সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনায় (আইপিএম) এখন পর্যন্ত ২০ শতাংশ কৃষককেও প্রশিক্ষিত করা যায়নি। এ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের আলাদা কোনো বাজার শৃঙ্খলও নেই। আইপিএমের মাধ্যমে উৎপাদিত নিরাপদ সবজি সাধারণ সবজির সঙ্গেই বাজারে আসছে। ফলে মানুষের আগ্রহ থাকলেও কীটনাশকমুক্ত সবজি কেনার সুযোগ থাকছে না।

চট্টগ্রামের কৃষি গবেষক আলী হায়দার বলেন, রোগ ও কীটনাশকমুক্ত শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানির জন্য একটি অ্যাকশন প্ল্যান বা কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর আওতায় পাঁচটি মূল বিষয়ে উন্নতির জন্য কাজ করা হচ্ছে। এগুলো হলো- ১. রপ্তানির জন্য তালিকাভুক্ত চাষির মাধ্যমে চাষ, ২. সনদ জালিয়াতি রোধে ব্যবস্থা, ৩. পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ৪. পরীক্ষাগারের জন্য উপকরণ কেনা ও ৫. পেস্ট রিস্ক অ্যানালাইসিস।

সবজি ও ফল রপ্তানির জন্য কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের ফাইটোস্যানিটারি সনদ লাগবে। বাংলাদেশ ফাইটোস্যানিটারি সামর্থ্য শক্তিশালীকরণ প্রকল্প নামের ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল মেয়াদি একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় পরীক্ষাগার স্থাপনসহ বেশ কিছু উপকরণ সংগ্রহ করা হবে।

কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, শাকসবজি ও ফলমূল রোগমুক্তভাবে উৎপাদনে আলাদা চাষের এলাকা ও চাষিদের তালিকা করা হচ্ছে। চাষিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। চুক্তিবদ্ধ চাষের এলাকা পরিদর্শন করে উৎপাদিত পণ্য প্রত্যায়ন করবেন ডিএইর কর্মকর্তারা। এরপর নির্দিষ্ট জায়গায় তা মোড়কজাত ও পরীক্ষা করে ইউরোপে রপ্তানি করা হবে।

স¤প্রতি ডিএই ফাইটোস্যানিটারি সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা জারি করেছে। এর ফলে সবজি রপ্তানি কমে গেছে ব্যাপকভাবে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রায় ১০ কোটি ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৩০ শতাংশ কম। কিন্তু দেশের বাজারে কীটনাশক ও রোগমুক্ত পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে ঢিমেতাল লক্ষণীয়।

চট্টগ্রাম জেলা কৃষি কার্যালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার দায়বদ্ধ থাকে দেশের মানুষের কাছে। কিন্তু তাদেরই স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য না খাইয়ে আমরা বিদেশের জন্য ভালো মান বজায় রাখতে বেশি তৎপর, এটা দুঃখজনক। সরকারের উচিত জনগণের নিরাপত্তার দিকেও দৃষ্টি দেওয়া।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে বছরে ২৯ লাখ টন সবজি উৎপাদিত হয়। আলু হয় ৮০ লাখ টনের বেশি। এর খুব সামান্য অংশ রপ্তানি হয়, সিংহভাগ খায় দেশের মানুষ। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষকরা কোন সময় কোন মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করবে তা জানে না। তারা ডিলারের কাছ থেকে কীটনাশক কিনে তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করে এবং কীটনাশক প্রয়োগের পরপরই সেই সবজি বাজারে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, আমরা কীটনাশকযুক্ত যেসব শাকসবজি খাচ্ছি তা শেষ পর্যন্ত পাকস্থলীতে জমা হচ্ছে। দুরারোগ্য রোগের এটিও একটি বড় কারণ।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কৃষি কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, এসব ব্যবস্থা শুধু রপ্তানির জন্য নয়, পুরো দেশের জন্যই নেওয়া হচ্ছে। কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় আইপিএম ক্লাব করা হয়েছে। এতে দেশে কীটনাশকের ব্যবহার কমে এসেছে। আগামী দিনে আইপিএমকে ইন্টিগ্রেটেড ক্রপ ম্যানেজমেন্টে (আইসিএম) রূপান্তরিত করা হবে। তিনি বলেন, আমরা চাই ঝুঁকিমুক্ত খাবার উৎপাদন করতে। এ জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।

তবে এই আইপিএমের গতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ১৯৮১ সালে এ ধারণা বাংলাদেশে আসে। এরপর প্রায় তিন দশক ধরে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া চলছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কৃষকদের বড় অংশের কাছে এটি পৌঁছানো যায়নি। অবশ্য দেশে কীটনাশকের ব্যবহার কমছে। ২০০৮ সালে ৪৮ হাজার ৬৯০ টন কীটনাশক আমদানি হয়েছিল। ২০১৩ সালে তা কমে ৩৭ হাজার ৭৮১ টনে নামে।

সবজি বিক্রির নির্দিষ্ট সময় আগে কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ করতে হয়। যাতে এর অবশিষ্টাংশ বা রেসিডিউ থেকে না যায়। আইপিএমে কীটনাশকের ব্যবহার হয়, তবে তা অনেক কম। আইপিএম প্রকল্পের পরিচালক মোবারক আলী জানান, এখন পর্যন্ত ২০ শতাংশ কৃষককেও আইপিএম প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হয়নি।

ভলান্টারি কনজ্যুমার ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস সোসাইটির (ভোক্তা) নির্বাহী পরিচালক খলিলুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, সবজি ও শুটকিতে কীটনাশক ব্যবহার হয় একেবারে উৎপাদন পর্যায়ে। ফলে বিক্রয় পর্যায়ে আইন প্রয়োগ করলেও তার সুফল তেমন আসবে বলে মনে হয় না। উৎপাদন পর্যায়েই ব্যবস্থা নিতে হবে কৃষি ও মৎস্য বিভাগকে। তবে আইপিএমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের আলাদা বাজার থাকলে ক্রেতার সুবিধা হতো। পাশাপাশি ভালো দাম পেয়ে কৃষকরাও ওই পদ্ধতির চাষে ঝুঁকতেন।

# ইব্রাহিম খলিল, ৯.১২.১৬ ইং #

মতামত