টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

৫০-এ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বের একমাত্র শাটল ট্রেনের ক্যাম্পাস

cuচট্টগ্রাম, ১৮ নভেম্বর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস): সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ১৮ নভেম্বর পঞ্চাশ বছর পূর্তি করতে যাচ্ছে শাটলের ক্যাম্পাস খ্যাত ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়’। পথচলার এ অর্ধ শতাব্দীতে প্রাপ্তির খাতায় যুক্ত হয়েছে নানা অর্জন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘সুবর্ণ জয়ন্তী’ তে চবির সেই সব গৌরব গাঁথা ইতিহাস, সৌন্দর্য ও সুবর্ণ জয়ন্তী নানা দিক নিয়েই এই আয়োজন

শুরু থেকে শুরুঃ
১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। মূল শহর থেকে মাত্র ২২ কিলোমিটার দূরে হাটহাজারী উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নে ১৭৫৩.৮৮ একর সমতল ও পাহাড়ী ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয় এ ক্যাম্পাস। প্রতিষ্ঠার পর উপাচার্য প্রফেসর ড. আজিজুর রহমান মল্লিক স্যারের নের্তৃত্বে মাত্র ৮ শিক্ষক নিয়ে ২৮ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলা, ইংরেজী, ইতিহাস ও অর্থনীতি সহ মাত্র ৪ টি বিভাগে ২২০জন শিক্ষার্থী ছিল।
.

দেশের সর্ববৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়ঃ
আয়তনের দিক থেকে দেশের সর্ববৃহৎ ও শিক্ষার্থী সংখ্যার দিক দিয়ে এটি দেশের তৃতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। শুরুর দিকে মাত্র ৪টি বিভাগ দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৩টি বিভাগ ও ৭টি ইনস্টিটিউট আছে। যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৩ হাজার ৬৮৭ জন। এ বিপুল সংখ্যক বিদ্যার্থীর জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে রয়েছেন ৬৮৭ জন শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট আবাসিক হল রয়েছে ১২টি। এর মধ্যে ছেলেদের জন্য রয়েছে ৮ টি ও মেয়েদের জন্য রয়েছে ৪ টি।এ ছাড়া শহরে অবস্থিত চারুকলা ইনস্টিটিউটে রয়েছে একটি হোস্টেল।

স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ঃ
দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য। মহান মুক্তিযুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বীরত্বের, গৌরবের ও আত্মত্যাগের। একাত্তরের সমর যুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ জন শিক্ষক, ১১জন ছাত্র এবং ৩ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী শহীদ হন। বীরত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল দপ্তরের কর্মচারী মোহাম্মদ হোসেন কে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

বিশ্বের একমাত্র শাটল ট্রেনের ক্যাম্পাসঃ
১৯৮১ সাল থেকে চালু হয়ে এখনো শিক্ষার্থীদের নিত্যসঙ্গী হিসেবে চলমান আছে গর্বের ‘শাটল ট্রেন’। পাহাড়ি পথ ধরে সবুজ পথ মাড়িয়ে এগিয়ে চলা শাটল ট্রেন এই বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা। কাশবনের মাঝ দিয়ে যখন ছুটে চলা শাটলে বসে কাশফুল ছুঁতে পারার অনুভূতি শুধু এখানেই পাওয়া সম্ভব। বিশ্বে যে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ট্রেন ব্যবস্থা আছে তার একটি হল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শাটল ট্রেন সার্ভিস বন্ধ করে দেয়ায় বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের একমাত্র শাটল ট্রেনের ক্যাম্পাস।

স্মরণীয় যাঁরা, বরণীয় তাঁরাঃ
পঞ্চাশ বছরের পথ চলায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অনেক রথী মহারথীর জন্ম দিয়েছে। এরমধ্যে প্রফেসর ইমিরেটরস জামাল নজরুল ইসলাম জগত বিখ্যাত ভৌতবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তাঁর লেখা অনেক বই বিশ্বের খ্যাতনামা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে অন্তর্ভূক্ত। আরো আছেন সাহিত্যিক আবুল ফজল; লেখক, কলামিস্ট,বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং বর্তমানে ইউজিসির চেয়ারম্যান প্রফসর ড. আব্দুল মান্নান ভূইঁয়া। অন্যদিকে, দেশের প্রথম নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূস এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। একই বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভণর ফজলে কবির, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক। আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। এছাড়াও ২০১১ সালে ব্যাঙের নতুন একটা প্রজাতি আবিষ্কার করে সাড়া ফেলেছেন যে তরুণ বিজ্ঞানী সেই সাজিদ আলী হাওলাদারও চবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন।

চবির প্রাণ শাটলের গানঃ
এখানে দিনের শুরু হয় শাটলের শব্দে। শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ শাটলে গান করেই মন জুড়ায়। তাদের গানে দিনে ১৮ বার চলাচল করা শাটল মুখর হয়ে থাকে। এ গানই চবির প্রাণ। শাটলের বগির দেয়ালে ‘ড্রাম’ বাজিয়ে গান গেয়ে যাত্রপথের পুরোটাই মাতিয়ে রাখে এসব বগি-শিল্পী। এ বগিতেই গান করে নকীব খান, পার্থ বড়ুয়া, এস আই টুটুলসহ আরো অনেকই আজ দেশ সেরা তারকা শিল্পী। এ শাটলেই রচিত হয় প্রেম কাহীনি। কত প্রেমের নীরব সাক্ষী এ প্রাণের শাটল।

প্রকৃতির পাঠশালাঃ
২২ কিলোমটার পথ পাড়ি দিয়ে শাটল ট্রেন হতে নামতেই দেখা মিলবে পাহাড়-অরণ্যে ঘেরা সবুজ ক্যাম্পাস। যেখানে প্রকৃতি তার সৌন্দর্যের অপার ঢালি সাজিয়ে অপেক্ষা করছে ২২হাজার শিক্ষার্থীর জন্য। এ যেন প্রকৃতির কোলে বেড়ে উঠা এক প্রকৃতির পাঠশালা।
কাঠবিড়ালের ছোটাছুটি, পাখির কিচিরমিচির, মায়া হরিণের ভালোবাসা মাখা চাহনি, ঝর্ণার ঝিরি ঝিরি শব্দ, হাজারো প্রজাতির গাছের সমারোহ, ছোট্ট রাংগামাটি খ্যাত ঝুলন্ত ব্রিজ, ক্যাম্পসের এডভেঞ্চার ‘চালন্দা গিরিপথ’ কী নেই এখানে! প্রকৃতি এখানে উদার ও মায়াময়। এছাড়াও আরো রয়েছে রয়েছে সুনামি গার্ডেন, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ফরেস্ট্রি, লাইব্রেরি চত্বর, গোল পুকুর, শাপলা পুকুর, টেলিহিল, ভিসিহিলসহ ছোট-বড় পাহাড় এবং পাহাড় কেটে বানানো মায়াবী কাটাপাহাড়ের রাস্তা।

সুবর্ন জয়ন্তী ঘিরে যত আয়োজনঃ
১৮ ও ১৯ নভেম্বর সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে সাজানো হয়েছে নতুনভাবে। দু’দিন ব্যাপী জমকালো এ আয়োজনের সাক্ষী হতে ইতোমধ্যে ৯ হাজার ৫৫৮ জন প্রাক্তন ও ২০ হাজার ২৯২ জন বর্তমান শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জমকালো এ আয়োজনের প্রথম দিন ১৮ নভেম্বর বিকেল ৩ টায় চট্টগ্রাম নগরীর বাদশা মিয়া সড়কে অবস্থিত চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বের হবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। যেটি সি.আর.বি শিরীষ তলায় গিয়ে শেষ হবে। এরপর সন্ধায় জি.ই.সি কনভেনশন সেন্টারে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হবে ‘সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ও মেজবান’। যেখানে গান গাইবেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী রুনা লায়লা।

তবে মূল উৎসব অনুষ্ঠিত হবে ১৯ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে। বেলা ১১টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসবের শুভ উদ্বোধন করবেন। এছাড়া প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে
যোগ দেবেন জাতীয় সংসদের স্পীকার ড. শিরীণ শারমিন চৌধুরী। সুবর্ণ জয়ন্তী বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান।

এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, সাবেক সিটি মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মান্নান প্রমুখ। দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলবে আলোচনা সভা। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সম্মাননা জানানো হবে।

এদিন নির্বিঘ্ন যাতায়াতের জন্য তিনটি ট্রেন সকাল সাতটা থেকে দশটা পর্যন্ত আধ-ঘন্টা পরপর শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করবে। একইভাবে বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহরে যাওয়া-আসা করবে। এছাড়াও পঁচিশটি বিআরটিসি ডাবলডেকার বাস সকাল আটটা থেকে শহর-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া আসা করবে। যদিও শহর থেকে যাত্রা শুরুর স্থান এখনো নির্ধারণ হয়নি।

এদিকে মূল আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুপুরে দেশ সেরা ব্যান্ড ওয়ারফেজ, আর্টসেল, লালন, ডেথ অব সরোর সুরের মূর্ছনায় মেতে উঠবে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়াও পার্থ বড়ুয়া, এস.আই টুটুল, তপন চৌধুরী এবং দিনাত জাহান মুন্নী গান পরিবেশন করবেন বলে জানা যায়।

এদিকে সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসবের প্রস্তুতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দীন চৌধুরী বলেন, প্রথমবারের মতো এ আয়োজনকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সকলের মধ্যে উচ্ছ্বাসের কমতি নেই। সে উচ্ছ্বাসকে বর্ণিল করতে এই মহা আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও কোন কমতি রাখে নি। আগামী ১৮ ও ১৯ নভেম্বর নবীন প্রবীণের যে মহামিলন হবে তারা জন্য আমরা প্রস্তুত। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা জমকালো এ আয়োজনকে স্বার্থক করে তুলবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত