টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামে মুখ থুবড়ে পড়েছে শিল্প-বিনিয়োগ!

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ০৮  ডিসেম্বর  ২০১৬ (সিটিজি টাইমস): চট্টগ্রাম শহরের দক্ষিণে কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের কোলে অবস্থিত আনোয়ারা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান। অথচ এখানে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে বিপাকে পড়েছে একাধিক শিল্পগোষ্ঠি। যাদের কয়েকটি কারখানা উৎপাদনে যেতে পারছে না শুধুমাত্র জ্বালানি সংকটের কারনে।

এরমধ্যে অন্যতম ন্যাশনাল সিমেন্ট কারখানা। প্রিমিয়ার সিমেন্টের দ্বিতীয় ইউনিট এটি। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক জানান, কারখানা স¤প্রসারণে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের কর্মসূচি রয়েছে কো¤পানির। কিন্তু গ্যাস পাওয়ার অনিশ্চয়তায় সামনের দিকে যাওয়া যাচ্ছে না। অথচ এই বিনিয়োগ সম্ভব হলে সেখানে নতুন করে কর্মসংস্থান হতো, উৎপাদান বৃদ্ধি পেতো। বিভিন্ন খাতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়তো।

চট্টগ্রামে শিল্পে বিনিয়োগে এমন দুরবস্থা কেবল একটি কো¤পানির নয়। এখানকার সব উদ্যোক্তা, শিল্প মালিক এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন। যারা আগে বিনিয়োগ করেছেন তারাও বিপাকে। তাদের হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ পরিকল্পনা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।

কারণ হিসেবে কয়েকজন বললেন, শুধু গ্যাস নয়, জমি, শিল্প ঋণের যেসব সমস্যা চট্টগ্রামে বিরাজমান, সেগুলো নেই রাজধানীর আশে-পাশে শিল্প এলাকায়। তাই ওখানে শিল্প কারখানা স্থাপন অনেক সুবিধাজনক।

চিটাগাং চেম্বার সুত্র জানায়, চট্টগ্রামে বিভিন্ন স্থানে অনেক কারখানা সবকিছু তৈরির পরও কেবল গ্যাসের অভাবে পুরোদমে উৎপাদনে যেতে পারছে না। চালু হওয়ার আগেই দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে কোন কোন কারখানা। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কো¤পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)-এর ডিমান্ড নোট অনুসারে টাকা জমা দিয়েছে, সার্ভিস লাইন ও অভ্যন্তরীণ লাইন স্থাপন করে গ্যাস সংযোগের জন্য অপেক্ষায় রয়েছে।

শুধু যে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে এখানে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না, তা নয়। যারা এখানে শিল্প-কারখানা পরিচালনা করবেন তাদের সন্তানদের জন্য ভাল মানের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন। উন্নত মানের হাসপাতাল দরকার। এ সুবিধাগুলো নেই এখানে। শিল্প-কারখানা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ ও পেশাদার লোকজন এসব অসুবিধা বিবেচনায় চট্টগ্রামে থাকতে চান না। এটাও অন্যতম সমস্যা। বললেন, বিজিএমইএ-র সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি ও চিটাগাং স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)-এর পরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী।

তিনি বলেন, শিল্প স্থাপনের উপযোগী জমির অস্বাভাবিক মূল্য বিনিয়োগ না হওয়ার অন্যতম কারণ। ঢাকার আশে-পাশে শিল্পের জমির বিঘা ৫ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকার মধ্যে। আর চট্টগ্রামে কমপক্ষে ৮০ লাখ টাকা। এমন অস্বাভাবিক দরে জমি কিনে শিল্প স্থাপন ও লাভজনক পরিচালনা সম্ভব নয়।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চট্টগ্রামে ১৯৯০ সালের পর আর কোন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হয়নি। চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (সিইপিজেড), কর্ণফুলী ইপিজেড, ষোলশহর, কালুরঘাট, ফৌজদারহাট এবং সাগরিকা বিসিক শিল্পনগরীর কোথাও আর কোন জায়গা খালি নেই শিল্প স্থাপনের মত। কোরিয়ান ইপিজেড কর্তৃপক্ষকে দেয়া আড়াই হাজার একর জমির মধ্যে মাত্র ৫০০ একর ভ‚মি হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকী জমি এখনও বুঝিয়ে দেয়া হয়নি তাদেরকে। সেই ৫০০ একরে আর প্লট খালি নেই।

চিটাগাং চেম্বার পরিচালক ও বিন হাবিব লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম হাবিবুল হক বলেন, ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকার তারল্য উদ্বৃত্ত। কিন্তু তারপরও ব্যাংক ঋণ শিল্পে বিনিয়োগের পথে অন্তরায় চট্টগ্রামের উদ্যোক্তাদের জন্য। কারণ সব ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় রাজধানীতে। তাই চট্টগ্রাম থেকে ব্যাংক ঋণ পাওয়া যে কি হয়রানি ও সংকটের তা কেবল ভুক্তভোগীরাই অনুধাবন করতে পারেন, আর কেউ নয়। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার শিল্পে বিনিয়োগে বড় বাধা। অপর এক শিল্পপতি বললেন, বিনিয়োগে সমস্যা হয়ে আছে ব্যাংকের সুদ। এখনও সুদের হার প্রায় ২০ শতাংশের কাছাকাছি ঘুষ-দুর্নীতি মিলিয়ে। এত চড়া সুদে শিল্পে বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন অনেক সমস্যার।

তিনি বলেন, অতীতে সব বড় শিল্প-কারখানা স্থাপিত হয়েছে চট্টগ্রামে। বহুজাতিক কো¤পানিগুলো তাদের প্রধান কার্যালয় স্থাপন করেছিল এখানে। কিন্তু সব সুযোগ-সুবিধা রাজধানীতে কেন্দ্রীভ‚ত হওয়ায় তারা এখান থেকে প্রধান কার্যালয় গুটিয়ে নিয়ে গেছে। চট্টগ্রামের শিল্প উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগ করছেন রাজধানীর আশে-পাশে, গাজীপুর, ময়মনসিংহে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে বুঝা যায়, প্রতিবছর চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিনিয়োগের হার কমছে। তাতে হ্রাস পেয়েছে কর্মসংস্থান। ২০১০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর বিনিয়োগ হয়েছে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি। অতীতের ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর তা আরও বৃদ্ধির কথা হলেও হয়েছে বিপরীত। ২০১৫ সালে বিনিয়োগ কমে ১৩৫০ কোটিতে নেমে এসেছে।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১০ সালে নিবন্ধন হয় ২৯৮টি প্রকল্প। এগুলোতে বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল ৩,১০৬ কোটি। পরের বছর ২৫১ টি প্রকল্পের বিপরীতে বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল ২,৯৯৪ কোটি টাকা। ২০১২ সালে ২২৮টি প্রকল্পে ২,২৫৮ কোটি টাকা, ২০১৩ সালে ১৫৬ টি প্রকল্পে ২৩৪৪ কোটি টাকা, ২০১৪ সালে ১৪৮টি প্রকল্পে ১৩০৪ কোটি এবং গত বছরে ১৩১ টি প্রকল্পে ১৩৩৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল।

বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, যৌথ ও বিদেশি বিনিয়োগে স্থাপিত শিল্পগুলোতে ২০১০ সালে কর্মসংস্থান হয় ৩০,৬৪৯ জনের। ২০১১ সালে ২৯,২৯১ জনের, ২০১২ সালে ৩৩,৩৫০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। পরের বছর তা নেমে যায় এর অর্ধেকে। ২০১৪ সালে আরও কমে গেছে। গত বছরে আরও হ্রাস পেয়েছে।

চট্টগ্রামে শিল্প খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগের ৫টি প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে এ বছরে। এগুলোর একটি হলো আমেরিকা ও শ্রীলংকার যৌথ প্রস্তাব। অপর প্রস্তাবগুলো এসেছে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং নেদারল্যান্ড থেকে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জাপানের দুটি যৌথ বিনিয়োগ। ত্রি-ডবিøউএম বাংলাদেশ লিমিটেড এবং মিয়াই ক্রাফটস (বিডি) লিমিটেড নিবন্ধন করেছে এগুলো। এ বছরে চীনের হাও জি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড বিনিয়োগের জন্য প্রস্তাব নিবন্ধন করেছে। এছাড়া, বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ড যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করছে বিএম এনার্জি (বিডি) লিমিটেড। এখানে আড়াই শ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কাজ শুরু হওয়ার কথা আগামী জানুয়ারিতে। গত অর্থ বছরে চট্টগ্রামে বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমান ৫.২৯ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় এর পরিমান হবে ৪২ কোটি টাকার মত।

গত ২৫ আগস্ট গুজরাট চেম্বারের প্রতিনিধি দল চট্টগ্রাম সফরে আসে এবং চিটাগাং চেম্বারের সাথে মত বিনিময়কালে এখানে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করে। এরপর থাই বাণিজ্য প্রতিনিধি প্রতিনিধি দল আসে ১৮ সেপ্টেম্বর। তারাও জানিয়ে গেছে চট্টগ্রামে বিনিয়োগের কথা। ২৮ সেপ্টেম্বর রাখাইন রাজ্য চেম্বার প্রতিনিধি দল চিটাগাং চেম্বারে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের সাথে মত বিনিময়কালে অনুরূপ অভিপ্রায়ের কথা জানিয়ে গেছে। গত ১৯ অক্টোবর ব্রিটিশ হাই কমিশনার এলিসন ব্লেইক চেম্বারে মত বিনিময়কালে বলেছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের উৎকৃষ্ট স্থান চট্টগ্রাম।

চিটাগাং মেট্রোপলিটন চেম্বারের সহ-সভাপতি ও বিজিএমইএ-র পরিচালক এ এম মাহবুব চৌধুরী অভিমত, প্রধানত জ্বালানির অভাবে কাঙ্খিত বিনিয়োগ নেই চট্টগ্রামে। গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হলে তবেই এখানে বিনিয়োগ হবে। আনোয়ারা এবং মিরেরসরাইর অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিশাল বিনিয়োগের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজন সুলভে জ্বালানি সরবরাহ করা।

তিনি বলেন, কেজিডিসিএল গ্যাসের জন্য অপেক্ষমান শিল্প-কারখানার তালিকা কয়েক দফায় পাঠিয়েছে পেট্রোবাংলার কাছে। চিটাগাং চেম্বার থেকেও বিভিন্ন সময়ে সুপারিশ পাঠানো হয়েছিল। এছাড়া, মেট্রোপলিটন চেম্বার, বিকেএমইএ এবং বিটিএমইএ প্রধান মন্ত্রী, উপদেষ্টা, জ্বালানি মন্ত্রী, পেট্রোবাংলা সচিবের কাছে এ বিষয়ে চিঠি দিয়েছে। কোন ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।

এফবিসিসিআই এবং চিটাগাং চেম্বারের সাবেক পরিচালক মো. আমিরুল হক বলেন, চট্টগ্রামে বিনিয়োগকে সবচেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত করেছে গ্যাস সংকট। এখানকার ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি সত্তে¡ও কোন উদ্যোগ নেই তা নিরসনে। চট্টগ্রামের জন্য ফিডার লাইন স্থাপনের বিষয়টি ঝুলে আছে বছরের পর বছর। এখানকার বিনিয়োগকারীরা প্রধানত জ্বালানি সংকটে বাধ্য হয়ে চলে যাচ্ছেন ঢাকা, গাজিপুর ও আশে-পাশের এলাকায়।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত