টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

পতেঙ্গা সমূদ্র সৈকত হতে পারে আয়ের বড় উৎস

এস এম ইব্রাহিম খলিল
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

potengaচট্টগ্রাম, ১৬ নভেম্বর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস):  মানসম্মত কোন খাবার হোটেল ও রেস্টুরেন্ট নেই। নেই থাকার সু-ব্যবস্থা। খাবার যা পাওয়া যায় তাও খেতে গুণতে হয় দ্বিগুন-তিনগুণ টাকা। অবকাঠামোগত কোন সুবিধা নেই। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে হতে হয় এশাকার।

তবুও প্রতিদিন দলে দলে পর্যটকরা ছুটে আসে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমূদ্র সৈকতে। লক্ষ্য শুধুমাত্র সমূদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করা। বিশেষ করে সমূদ্রের বিশালতা, গর্জন, শরীর জুড়ানো হাওয়া, সাগরে বয়ে বেড়ানো জাহাজ, এসবই পর্যটকদের কাছে টেনে নেয় সৈকত।

সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সাগরপারের প্রায় ৮ কিলোমিটার জুড়ে ভীড় থাকে পর্যটকদের। যেনতেন ভীড় নয় একেবারে ঠাসা ভীড়। বিকেল ৩টা থেকে সৈকত এলাকা যেন লোকে লোকারন্য। যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

এই সৈকতে সুবিধা বলতে আছে একটাই, সেটা হচ্ছে-বিনা ফিতে প্রবেশ করা। অবশ্যই সৈকতে হারিয়ে যেতে নেই মানা। সাগরপাড়ের সুরক্ষায় বিছানো কয়েকটন ওজনের বিশালাকার জমানো পাথর খন্ডের ফাঁকে ক্লিক-ক্লিক করে ছবি তোলা। সামাজিক ও পারিবারিক অনুশাসনের বাইরে বিনামূল্যে একটু আনন্দ উপভোগ করা কম কিসে।

থাকা-খাওয়ার হোটেল-মোটেল সমূদ্র সৈকতে হয়তো নেই। তবে কপোত-কপোতি আর পরকিয়ায় মত্তদের জন্য কুটরি ঘরের অভাব নেই। সৈকতের বাঁধ ঘেষে গড়ে উঠা শতাধিক অস্থায়ী হোটেল রেস্টুরেন্টের প্রত্যেকটিতে রয়েছে একাধিক কুটরি ঘর। যেখানে প্রতি ঘন্টার জন্য ফি নেওয়া হয় ৪০০-৬০০টাকা। সাথে দেওয়া হয় নিরাপত্তাও। এ জন্য হোটেল-রেস্টুরেন্ট শ্রমিকদেরও বশ করতে হয়।

অন্যথায় মাঝে মধ্যে পুলিশের ঝামেলা পোহাতে হয়। পাওয়া যায় বিদেশি ব্রান্ডের বিয়ার, বাংলা মদ, ভায়াগ্রা ও ইয়াবা ট্যাবলেটও। শুধু পকেটে কাচা টাকা থাকলেই হয়। সৈকতের উত্তল জলরাশিও যেন আছড়ে পড়ে পায়ের কাছে।

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পুলিশের বিশেষ টিম সৈকত এলাকায় টহলে থাকলেও কোন রকম চিন্তার কারণ হতে হয় না জীবন উপভোগকারীদের। যদি না মাদক বিক্রীর সাথে জড়িত বা হোটেল রেস্তোরায় কুটরি ঘরের ধান্দাবাজরা পুলিশকে তাঁতিয়ে না দেয়। আর পুলিশের খপ্পড়ে একবার পড়লে পরনের পেন্টও যে আর পরণে থাকে না। মক্ষিরানী সাজিয়ে সাংবাদিক ডেকে পরের দিন একেবারে ফ্রন্টপেইজে।

এসব অপরাধ কর্মকান্ড অজানা নয়; পতেঙ্গা সমূদ্র সৈকতে আসে দর্শনার্থী বা পর্যটকদের। তবুও যারা এসব থেকে দূরে থাকে তাদের কাছে কম ঘেষে অপরাধীরাও। আর এ নিয়ে যত আপত্তি পর্যটকদের।

আজ বুধবার বিকেলে সরেজমিনে পতেঙ্গা সমূদ্র সৈকত ঘুরে দেখা গেছে অসংখ্য পর্যটকদের ভীড়। সাগর পাড়ের যে কোন প্রান্তে দাড়ালে ডানে-বায়ে দেখা যায়, অসিম সমূদ্রের মতোই জনসমূদ্র। অনুমান করেও বলা যাবে না, কত কিলোমিটার দূরে গিয়ে থেমেছে এই জনসমূদ্র। যা নিয়ন্ত্রণ করার মতো নেই সরকারি কোন সংস্থা। অথচ একটু নজর দিলেই এই পতেঙ্গা সমূদ্র সৈকত হতে পারত দেশের আয়ের অন্যতম উৎস।

পর্যটন করপোরশেন এমনকি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত হওয়া সত্তে¡ও আয়ের এই উৎসের দিকে নজর নেই কারও। আয়ের এই উৎসটি গিলে খাচ্ছে স্থানীয় রাজনৈতিক কতিপয় নেতা ও মাস্তানচক্র। যাদের সাথে যোগসাজশ রয়েছে পতেঙ্গা থানা পুলিশের।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, পতেঙ্গা সমূদ্র সৈকত ব্যবসাীয় কল্যাণ সমিতির নামে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র সৈকতের এককিলোমিটার এলাকায় বাঁশ ও টিন দিয়ে সম্পূর্ণ অস্থায়ীভাবে সহ¯্রাধিক দোকান ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছে। দৈনিক ১০০০ থেকে ৩০০০ টাকা পর্যন্ত এসব দোকান থকে ভাড়া আদায় করে। এতে প্রায় দৈনিক ২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি।

সূত্র জানায়, পতেঙ্গা সমূদ্র রক্ষা বাঁধের দু-পাশের দোকানগুলোতে হোটেল রেস্তোরা গড়ে তুলে খাবার বিক্রী করছে। যা চট্টগ্রাম মহানগরের যে কোন হোটেলের চেয়ে দ্বিগুন-তিনগুণ বেশি দাম রাখা হয়। ১৫ টাকার হাফ লিটার পানির বোতলের দাম রাখা হয় ২৫ টাকা। ১০ টাকার একটি চিপস ২০ টাকা। ভাত, তরিতরকারি ও মাছ-মাংসের দামও যে কোন উন্নত হোটেলের চেয়ে বেশি। আর এসব হোটেলের কুটরি ঘরে চলে কপোত-কপোতির বিশেষ ব্যবসা।

আর সাগরপাড়ের ভাসমান মার্কেটের দোকানগুলোতে বার্মিজ ও চায়নার তৈরী শিশু খেলনা, আছাড় ও কাপড়-চোপড় বিক্রী হয়। যেখানে অন্তত দরদাম করে পণ্য ক্রয় করতে পারেন ক্রেতারা। আর কোন অবকাঠামো এ নেই সৈকতে। ফলে ঝড় বৃষ্টি-রোদে ক্লান্ত পর্যটদের আশ্রয় নিতে হয় এসব দোকান বা মার্কেটে। যেখানে কিছু না খেলে বা না কিনলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয় বিক্রেতারা।

এ অবস্থায় পর্যটকরা সৈকত এলাকায় পর্যাপ্ত অবকাঠামো গড়ে তোলার পক্ষে। আলাপকালে কয়েকজন পর্যটক জানান, এই সমূদ্র সৈকতে মানসম্মত খাবার হোটেল-থাকার মোটেল, রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষার আশ্রয়স্থলসহ সৌন্দর্যমন্ডিত অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে পর্যটকদের ভীড় আরও ভীড় বাড়বে।

অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে পর্যটকদের ভীড় আরও বাড়ার কথা স্বীকার করেছেন পতেঙ্গা সমূদ্র সৈকত ব্যবসায়ী কল্যান সমিতির সহসভাপতি আবু তাহের। যদিও তিনি এ সৈকতকে পর্যটন করপোরেশন বা সরকারি কোন সংস্থার আওতায় নেওয়ার ক্ষেত্রে নারাজ। তিনি বলেন, এ সৈকতকে ঘিরে কমপক্ষে এক লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা। সরকারি সংস্থার আওতায় আসলে এসব মানুষের পেটে লাথি পড়বে।

এখানে আছে পর্যটক-শ্রমিক কল্যাণ সমিতিও। সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুর উদ্দিন বলেন, সরকারি সংস্থার আওতায় গেলে ব্যবসায়ীদেও ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। ব্যবসায়ীরা এখন দোকান নিয়েছে দখলদারদের কাছ থেকে। তখন বৈধভাবে সরকারের কাছ থেকে নিয়ে ব্যবসা করবে।

তবে এক্ষেত্রে সৈকতে প্রবেশ ফি রাখতে হবে সহনীয় পর্যায়ে। যেটা হতে পারে শুধুমাত্র ১০ টাকার মধ্যে। এই সৈকতকে পর্যটন করপোরেশন বা চসিকের আওতায় এনে দোকান বরাদ্দসহ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা হলে প্রতিমাসে সরকারের কোটি টাকার উপরে আয় হবে। শুধু তাই নয়, মাদক বিক্রী ও অসামাজিক কাজ বন্ধ করে প্রাকৃতিক সৈৗন্দর্য্য বর্ধন করা হলে এই পতেঙ্গা সমূত্র সৈকত হবে পর্যটন খাতের সেরা আয়ের উৎস।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন সিটিজি টাইমসকে বলেন, বিষয়টি ভেবে দেখা হয়নি। তবে এ ব্যাপারে পর্যটন করপোরেশনের সাথে আলাপ করা হবে। আমিও চাই সাগর ও প্রকৃতি প্রেমি পর্যটকরা নির্বিঘ্নে নির্মল আনন্দ উপভোগ করুক।

পর্যটন করপোরেশনের চট্টগ্রাম অফিসের ইউনিট ম্যানেজার মো. সাইফুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, পতেঙ্গা সমূদ্র পর্যটন করপোরেশনের একটি অংশ। এ সৈকত পর্যটকদের খুব প্রিয়। প্রতিদিন কম করে হলেও অর্ধলক্ষ পর্যটক আসে এ সৈকতে। যা দেশের আর কোথাও হয় না। কিন্তু এ সৈকতকে সেভাবে গড়ে তোলা হয়নি। অথচ এই সৈকত হতে পারে আয়ের বড় উৎস। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত