টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

‘আরশ ছেদিছে সর্বহারা মানুষের আহাজারী’

ইমাম খাইর
সীমান্ত ঘুরে এসে

coxচট্টগ্রাম, ২৮ নভেম্বর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস)::  তিন খলিজার ধন ও স্বামীকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে গেছে রোহিঙ্গা মুসলিম নারী নুর বেগম (২৪)। তার আহাজারীতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তার ক্রন্দনে এলাকার কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। তার চাখের সামনে ২ শিশুপুত্র মোঃ হাশিম (৫), জাফর আলমকেও (৩) পুড়িয়ে মারা হয়েছে। স্বামী জামাল হোসেনকে মিয়ানমার বাহিনী ২০ দিন আগে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। আর ফিরে আসেনি। এমনকি চোখের সামনে মাঠে আগুন জ্বেলে পুরুষদের ধরে আগুণে ফেলে পুড়িয়ে মারা হয়েছে নিকট আত্মীয় (মামা, খালু, ভাই, চাচা) নুরুল আলম, জাফর, মোঃ সেলিম, শামসুল আলম, আবুল কালাম, ইউসুফ, সোনা মিয়া, ছৈয়দ আহমদ, মোঃ হাসিম, গনু মিয়া, আবুল বশর, মুজিবুর রহমান, আবুল কাসেম, ইসমাইল, ওসমানসহ ৩০ জনকে।

মহিলাদেরকে ধর্ষণসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। মিয়ানমার বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে প্রাণ বাঁচাতে একমাত্র শিশুপুত্র সাড়ে ৫ মাস বয়সী জানে আলম ও অবিবাহিত এক বোনকে নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে বনে-জঙ্গলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ২০ জনের দলটি টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উঞ্চিপ্রাং ঘাট দিয়ে গভীর রাতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে সময় লেগেছে ১৫ দিন। বাংলাদেশে ঢুকে অন্যান্য রোহিঙ্গাদের সাথে টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে (স্থানীয় ভাষায় টাল) আশ্রয় নিয়েছে ২৫ নভেম্বর সন্ধ্যায়। গভীর রাতে শীত ও অনাহারে মায়ের কোলেই বিনা চিকিৎসায় মারা যায় জানে আলম। এখন ৩ সন্তানের জননী নুর বেগমের চোখে পানি নাই। নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছেন তিনি, আর থেমে থেমে বলে উঠছে আমার স্বামী জামাল হোসেন ও খলিজা ৩ শিশুপুত্র মোঃ হাশিম (৫), জাফর আলম (৩) এবং সাড়ে ৫ মাস বয়সী শিশু জানে আলম কি আসছে? দেখছি না কেন তাদের। “আল্লাহ আমার খজিলার ধনকে ফিরিয়ে দেয়”। এই ভাবে তার মাতন দেখে কান্না করছেন অনেকেই। স্বামী সন্তান নিয়ে অনেক সুখে ছিল স্বামী জামাল হোসেনের পরিবার। টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সর্বস্ব হারানো অনুপ্রবেশকারী এই রোহিঙ্গা নারীর আর্তনাদ আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। নারীটি হলেন মিয়ানমার আরকান রাজ্যের উত্তর জামবইন্যা জামাল হোসেনের স্ত্রী ৩ সন্তানের জননী নুর বেগম ।

টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে (স্থানীয় ভাষায় টাল) ২৭ নভেম্বর দুপুরে সরেজমিন পরিদর্শনকালে কথা হয় তাঁর সাথে।

কিন্তু তার ৩ সন্তানের নৃশংস, বর্বর নির্যাতনের মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন তিনি। আচ্ছা, কে পারে ! নিজ সন্তানকে মায়ের সামনে এমন নৃশংস, বর্বর নির্যাতন মারার বর্ণনা তা স্বাভাবিক বর্ণনায় কয়জন মা বলতে পারে ! হয়তো এ জন্যই তার মা নির্বাক। কিন্তু তিনি হয়তো এও বুঝছিলেন, তাদের কোনো দোষ নেই। হয়তো মগের মুল্লুগের তাদের জন্মানোটাই তাদের পাপ!

টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দয়াপরবশঃ হয়ে মানবিক কারণে এনে আশ্রয় দেয়া জুলেখা বেগম জানালেন বিস্তারিত। বর্ণণা দিলেন মিয়ানমার বাহিনীর অত্যাচারের লোমহর্ষক ঘটনা। তিনি বলেন স্বামী জামাল হোসেন (৩০), ৩ শিশুপুত্র মোঃ হাশিম (৫), জাফর আলম (৩) এবং সাড়ে ৫ মাস বয়সী শিশু জানে আলমকে নিয়ে সুখের সংসার ছিল। গত মাসে বিজিপি ক্যাম্পে সন্ত্রাসী হামলার পর আরকান রাজ্যের মুসলমানদের উপর নেমে আসে অবর্ণণীয় নির্যাতন। মুসলমানদের গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অনেককে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। রোহিঙ্গা নারী অসহায় মা নুর বেগমের বরাত দিয়ে আরো আশ্রায় দেয়া জুলেখা বেগম জানান অর্ধাহারে-অনাহারে বনে-জঙ্গলে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বুকের দুধ শুকিয়ে গিয়েছিল। অনাহারে শিশুটি কংকালসার হয়ে যায়। উপরন্ত ছিল তীব্র শীত। সাথে কোন গরম কাপড়ও ছিলনা। চিকিৎসা করারও সুযোগ হয়নি। কোলেই বিনা চিকিৎসায় শিশুটি মারা যায়। একাধারে ৩ দিন অনাহারে থাকার পর এখানে এসে ভাত খাওয়ার পর বুকে সামান্য দুধ আসলে শিশুটি মৃত্যুর আগে যৎসামান্য দুধ পান করেছিল।

জুলেখা বেগম বলেন, ক্যাম্পের বাইরে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে ব্রীক ফিল্ডের পাশে কংকালসার শিশুসহ এক মহিলাকে দেখে দয়াপরবশঃ হয়ে মানবিক কারণে এনে আশ্রয় দিয়েছি। তিনি আরও জানান তাঁর মতো আরও অনেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে বহু কষ্টে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে এসেছে। তম্মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশী। অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে ধর্ষিতা নারীর সংখ্যাও কম নয়। পুরুষদের ধরে নিয়ে গিয়ে গুলি করে ও পুড়িয়ে মেরে ফেলায় মুসলমানদের গ্রামে পুরুষ শুন্য হয়ে পড়েছে।

টেকনাফের লেদা বস্তিতে ৫ বোনের সঙ্গে দেখা হয়। কিন্তু তাদের মুখে কোনো কথা নেই। নির্যাতনের শিকারের অনুপ্রবেশ করেছেন মংডু শহরের ছোট গরজিল পাচ বোন ছলিমা বেগম, রেহেনা বেগম, মুমিনা বেগম,শাকরিা,তসলমিার । দু’বোনের বয়স ১৫ থেকে ১৮’র মধ্যে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী সেখানে আক্রমন করে ১২ নভেম্বর শেষরাতে। তারা জানান, মিয়ানমারের সৈন্যদের অভিযানের মুখে পড়ে বড় ভাই দিল আহমেদ পালিয়ে গেছে। কিন্তু সে মারা গেছে নাকি জীবত আছে তা আমি জানিনা। আমাদের একটু দুরে এক বাড়িতে সৈন্যরা ঢুকে বাড়ি আগুন জালিয়ে দেয়। এসয় আগুন দেখে আমরা সবাই বাড়ি ফেলে পালিয়ে যায়। এরপর আমারা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ি। অনেক গ্রামের বাড়িতে আগুনে পুড়িয়ে অনেক মানুষকে হত্যা করেছে তারা। তাঁরা নারীদের ধর্ষন, জবাই, আগুনে পুড়িয়ে ও গুলি করে রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যার করছে। যাতে মিয়ানমারে কোন রোহিঙ্গা না থাকে। প্রাণে বাচঁতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ছাড়তে হচ্ছে। মেঝে বোন রেহনো জানান আমি সহ ছোট দুই বোন সদ্য কিশোর পরেেিয় যৌবনে প্রবশে করেছেন। সেনাবাহিনীর ভয়ে আমরা চার বোনকে বড় বোনরে বাড়েিত এনে রখেছেলিনে। কিন্তু চার দিন আগে ভোরে মিয়ানমারের সৈন্যরা দুলাভাই এর বাড়িতে ঢোকে। চার বোনকে একসাথে বেধে রাখে। খানিক পরে দুলাভাই কে ঘররে বাহিরে নিয়ে যায়। কিছুক্ষন পরে জানতে পারি দুলাভাইকে জবাই করে হত্যা করা হয়। তারা আমি সহ দুবোন নিয়ে যাচ্ছিল তা দেখে বোনদরে না নিতে সৈন্যদরে পায়ে পড়নে আমার বড় বোন ছলিমা । কিন্তু সৈন্যরা তাকে মারধর করে মাটিতে ফেেল যায়। তিন ঘন্টা পরে আমরা তিন বোনকে বাড়ীতে দিয়ে যায়। ঘটনা জানতে চাইলে বোন দুটি নিশ্চুপ হয়ে কাঁদতে থাকে।

সুত্র জানিয়েছে, আরাকানকে রোহিঙ্গামুক্ত করতে নানা অজুহাতে ১৯ বার দমন পীড়ন অভিযান চালায় দেশটির বর্বর বাহিনী। ১৯৪২ সাল থেকে চলা এই দমন, পীড়ন ও নির্যাতনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাশূণ্য করতে গিয়ে এই বর্বর বাহিনী অত্যচারে আরকান এখন বিধ্বস্থ জনপদ। এই কারনে বাংলাদেশে বাড়ছে নির্যাতিন নিপীড়নের শিকার প্রতিদিন বাড়ছে রোহিঙ্গার শরণার্থীর সংখ্যা।
এদিকে মিয়ানমারের নাগরিকদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে নজরদারি আরও বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড ও পুলিশ সদস্যরা।

বিজিবি কক্সবাজার ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল ইমরান উল্লাহ সরকার জানিয়েছেন, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশ চেষ্টাকালে রোহিঙ্গা ভর্তি ছয়টি নৌকা ও পাঁচজনকে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি। রোববার ভোর রাতে উখিয়া ও টেকনাফের নাফ নদীর বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে এদের ফেরত পাঠনো হয়।

কোস্টগার্ড চট্টগ্রাম অঞ্চলের অপারেশন কর্মকর্তা ডিকশন চৌধুরী বলেন, ‘নাফ নদীতে রোহিঙ্গা বোঝাই নৌকার খবর শুনে নদীতে টহল আরও বেশি জোরদার করা হয়েছে। কোনো রোহিঙ্গা যেন ঢুকতে না পারে সেজন্য নদীতে টহল অব্যাহত রাখা হয়েছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বাড়ল নজরদারিসংশ্লিষ্টরা জানান, এখন থেকে রোহিঙ্গাদের মাঝ নদীতেই বাধা দেওয়ার কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে কোস্টগার্ড; যাতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের ভেতরেই আসতে না পারে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত