টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামে পরিবহন ধর্মঘটে আতঙ্ক, জনদুর্ভোগ

প্রধান প্রতিবেদক
সিটিজি টাইমস ডটকম

dsc

ছবিঃ সিটিজি টাইমস

চট্টগ্রাম, ২৯  নভেম্বর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস):: প্রতিদিনের মতো নগরীর ইপিজেডের বিভিন্ন কারখানায় কর্মরত অর্ধশতাধিক শ্রমিক বহদ্দারহাটে জড়ো হন আজ মঙ্গলবার সকাল ৭টায়। কিন্তু তাদের নিত্যদিনের চলাচলের ১০নম্বর গাড়ির দেখা নেই। তবে একটি টেম্পু ও একটি লেগুনা নিতে আসে তাদের। হুমড়ি খেয়ে গাড়ি দুটিতে উঠতেই ভাঙচুর।

অগত্যা নেমে পড়ে এদিক-ওদিক ছুটতে থাকে আতঙ্কিত শ্রমিকরা। ততক্ষনে গাড়ি দুটির পোস্টমর্টেম করার অবস্থা। এমন বিবরণ দিলেন ভুক্তভোগী একাধিক শ্রমিক ও কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী।

তম্মধ্যে ইপিজেডের ইয়ংওয়ানের কারখানায় কর্মরত সুপারভাইজার জসিম উদ্দিন জানান, ১০-১২ জন পিকেটার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকা পরিবহণ ধর্মঘটের সমর্থনে এই ভাঙচুর চালায়। এ সময় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে বহদ্দারহাট এলাকায় অপেক্ষমান যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ২০১৪ সালের পরে রাজনৈতিক দলের ডাকা শতাধিক হরতালেও এমন ভাঙচুরের দৃশ্য দেখা যায়নি। পুলিশের ভয়ে মাঠে নামতে পারেনি পিকেটাররা। হঠাৎ এত কড়া পিকেটিং। ভাঙচুর। অথচ পুলিশ নিরব।

শুধুই কি বহদ্দারহাট। পিকেটারদের হাত থেকে বাচতে নগরীর পাহাড়তলী থানার বিশ্বরোড এলাকায় রীতিমতো বাস চাপায় ঘটে নিহতের ঘটনাও। প্রত্যক্ষদর্শী রিদোয়ান কবিরের বর্ণনা মতে, সকাল তখন ৮টা। ১০-১২ জন যাত্রী নিয়ে নগরীর অলঙ্কার মোড় ছেড়ে আসা টেম্পু পাহাড়তলি থানার নয়াবাজার এলাকায় পৌছালে পিকেটাররা অতর্কিত হামলা চালায়। টেম্পুটি ভাঙচুর করে। এতে আতঙ্কিত হয়ে যাত্রীরা দ্বিগবিদিক ছুটতে থাকে। এ সময় বাসচাপা পড়ে নিহত হন টেম্পুর যাত্রী মো. শাহ জালাল।

নগরীর পাহাড়তলী থানার এসআই সাইফুল ইসলাম নিহতের ঘটনার কথা স্বাীকার করে বলেন, মো. জালালের নিহতের ঘটনায় কাউকে এখনো পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, পিকেটিংয়ে কারা ছিল এ ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। দোষিদের চিহ্নিত করে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বহদ্দারহাট ও পাহাড়তলী ছাড়াও নগরীর জিইসির মোড়, মুরাদপুর, ষোলশহর ২ নং গেইট, প্রবর্তক মোড়. নিউমার্কেট এলাকা, সদরঘাট, কোতোয়ালী মোড়, লালদীঘি, আন্দরকিল্লা, কাজীর দেউরি, ও আগ্রাবাদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও স্থানে পিকেটিং করেছে ধর্মঘটের সমর্থকরা। এ সময় পিকেটাররা কয়েকটি টেম্পু ও লেগুনা ভাঙচুর করে।

ফলে সকালের শুরুতে এসব এলাকায় যানবাহন চললাচল হলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এসব এলাকা থেকে কর্মস্থলে ছুটা কর্মজীবি, শ্রমজিিব মানুষ কর্মস্থলে যেতে পারেনি। এমনকি ব্যবসায়ীক পণ্য পরিবহণেও পোহাতে হয়েছে চরম দুর্ভোগ। কর্মস্থলে যেতে না পেরে অনেক শ্রমিক বাসস্থানে ফিরে গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ধর্মঘটের কারনে নগরীর অভ্যন্তরে যানবাহন চলাচল ছিল খুবই কম। দুরপাল্লার কোন যানবাহনও চলাচল করেনি। বিশেষ করে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা-কক্সবাজার-রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের কোন বাস ছেড়ে যায়নি। কোন বাস চট্টগ্রামেও আসেনি। কোন ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান পণ্য পরিবহন করতে দেখা যায়নি। বন্দরের কোন পণ্য নিয়ে চলাচল করেনি প্রাইমমুভারগুলোও।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কমিটির আন্দোলন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আবদুস ছবুর বলেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ৯ দফা দাবিতে এই ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। যার সাথে ফেডারেশনের স্বার্থ জড়িত। অতএব এই ধর্মঘট পালনে আমরা শতভাগ সফল।

প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফেডারেশনের লোকজন ধর্মঘটের সমর্থনে পিকেটিং করেছে। কিন্তু কোন গাড়ি ভাঙচুর করেছে এমন তথ্য জানা নেই। তবে ফেডারেশনের বাইরে যারা গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নেমেছে তারা ধর্মঘটের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে পারত। কারন এ ধর্মঘটের স্বার্থের সাথে তাদের স্বার্থও জড়িত। কিন্তু কিছু স্বার্থান্বেষি মহল নিজেদের স্বার্থে ফেডারেশনের স্বার্থ উপেক্ষা করে চলেছে।

ধর্মঘটে ভাঙচুর ও নিহতের সম্পর্কে জানতে চাইলে সিএমপির কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, গত কয়েকবছরের হরতাল ধর্মঘটে ভাঙচুর ও নিহতের ঘটনা প্রায় ছিল না। কিন্তু পরিবহণ শ্রমিকরা হঠাৎ উচ্ছৃঙ্খল আচরণ কেন করল তা বোধগম্য নয়। এ ব্যাপারে শ্রমিক নেতাদের সাথে অবশ্যই আলাপ করা হবে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন নয় দফা দাবিতে আজ মঙ্গলবার ভোর ছয়টা থেকে বৃহত্তর চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টা পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেয়। যা বুধবার ভোর ৬টা পর্যন্ত চলবে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা নিয়ে বৃহত্তর চট্টগ্রাম গঠিত।

শ্রমিকদের নয় দফা দাবি হলো- চট্টগ্রামে বাস, ট্রাক ও প্রাইম মুভারের জন্য আলাদা টার্মিনাল নির্মাণ, অটোরিকশা-অটো টে¤েপার জন্য পার্কিংয়ের জায়গা নির্ধারণ, পরিবহন শ্রমিকদের নিয়োগপত্র এবং কল্যাণ তহবিলের ব্যবস্থা করা, পুলিশি হয়রানি ও নির্যাতন বন্ধ, ফেরি পারাপারে টোল কমানো, অনিবন্ধিত অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া এবং মালিকের জমা ৬০০ টাকা নির্ধারণ, বিআরটিএ ও যুগ্ম শ্রম পরিচালকের দপ্তরে দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধ, শহর এলাকায় বাস, মিনিবাস ও হিউম্যানহলারের টার্গেট পদ্ধতি বাতিল ও শ্রমিক নেতা নুরুল হুদা অপহরণ মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল।

আন্তজেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি রুহুল আমিন বলেন, মন্ত্রীসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে বহু চুক্তি ও সিদ্ধান্তের পর চট্টগ্রামের উত্তর জেলার জন্য বাস টার্মিনাল নির্মিত হয়নি। একইভাবে ট্রাক ও প্রাইম মুভার টার্মিনালও নির্মিত হয়নি। একটি স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে এসব প্রতিশ্রæতি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বারবার তাগাদা দেওয়া সত্তে¡ও নগরের বিভিন্ন জায়গায় বাস, ট্রাক ও ট্যাংকলরির টার্মিনাল হচ্ছে না। দেশ স্বাধীনের ৪৫ বছর পার হয়েছে। মন্ত্রী-সাংসদ আসে, মন্ত্রী-সাংসদ যায়; কিন্তু চট্টগ্রামে টার্মিনাল হয় না।

তিনি বলেন, ২০১৩ সালে তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী এক সার্কুলারের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নগরে চার হাজার অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মালিক ও প্রশাসনের অসাধু সিন্ডিকেটের নানামুখী ষড়যন্ত্রের কারণে সেই অনিবন্ধিত অটোরিকশা চলতে পারছে না। ফলে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, পরীক্ষার মাধ্যমে লাইসেন্স দেওয়া হোক। কিন্তু কম সময়ের মধ্যে লাইসেন্স নিশ্চিত করতে হবে। লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে লিখিত পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে বিআরটিএর দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত