টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

বড় বিনিয়োগের পরও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে যাত্রী কমছে

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

চট্টগ্রাম, ২০ নভেম্বর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস): বড় বিনিয়োগের পরও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে কাঙ্খিত যাত্রী মিলছে না। বরং কমছে। গত অর্থবছরে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে যাত্রী কমেছে প্রায় ৪২ লাখ। অথচ যাত্রী বাড়ায় দেশের যে কোন পরিবহণ খাত হিমশিম খাচ্ছে। বাড়ছে নৈরাজ্য।

ক্রমেই যাত্রী কমে গেলেও তা নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা নেই রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের। নিজেদের আখের গুছাতে ব্যস্ত তারা। এ খাতের সামান্য একজন কর্মচারীও দিনভর মশগুল থাকেন কিভাবে বাড়তি টাকা কামাই করা যায়। উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ব্যস্ত থাকেন কিভাবে প্রল্পের অর্থ চুরি করে উচ্চবিত্ত হওয়া যায়।

সূত্র জানায়, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে গত এক বছরে তিনটি বড় প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর পরও প্রত্যাশা অনুযায়ী যাত্রী বাড়াতে পারছে না রেলওয়ে। খাতে বড় বড় বিনিয়োগ করার পরও কাঙ্খিত যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। বরং সেবার মান কমে যাওয়ার কমছে রেলের যাত্রী।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪ কোটি ১২ লাখ ৫৯ জন যাত্রী পরিবহন করেছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল। যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের চেয়ে ৪১ লাখ ৬৭ হাজার বা ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ কম। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে পূর্বাঞ্চল রেল ৪ কোটি ৫৪ লাখ ২৬ হাজার যাত্রী পরিবহন করেছিল।

যাত্রী সাধারণের মতে, মূলত আন্তনগর ট্রেনগুলোর যাত্রাবিরতি বাড়ানো (স্টপেজ), সময়ানুবর্তিতার অভাব, চাহিদা সত্তে¡ও টিকিট প্রাপ্তি নিশ্চিত না হওয়ায় যাত্রীরা রেলবিমুখ হয়ে পড়ছে। রেলওয়েতে এখনো যা যাত্রী পাওয়া যায়, তা হচ্ছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে চলাচলকারী ত’র্ণা নিশিতা, সূবর্ণ এক্সপ্রেস ও লাল-সবুজের সোনার বাংলার মতো বিরতিহীন ট্রেনে।

সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথে চলাচলকারী পাহড়িকা, উদয়নের মতো আন্ত:নগর ট্রেনগুলোতেও যাত্রী নেই তেমন। এর মূল কারন হচ্ছে শিডিউল বিপর্যয়সহ নানা অনিয়ম। অথচ এসব এলাকায় যাতায়াতের জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী নগরীর বাস স্টেশনগুলোতে ভীড় করে।

এসব পথের যাত্রীরা লক্কর-জক্কর মার্কা বাস, এমনকি ট্রাকে করে পশুর মতো যাতায়াত করে। কিন্তু রেলে যাতায়াত করে না। এমন কথা বলেছেন নগরীর স্টেশন রোডে সিলেটগামী যাত্রী রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, বাড়িতে যাওয়ার জন্য আগে কয়েকবার ট্রেনের টিকেট চাইতে গিয়েও পায়নি। পাইলেও বলে সকালের ট্রেন বিকেলে, বিকেলের ট্রেন সকালে পাওয়া যাবে। এমন বিড়ম্বনা আর অভিজ্ঞতার কারনে আর ট্রেনের ধারে-পাশে যায় না।

তিনি বলেন, ব্যবসার কারনে আমি চট্টগ্রামে নিয়মিত যাতায়াত করি। তবে বাসে। বাস না পেলে ট্রাকে যায় তবুও ট্রেনে যায় না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আবদুল হাই সিটিজি টাইমস ডটকমকে বলেন, রেলের বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রতি বছর যাত্রী ও আয়ের প্রবৃদ্ধিও বজায় থাকছে। তবে সর্বশেষ অর্থবছরে যাত্রী কমে যাওয়ার বিষয়টি আমার নজরে আসেনি। আর পূর্ববর্তী বছরে রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে রেল পরিচালনা ব্যাহত হওয়ায় যাত্রী পরিবহনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

সূত্র জানায়, ট্রেন ব্যবস্থাপনায় অদূরদর্শিতার কারণে বড় বিনিয়োগের পরও কাঙ্খিত যাত্রী পাচ্ছে না রেল। দীর্ঘদিন ধরে কোচ সংকটে থাকলেও রেলওয়ে শুধু ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চীন থেকে নিম্মমানের ডেমু ট্রেন আমদানি করেছে। এসব ট্রেন বাংলাদেশে চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় ট্রেন বাড়লেও যাত্রী বাড়ছে না। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় রুটে ট্রেন সার্ভিস না বাড়িয়ে অপ্রয়োজনীয় রুটে ট্রেন বাড়ানোর ফলেও যাত্রীরা রেলবিমুখ হয়েছে।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১৮ এপ্রিল ১ হাজার ৬০৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে চালু করা হয় কুমিল্লার লাকসাম থেকে চট্টগ্রামের চিনকি আস্তানা পর্যন্ত ৬১ কিলোমিটার ডাবল রেললাইন প্রকল্প। এ প্রকল্পের অধীনে আটটি বড় সেতু, ৩৪টি কালভার্ট এবং ১১টি পাইপ কালভার্ট নির্মাণ করা হয়।

এ ছাড়া চারটি নতুন স্টেশন রি-মডেলিং, আটটি ফুটওভার ব্রিজ, চারটি স্টেশনে ক্যানোপি এবং ১৩টি নতুন প্লাটফর্ম নির্মাণ ছাড়াও ১২টি স্টেশনে টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ করা হয়েছে। জাপান আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির কারণে ওই পথে সর্বোচ্চ ১০০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালানো সম্ভব।

এ ছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থ সহায়তায় টঙ্গী থেকে ভৈরব পর্যন্ত ৬৪ কিলোমিটার ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন হয় চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি। ২ হাজার ২১৩ কোটি টাকার মেগা এ প্রকল্পের অধীনে ৬৪ কিলোমিটার ডাবল লাইন নির্মাণ ছাড়াও ১১টি নতুন স্টেশন বিল্ডিং, দুটি সিগন্যালিং ইকুইপমেন্ট ভবন, ৭১টি ব্রিজ-কালভার্ট, ১৩টি স্টেশন রি-মডেলিং, ২৩টি প্লাটফর্ম, ১১টি স্টেশনের সিগন্যালিং ব্যবস্থা আধুনিকায়ন, পাঁচটি এবং ১১টি পুরনো লেভেল ক্রসিংয়ের উন্নয়ন করা হয়।

এ ছাড়া ২০১৫ সালের ১৮ এপ্রিল উদ্বোধন হয় ২৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম স্টেশন রি-মডেলিং প্রকল্প। এর আগে ২০১৩ সালে ৬৮৪ কোটি টাকায় চীন থেকে ২০ সেট (প্রতি সেটে ইঞ্জিনসহ তিনটি ইউনিট) ডেমু কেনা হয়। কয়েক বছর আগে কোরিয়া থেকে আমদানি করা হয় ২০টি ইঞ্জিন। স¤প্রতি ইন্দোনেশিয়া ও ভারত থেকে আমদানি করা হয় ২৫০ নতুন কোচ।

রেলের যাত্রী কমে যাওয়ার জন্য সময়ানুবর্তিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলে মনে করেন অনেকে। তাদের মতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন হওয়ার আগে মানুষ ট্রেনের দিকে ঝুঁকেছিল। কিন্তু এ চার লেন মহাসড়ক উদ্বোধনের পর যাতায়াত সময় কমে আসায় এখন রেল ছেড়ে সড়কের দিকে ঝুঁকছে যাত্রীদের একটি বড় অংশ। এছাড়া ব্যবস্থাপনাগত ত্রæটি তো আছেই।

রেলের পরিবহন বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, রেলের সেবার মান ও আয় বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও ব্যবস্থাপনা ত্রæটি থাকায় লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে না। প্রকল্পের পর প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও সরাসরি সেবার মান বাড়াতে তা কাজে আসছে না।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত