টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

প্রকাশ্যে পাহাড় কেটে বান্দরবানে অবৈধ ভাবে গড়ে উঠছে ইটভাটা!

এস.এম ইসমাইল হাসান
বান্দরবান প্রতিনিধি 

paচট্টগ্রাম, ০৬ অক্টোবর(সিটিজি টাইমস):  লামা-আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি সহ পার্বত্য বান্দরবান জেলার বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত অর্ধশত ইটভাটার সবগুলোই অবৈধ। এসব ইটভাটায় ইট তৈরি ও পোড়ানোসহ কোন কাজেরই অনুমোদন মিলেনি সরকারের সংশ্লিষ্ট কোন দপ্তর থেকে।

বছরের পর বছর স্থানীয় প্রশাসনকে মোটা অংকের মাসোহারা দিয়ে সরকারী সংরক্ষিত বন ধ্বংস ও পাহাড় কেটে সম্পূর্ণ বেআইনী ভাবে ইটভাটায় ইট তৈরি এবং ইটপোড়ানোর কাজে কাঠ ব্যবহার করেছে একটি সিন্ডিকেট।

অবৈধভাবে পরিচালিত এসব ইটভাটা বন্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য বান্দরবান জেলা পরিবেশ উন্নয়ন কমিটিকে পত্র দিয়ে তাগিদ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মাসুদ করিম সিটিজি টাইমসের আলাপকালে এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

বান্দরবান জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে,লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়িতে প্রায় অর্ধশত ইটভাটা চালু রয়েছে। সরকারী সংরক্ষিত বন, লোকালয়, ফসলী জমি, বিদ্যালয় ও পাহাড়ের পাদদেশে ইটভাটা স্থাপন দন্ডনীয় অপরাধ হওয়া সত্বেও কিছু রানৈতিক নেতার প্রভাব খাটিয়ে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, কক্সবাজারের চকরিয়া,পেকুয়া ও মহেশখালী উপজেলার কিছু ব্যবসায়ী ইটভাটা স্থাপন করে দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে ব্যবসা করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে অনেকটা নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে প্রশাসন। অভিযোগ সচেতন মহলের।

লামা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, লামার ফাইতংয়ে একটি ইউনিয়নেই সরকারী সংরক্ষিত বন ও পাহাড়ের পাদদেশে ২৩টি ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ইটভাটার মালিক যারা সবাই পাশ্ববর্তি কক্সবাজারের চকরিয়া,লোগাগাড়া ও পেকুয়া উপজেলার।

একই ভাবে এরা লামার ফাঁসিয়াখালীতে তিনটি, লামা পৌরসভায় ১টি, গজালিয়া ইউনিয়নে ১টি, সরই ইউনিয়নে ৩টি ইটভাটা স্থাপন করেছে।

আলীকদম ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, আলীকদমে ৩টি ইটভাটা স্থাপন করে প্রায় এক যুগ ব্যবসা পরিচালনা করছে অপর একটি সিন্ডিকেট। তার মধ্যে আল আমিন ব্রিকস নামে ১টি ফাতেমা ম্যানুফ্যাকচারিং ব্রিকস্ নামে অপর ১টি এইচ.বি.এম নামে একটি।

ফাইতংয়ের স্থানীয়রা জানান, ইটভাটা সংলগ্ন পাহাড়ি গ্রাম রাইম্যাখোলা, শিবাতলী পাড়া, মংব্রাচিং কারবারী পাড়া, ফাদু বাগান পাড়া, হেডম্যান পাড়া ও বাঙ্গালি পাড়ার অধিবাসীরা পরিবেশের বিরূপ প্রভাব থেকে রক্ষার জন্য বান্দরবান জেলা প্রশাসক বরাবরে লিখিত আবেদন করেছেন।

ইটপরিবহনে ট্রাকের চাকায় গ্রাশীণ ওই জনপদের কাঁচা সড়কগুলো বর্তমানে চলাচলের অনুপযোগি হয়ে পড়েছে বলে তারা লিখিত আবেদনে তুলে ধরেন।

এদিকে জনসাধারনের জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় এমন স্থানে স্থাপিত ইটভাটা বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে থেকে সরিয়ে নিতে পরিবেশ অধিদপ্তর বান্দরবান জেলা পরিবেশ উন্নয়ন কমিটিকে পত্র দিয়ে তাগিদ দিয়েছে।

লামা, আলীকদম ওনাইক্ষ্যংছড়ির ইটভাটা এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানাগেছে, বছরের পর বছর এক নাগারে ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে কাঠ ব্যবহারের কারণে সরকারি সংরক্ষিত ও ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে সৃজিত কোন বনেই গাছ নেই। প্রতিটি ইটভাটা এলাকা এখন অনেকটা মরু ভূমির মত গাছ শূণ্য।

সচেতন মহলের অভিযোগ, বন বিভাগের দায়সাড়া তদারকি ও বান্দরবান জেলা প্রশাসনের নিরবতায় এসব ইটভাটায় দেদারছে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে নির্দিষ্ট অংকের মাসোহারা গুণছে ইটভাটা মালিকরা।

বান্দরবান জেলা পরিবেশ রক্ষা পরিষদের সভাপতি জামালুদ্দিন হাওলাদার সিটিজি টাইমসকে জানান, অবৈধভাবে ইটভাটা স্থাপন, পাহাড় কেটে ভাটার মাটি সংগ্রহ ও জ্বালানি হিসেবে বনজ সম্পদ উজাড়ের কারণে লামার ফাইতং এলাকাটি বর্তমানে প্রায় মরুভূমির মতো হয়েগেছে। ওই এলাকায় গাছ-গাছালি না থাকায় পানির স্তর অনেক নীচে নেমে গেছে। পুরো এলাকায় পানির জন্য হাহাকার চলছে।

একইভাবে ফাঁসিয়াখালী, লামা, নাইক্ষ্যংছড়ি ও আলীকদমে ইটভাটা এলাকার কয়েক কিলোমিটারে মধ্যে সরকারীভাবে সংরক্ষিত বনে কোন গাছ নেই। পাহাড়ি গ্রামগুলোতে জীব বৈচিত্র ও জনবসতি হুমকির মুখে। কাঠচোর সিন্ডিকেট ও ইটভাটা মালিকরা কাঠ কেটে সাবার করেছে বলে তিনি দাবী করেন।

লোকালয়ে ইটভাটা স্থাপন ও বন উজাড়ে পরিবেশের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ মোঃ শফিউর রহমান মজুমদার সিটিজি টাইমসকে বলেন, যে এলাকায় বনজ সম্পদ ধ্বংস করে ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো হয়, ওই এলাকার নারী ও শিশুরা শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে ভূগবে। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ বৃদ্ধি পায়।

তিনি আরো জানান, পরিবেশের এই বিরূপ প্রভাব রোধ করা না হলে মাতৃগর্ভে ভ্রুন নষ্ট, গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্য হাণি, গর্ভের সন্তান বিকলঙ্গা হয়। এছাড়া দিন দিন আরও জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। যা এক পর্যায়ে ক্যানসারে আকার ধারণ করে।

ফাইতংয়ের একটি ইউনিয়নে অবৈধ ২৩ ইটভাটা স্থাপনের বিষয়ে জানতে চাইলে লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার খিন ওয়ান নু বলেন, এই বিষয়ে খবর নিচ্ছি! এছাড়া লামার শিবাতলী মারমা পাড়া থেকে স্থানীয়রা একটি ইটভাটার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসক বরাবরে আবেদন করেছেন। বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার খিন ওয়ান নু।

বান্দরবানের লামার-আলীকদম-নাইক্ষ্যংছড়িতে অবৈধ ইটভাটা সম্পর্কে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মাসুদ করিম সিটিজি টাইমসকে বলেন, বান্দরবান জেলায় সরকারের অনুমোদন প্রাপ্ত কোন ইটভাটা নাই। পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ইটভাটা স্থাপনের জন্য কেউই ছাড়পত্র গ্রহণ করেননি বা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র প্রদান করা হয়নি।

জনসাধারণের ক্ষতি হয় এবং সরকারী সংরক্ষিত বন, বিদ্যালয় ও জনবসতি এলাকা থেকে ইটভাটা সরিয়ে নেওয়ার জন্য বান্দরবান জেলা প্রশাসককে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পত্র দেয়া হয়েছে।

বান্দরবান জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ হারুনুর-অর-রশিদ সিটিজি টাইমসকে বলেন, খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে অবৈধ ইট ভাটার বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত