টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

অর্থাভাবে বন্ধের পথে চিটাগাং অটিস্টিক স্কুল

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস ডটকম

mumuচট্টগ্রাম, ১৩ নভেম্বর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস):  অর্থাভাবে বন্ধ হওয়ার পথে চিটাগাং অটিস্টিক স্কুল। চট্টগ্রাম নগরীর এনায়েতবাজারস্থ বাটালি রোডের বিআরটিসি স্টেশনস্থ কাসেম ভান্ডারির মাজারের উত্তর পাশে স্কুলটি অবস্থিত। বর্তমানে ব্যক্তি পর্যায়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে প্রতিবন্ধীদের এই বাতিঘরটি।

২০০৯ সালে ভাড়া ভবনে প্রতিবন্ধিদের জন্য স্কুলটি গড়ে তোলেন প্রধান শিক্ষিকা নাজনিন রোকেয়া। এ ভবনের ভাড়া বাবদ ব্যয় হয় ১০ হাজার টাকা। স্কুলটির ৬ জন শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের আনা নেওয়ার জন্য পরিচালিত ভ্যান চালকের বেতন প্রদান করতে হয়। অথচ স্কুলটির আয় বলতে শুধুমাত্র তিন জন প্রতিবন্ধি শিশুর অভিবাবকের দেয়া মাসিক বেতন।

স্কুলের সিনিয়র সহকারী শিক্ষিকা রেজিয়া আক্তার সিটিজি টাইমস ডটকমে জানান, এ স্কুলে বর্তমানে ১৪ জন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী রয়েছে। এরমধ্যে মাত্র তিনজন শিক্ষার্থীর অভিবাবক মাসিক ৩-৪ হাজার টাকা করে দেন। বাকী ১১ জন দরিদ্র পরিবারের প্রতিবন্ধি শিশুকে বিনা বেতনে পড়ানো হচ্ছে।

casতিনি বলেন, তিনজন শিক্ষার্থীর অভিবাবকের কাছ থেকে মাসিক ১০ হাজার টাকা নেয়া হয়। কিন্তু স্কুলটি পরিচালনায় প্রতিমাসে খরচ হয় ৩৫-৪০ হাজার টাকা। যা দীর্ঘদিন ধরে বহন করে আসছেন প্রধান শিক্ষিকা নাজনিন রোকেয়ার স্বামী ও পরিচালনা কমিটির সদস্যরা।

পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় কাউন্সিলর সলিমুল্লাহ জানান, প্রধান শিক্ষিকার স্বামী ইকরামুল হাফিজ খান পেশায় ব্যবসায়ী। ব্যবসার আয় থেকে স্কুলের এ ব্যয়ভার বহন করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আয় কমে যাওয়ায় ব্যয়ভার বহনে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।

তিনি আরও জানান, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রধান শিক্ষিকার স্বামীর অনুদানের টাকায় স্কুলটি পরিচালনা করলেও সম্প্রতি চরম অর্থসংকটে পড়েছে। স্থানীয় দানশীল ব্যক্তি বা দাতা গোষ্ঠি এগিয়ে না আসলে হয়তো স্কুলটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সমাজ কল্যাণ দপ্তরের অনুমোদিত এই প্রতিষ্ঠানটি বছর শেষে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মাত্র ২৫ হাজার টাকা সরকারি অনুদান পাই। এছাড়া আয়ের আর কোন পথ নেই প্রতিষ্ঠানটির। এ ব্যাপারে সরকারি সহযোগীতা পেলে হয়তো প্রতিষ্ঠানটি রক্ষা করা সম্ভব হবে।

আলাপকালে প্রধান শিক্ষিকা নাজনিন রোকেয়া সিটিজি টাইমস ডটকমে বলেন, আমার একমাত্র মেয়ে নাবিলা হাফিজ খান মুমু জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী। মুমু কথা বলতে পারে না, কানেও শোনে না, পাশাপাশি তীব্র মাত্রায় অটিজমে আক্রান্ত। তার জীবন নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে সমাজ ও পরিবারের আরও শত শত প্রতিবন্ধী শিশুর জীবন আমাকে তাড়িত করে। সেখান থেকে এবং সামাজিক দায়বন্ধতা থেকে প্রতিবন্ধি শিশুদের কষ্ঠ ভাগ করে নিতে আমি এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করি।

মুমু সম্পর্কে বলতে গিয়ে নাজনিন রোকেয়া বলেন, একটা সময় গেছে যখন মুমুর আঁচড়-কামড়ে ক্ষত-বিক্ষত হতে হয়েছে আমাকে। টাকার জন্য মেয়েকে বিশেষায়িত বিদ্যালয়েও ভর্তি করাতে পারেননি। কিন্তু পিছু আমি হটিনি। বিশ্বাস ছিল মুমু পারবে। পিএসসি পরীক্ষার ফল যেন সে বিশ্বাসকেই দৃঢ় ভিত্তি দিল। পিএসসিতে জিপিএ-৫ এর মধ্যে ৩ দশমিক ৫৮ পেয়েছে সে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য এই ফলাফল খুব আহামরি কিছু নয়। কিন্তু আমার জন্য এটা সারা জীবনের সাধনার ফসল।

তিনি জানান, মুমুর জন্ম ১৯৯৯ সালের ৭ জানুয়ারি। জন্মের দুই বছর পরও যখন সন্তানের মুখে বোল ফোটেনি, তখন চিকিৎসকেরা জানান, কথা বলা ও কানে শোনার সমস্যার সঙ্গে মুমুর তীব্র মাত্রায় অটিজমও আছে। ২০০১ সালে চিকিৎসার জন্য মুমুকে ভারতে নিয়ে যান বাবা-মা। সেখানে দফায় দফায় নানা প্রশিক্ষণ নিতে হয় আমাকে।

রোকেয়া বলেন, মুমুর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আমাকে “সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ” আর “ স্পিচ থেরাপির” ওপর প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। পাশাপাশি ওকে জামা-কাপড় পরানো, খাওয়ানোসহ স্বাভাবিক জীবনে অভ্যন্ত করতে ওকুপেশন থেরাপি আর আবেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য “সেনসরি থেরাপিও” শিখে নিতে হয়েছে। এসব শেখার পর দেশে ফিরে তা মুমুর ওপর প্রয়োগ করেছি। হাতে হাতে ফল না মিললেও, এখন মুমু লেখাপড়া তো করছেই, নিজে নিজে কম্পিউটারও চালাতে জানে।

রোকেয়া বলেন, প্রতিবন্ধীদের শিক্ষাদান স্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। আলাদা কেয়ার, আলাদা পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়। যা মোটেই স্বাভাবিক ও সহজ নয়। যা পরিচালনা করছি আমরা। পড়ালেখার পাশাপাশি এ স্কুলে সকল প্রকার প্রাথমিক থেরাপি প্রয়োগ করা হয়। যার জন্য কোন বেতন না হয় না।

তিনি বলেন, স্কুলে পাঠদানের জন্য তিনটি ক্লাসরুম ব্যবহার করা হয়। এরমধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে বেলীতে পাঠদান ও কেয়ার করা হয় শিক্ষার্থীদের। দ্বিতীয় পর্যায়ে নয়নতারা এবং তৃতীয় পর্যায়ে জবাতে পাঠদান ও কেয়ার নেয়া হয়। এরমধ্যে যারা ভালো করে তাদের অবস্থা ভেদে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়। বর্তমানে স্কুলের চারজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছে বলে জানান তিনি।

মুমু ও স্কুল নিয়ে স্বপ্ন কী? প্রশ্নের উত্তরে রোকেয়া জানালেন, তিনি কেবল মুমুর কথা ভাবেন না। বরং দীর্ঘ এত বছরের লড়াইয়ে তিনি বুঝতে পেরেছেন অটিস্টিক শিশুদের মেধা ও যোগ্যতার বিকাশ সম্ভব। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের বাবা-মায়েদের মধ্যে যেন এই বিশ্বাসটা জন্মায়। তারা যেন ভেঙে না পড়েন।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত