টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামে ভোগ্যপণ্যের সবকিছুতে ভেজাল, কঠোর হচ্ছে প্রশাসন

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

mobileচট্টগ্রাম, ১৮ নভেম্বর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস): মিষ্টিতে মাছি-তেলাপোকা। বিস্কুটে খাবার অনুপযোগী রাসায়নিক ও রং। বাজার সয়লাব মেয়াদোত্তীর্ণ ও নকল ওষুধে। পচা বাসী খাদ্যসামগ্রী বিক্রি তো আছেই। প্রতিদিন এসবই খাচ্ছে চট্টগ্রাম নগরবাসী! সম্প্রতি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে উঠে এসেছে এই ভয়াবহ চিত্র।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ মেয়াদে ভেজাল খাদ্য গ্রহণে জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই ভেজাল রোধে প্রশাসনের আরো কঠোর আইন প্রয়োগ করা উচিত। এমনকি ভেজাল পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান চোখ বুঝে চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেয়া উচিত।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, পচা বাসি কিংবা রাসায়নিক মিশ্রিত খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করলে কিডনি, লিভার সংক্রান্ত নানা রোগ হতে পারে। এ ছাড়া উচ্চরক্তচাপ এবং তাৎক্ষণিকভাবে ডায়রিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। গর্ভবতী মায়েরা এই ধরনের খাবার খেলে বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নিতে পারে।

তিনি আরও বলেন, নকল আর অনুমোদনহীন ওষুধের কারণে ক্যানসারের মতো জটিল রোগও হতে পারে। কারণ নকল ওষুধ শরীরের জন্য বিষ।

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট নাজের হোসাইন সিটিজি টাইমস ডটকমকে বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ ও পিউর ফুড অ্যাক্ট ১৯৫৯ থাকলেও উৎপাদনকারী কিংবা বিক্রেতারা এসব মেনে চলছেন না। মান তদারকির দায়িত্বে যাঁরা আছেন তাঁদের উদাসীনতার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যদি প্রতিদিন তদারক করা হতো তাহলে এই ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।

নগরের বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভেজালবিরোধী অভিযানে দেখা যায়, বিক্রি হচ্ছে পচা বাসি মিষ্টি ও রাসায়নিক মিশ্রিত বিস্কুট। কারখানার পিরবেশ অস্বাস্থ্যকর। পানীয়তে মেশানো হয়েছে অ্যালকোহল। অনুমোদনহীন ও নকল ওষুধের ছড়াছড়ি। এমনকি রোগ নির্ণয় কেন্দ্রে ব্যবহার করা হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক।

সম্প্রতি র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত নগরীর জিইসির মোড়ে অবস্থিত জামান হোটেলে গিয়ে দেখতে পান দই আর মিষ্টির পাত্রে তেলাপোকা আর মাছি ভাসছে। নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে মিষ্টিসহ সবরকমের খাবার। পুরো পরিবেশ দুর্গন্ধযুক্ত। ফলে এই হোটেলকে জরিমানা করা হয় ১০ লাখ টাকা।

এর আগে নগরীর দামপাড়ায় অবস্থিত অভিজাত রেস্টুরেন্ট হান্ডি ও হাইওয়ে সুইটসকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। বোস ব্রাদার্স নামের মিষ্টির দোকানে গিয়েও একই অবস্থার কারনে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। অবশ্যই গত ১০ বছরে একই অপরাধে বোস ব্রাদার্সকে কয়েকবার জরিমানা গুনতে হয়েছে।

এছাড়া একই দিন নগরের এনায়েত বাজার এলাকার রয়েল বাংলা সুইটসকে ৫০ হাজার এবং দেওয়ানবাজারের ইকবাল সুইটসকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। নোংরা পরিবেশে সেখানে মিষ্টি এবং অন্যান্য সামগ্রী তৈরি করা হচ্ছিল। এর আগে গত বছর ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে রয়েল বাংলা সুইটসকে একবার জরিমানা করা হয়েছিল।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুহুল আমিন সিটিজি টাইমস ডটকমকে বলেন, মিষ্টির দোকানে পচা বাসি খাবার আর নোংরা পরিবেশ। ফার্মেসিতে অনুমোদনহীন, নকল ওষুধ। সবখানে ভেজাল। মানুষ যাবে কোথায়? আইন প্রয়োগ করে এভাবে কত দিন ব্যবসায়ীদের পরিবর্তন করা যাবে! এ জন্য দরকার নিজেদের শুভবুদ্ধি, মানবিকতা। এই ধরনের মিষ্টি কিংবা ওষুধ খেয়ে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে, এই বোধটা যত দিন না আসবে ততদিন পরিস্থিতি সপুর্ণ পরিবর্তন হবে না। তারপরও আমরা আমাদের কাজ করে যাব।

এদিকে নকল, অনুমোদনহীন বিদেশি ওষুধ এবং সরকারি ওষুধ রাখার দায়ে গত সাত মাসে নগরের ১৫৩টি ফার্মেসিকে জরিমানা করা হয়। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার বিেেকল র‌্যাবের ভ্রাম্যমান আদালত নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় ৩টি ডায়াগনষ্টিক সেন্টারকে ৪ লাখ টাকা এবং গত ১৪ নভেম্বর নগরের ডিসি রোডে অ্যাপেক্স ফার্মেসি নামে একটি দোকানকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।

জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি র্যাব, বিএসটিআই, সিটি করপোরেশন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তর ভেজাল এবং নকলের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে। খাদ্যদ্রব্যে রাসায়নিক, রং ব্যবহারের দায়ে র্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট সরওয়ার আলম গত বুধবার থাই ফুড প্রোডাক্ট নামে বেকারি সামগ্রী তৈরির প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করেন।

গত ঈদুল আজহার সময় নগরের অন্যতম খাদ্যসামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বনফুল অ্যান্ড কোম্পানিকে ২০ লাখ এবং মধুবনকে ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ নুডলস এবং বিস্কুটের মোড়কের গায়ে নতুন করে মেয়াদ লিখে বাজারজাত করা হচ্ছিল বলে মধুবনের বিরুদ্ধে অভিযোগ। এ ছাড়া বনফুল থেকে পচা বাসি মিষ্টি জব্দ করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘনচিনি ব্যবহার করছিল বলে ম্যাজিস্ট্রেট জানান।

সম্প্রতি নগরীর নামী কিছু হাসপাতাল ও রোগ নির্ণয় কেন্দ্রে অভিযান পরিচালনা করেন র্যাব। এসব কেন্দ্রে মেয়াদোত্তীর্ণ রি-এজেন্ট (রাসায়নিক) ব্যবহার করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার প্রমাণ মিলেছে।

এ ছাড়া অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে ডিপ্লোমা টেকনিশিয়ানের পরিবর্তে অষ্টম শ্রেণি পাস কর্মী দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছিল রোগ নির্ণয়ের কাজ। এই ধরনের নানা অভিযোগে নগরের মেট্রোপলিটন হাসপাতালকে ৮ লাখ ১০ হাজার, শেভরন ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ১০ লাখ, মেডিকেল সেন্টারকে দুই লাখ ৫০ হাজার, রয়েল হাসপাতালকে চার লাখ, সিএসসিআর হাসপাতালকে চার লাখ, ল্যাব এইডকে দুই লাখ এবং মেট্রো ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া বেলভিউ এবং সেনসিভকেও একই কারণে জরিমানা গুনতে হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক (উপসচিব) জুবায়ের আহমেদ সিটিজি টাইমস ডটকমকে বলেন, সবখানে ভেজাল। আমরা অভিযান করছি। আইন প্রয়োগ করছি। এতে কিছুদিন ভালো থাকে। আবার শুরু করে।

প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করছেন বলে জানান তিনি।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত