টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রাম নগরীর সবগুলো ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা অকেজো!

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ২১  নভেম্বর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস): চট্টগ্রাম মহানগরীর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বসানো সবকটি ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা অকেজো। সচল আছে শুধুমাত্র ১৩টি ক্যামেরা। ক্যামেরাগুলো নষ্ট থাকায় অপরাধ সনাক্তে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, চলতি বছরে নগরীর সবচেয়ে আলোচিত সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যায় নগরীর জিইসির মোড়ে বসানো শক্তিশালী ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাগুলো নষ্ট থাকায় কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। বেসরকারি প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে লাগানো সিসি ক্যামেরা থেকে হত্যাকারীর মোটর সাইকেলের অ¯পষ্ট ফুটেজ পাওয়া যায়। কিন্তু এ ফুটেজ দেখে হত্যাকারী চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয় পুলিশ।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সিএমপির তত্ত¡াবধানে বসানো ১৩৯টি ক্যামেরার মধ্যে ১২৬টিই নষ্ট। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম জিইসি মোড় এলাকায় চারটি সিসি ক্যামেরা ছিল। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এসব ক্যামেরা কিছুদিন আগে বিলবোর্ড উচ্ছেদের সময় সরিয়ে নেয়া হলেও আর পুন:স্থাপন করা হয়নি।

এ ক্যামেরাগুলো সচল থাকলে পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম হত্যাকান্ডের ভালো ফুটেজ পাওয়া যেত। অপরাধীদের শনাক্ত করা সহজ হত। অপরাধ সংগঠিত করে অপরাধীরা সহজেই পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেত না। দ্রুত ক্যামারাগুলো মেরামত এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আরও ক্যামেরা স্থাপন না করা গেলে নগরীতে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাবে বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার সিটিজি টাইমসকে বলেন, নগরীতে লাগানো সিএমপির ১৩৯টি সিসি ক্যামেরার মধ্যে মাত্র ১৩টি চালু রয়েছে। বাকি সিসি ক্যামেরাগুলো নষ্ট অবস্থায় রয়েছে। কয়েক মাস আগে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন বিলবোর্ড উচ্ছেদ অভিযান চালালে ক্যামেরাগুলো নষ্ট হয়ে যায়। তবে ক্যামেরাগুলো মেরামত করার চেষ্টা চলছে। ক্যামেরাগুলো মেরামত হলে অপরাধ সনাক্ত সহজ হবে।

সিএমপি সূত্র জানায়, গত বছরের ২৭ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় জিইসি মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়। ওই সময় বাবুল আক্তারের তত্ত¡াবধানেই এসব সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। তবে লাখ লাখ টাকা খরচ করে লাগানো এতগুলো সিসি ক্যামেরা কেন এত তাড়াতাড়ি অচল বা অকেজো হয়ে গেল তা বোঝা মুশকিল।

চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার কামরুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, নগরবাসীর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ২০১৪ সালে নগরীতে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসানোর তাগিদ দেন বাবুল আক্তার নিজেই। তৎকালীন পুলিশ কমিশনার আবদুল জলিল মন্ডলও এমন তাগিদ অনুভব করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মার্কেট ও শপিংমলগুলোতে লাগানো হয় সিসি ক্যামেরা। আর সেই ক্যামেরাই কোন কাজে লাগল না বাবুল আক্তারের স্ত্রী হত্যাকান্ডেও।

তিনি জানান, নগরীতে প্রথাম ধাপে ২৫টি জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১১০টি ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা স্থাপন করে নগর পুলিশ। স্থাপিত এসব ক্যামেরায় ধারণ করা দৃশ্য দেখে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়ার জন্য সিএমপিতে খোলা হয়েছিল কেন্দ্রীয়ভাবে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। এ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা খোলা রেখে নগরীর মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। সিএমপির নির্দেশে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন ভবন মালিক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকরাও সিসি ক্যামেরা বসান।

সিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণ সহজ করতে পুরো নগরীকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছিল। সিএমপি সদর দফতরের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ১২টি মনিটরসহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতিও স্থাপন করা হয়। ২৫টি স্থানে সিসি ক্যামেরা বসানোর ফলে অপরাধীদের শনাক্ত করার পথটি সহজ হয়েছিল।

অপরাধ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নগরীতে হত্যাকান্ড, গাড়ি চুরি, ছিনতাই, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধের অধিকাংশই সংঘটিত করে বাইরের দুর্বৃত্তরা। তারা নগরীতে এসে অপরাধ সংঘটিত করে দ্রুত পালিয়ে যায়। এতে অপরাধীদের শনাক্ত করতে পুলিশকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। সিসি ক্যামেরা বসানোর পর গাড়ির নম্বরসহ সার্বিক চিত্র পর্যালোচনা করে অপরাধের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যেত।

নগরীতে সংঘটিত বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ড ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন ঘটনা উদঘাটন হয় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখেই। গ্রেফতার করা হয় আসামিদের। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই অধিকাংশ ক্যামেরা অকেজো ও চুরি হওয়ায় অপরাধী শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সিএমপির তথ্যমতে, নগরীর গুরুত্বপূর্ণ জিইসির মোড়, শাহ আমানত সেতু, সিইপিজেড ও বন্দর টোল প্লাজা এলাকায় সবচেয়ে অত্যাধুনিক ক্যামেরা বসানো হয়। যা দিয়ে আশপাশের ৩০০ মিটারের মধ্যে গাড়ির নম্বরসহ সার্বিক চিত্র ধারণ করা যায়। এরপর আরও কমপক্ষে ২০০ মিটার এলাকার সার্বিক চিত্র ধারণের ক্ষমতা রয়েছে ক্যামেরাগুলোর। একইসঙ্গে অন্য স্থানগুলোতে বসানো হয়েছে ফেস ডিটেক্টর ক্যামেরা।

নগরীর আরও যেসব গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছিল সেগুলো হল, একে খান মোড়, ২নং নম্বর গেট, সিটি গেট, অলংকার মোড়, জিইসি, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, অক্সিজেন মোড়, সাগরিকা, সিইপিজেড মোড়, রাহাত্তারপুল, শাহ আমানত সেতু, নিউমার্কেট, কাজির দেউড়ি মোড়। প্রতিটি পয়েন্টে ৪ থেকে ৫টি করে ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। নগরীর আরও ২০-২৫টি স্থানে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়।

এসব ক্যামেরা কেনা এবং স্থাপনের খরচ স্থানীয় দানশীল ব্যক্তিদের মাধ্যমে গঠিত সিএমপির নিজস্ব তহবিল থেকেই জোগান দেয়া হয়েছিল। এরপর গত বছরের ২৬ অক্টোবর সন্ত্রাস ও নাশকতামূলক কর্মকান্ড ঠেকাতে চট্টগ্রাম মহনগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, ট্রাফিক মোড়, শপিংমল ও আবাসিক এলাকায় ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশ দেয় সিএমপি। আরও একধাপে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বেসরকারিভাবে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত