টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

ঘুষের হাট রাঙ্গুনিয়ার কাউখালী ইউনিয়ন ভূমি অফিস !

আব্বাস হোসাইন আফতাব
রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি 

ranguniaচট্টগ্রাম, ০৬ অক্টোবর(সিটিজি টাইমস):  রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়নের কাউখালী ভূমি অফিসে ঘুষ বাণিজ্য বেপরোয়া আকার ধারণ করেছে। এ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকাশ্যে এ ঘুষ বাণিজ্যের কারণে সাধারণ ভূমি মালিকরা অতিষ্ট হয়ে পড়েছে। সরকার জমি বেচা-কেনায় হালসন খাজনার দাখিলা ও নামজারি খতিয়ান বাধ্যতামূলক করার পর থেকেই মূলত এ ঘুষ বাণিজ্য মারাত্মক আকার ধারণ করে। উপজেলার সবক’টি ভূমি অফিসে এ ঘুষ বাণিজ্য চলে আসলেও কাউখালী ভূমি অফিসে এ মাত্রা মহামারি হিসাবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে এ অফিসে ইউনিয়ন উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা এন আলম সিদ্দিকী যোগদান করার পর থেকে অফিসটি ঘুষের হাট হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। গড়ে উঠেছে একটি দালাল চক্র।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া অফিসে নেই। খাজনা আদায়ের রশিদ বই সামনে ইউনিয়ন উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা এন আলম সিদ্দিকী বসে আছেন। তার সামনে খাজনার বালাম বইয়ের স্তুপ। আগত ভূমি মালিকদের হাত থেকে খতিয়ানের কপি নিয়ে সেই সব বালাম বই তার সামনে রাখছেন দুই অফিস কর্মচারী ফাহিমা ও কোহিনুর। এই দুই কর্মচারী যে সব ভূমি মালিকদের হাতে খতিয়ানের কপি আছে তাদের কাছ থেকে ৫০ টাকা আর যাদের জন্যে খতিয়ানের বই বের করতে হয় তাদের কাছ থেকে ১শ’ টাকা করে হাতিয়ে নিচ্ছেন। সরকার বাড়ি ও দোকান ব্যতিত অন্যান্য শ্রেণীর জমির জন্যে খাজনা মওকুপ করেছেন। ফলে প্রতি খতিয়ানে সর্বনিম্ম ১০ টাকা করে খাজনার রশিদ কেটে দিচ্ছেন ইউনিয়ন উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা। ভূমি মালিকদের হাতে ১০ টাকার খাজনার রশিদ প্রদান করা হলেও তাদের কাছ থেকে ইউনিয়ন উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা নিচ্ছেন ৩শ’ থেকে ৫শ’ টাকা করে। পুরণো যারা আছেন তারা এটাকেই নিয়ম হিসেবে ধরে বিনা বাক্য ব্যয়ে দাবীকৃত টাকা দিয়ে সরে পরছেন। আর নতুন কেউ এ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই তার হাত থেকে রশিদখানা চিলের মতো ছোঁ মেরে কেড়ে নেয়া হচ্ছে। পরে শত অনুরোধেও সে রশিদ আর মিলে না। এদিকে খতিয়ানে বাড়ি আর দোকান শ্রেণী থাকলেই ইউনিয়ন উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। ভূমি মালিকের অংশ যত শতাংশই হোক খতিয়ানে লিপিকৃত পুরো জমির খাজনাই তাকে আদায় করতে হচ্ছে। আর এ জন্যে তাকে গুণতে হচ্ছে মোটা অংকের টাকা। সাথে পূর্বে পরিশোধ করা খাজনার কোন রশিদ থাকলে কিছুটা রক্ষে, না হয় ৩০ থেকে ৩৫ বছরের খাজনা একসাথেই আদায় করতে হচ্ছে। পূর্বে কোন খাজনা আদায় করা হয়েছে কিনা তা দেখার কোন ফুসরত তাদের নেই। কারো কারো পীড়াপীড়িতে বালাম বই খোলা হলেও বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে বালাম বই খালিই মিলছে। এক্ষেত্রে ভূমি মালিকদের আদায় করতে হচ্ছে ২ থেকে ৩ গুণ টাকা। এসব ভিটা ও দোকান শ্রেণীর খাজনা আদায় চলছে চুক্তির মাধ্যমে। শুরুতেই দাবী করা হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। দর কষাকষি শেষে তা ১৫ থেকে ২০ হাজারে এসে দাঁড়ায়। বিনিময়ে ভূমি মালিকদের হাতে দেয়া হচ্ছে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার খাজনার রশিদ। এ সময় খাজনা দিতে আসা মোহাম্মদ মহিউদ্দিন নামের এক কলেজ ছাত্র জানান, তিনি বেতাগী ইউনিয়নের গুনগুনিয়া বেতাগী মৌজার তার পিতামহের নামীয় ৪ শতাংশ বাড়ি ভিটার খাজনা দিতে এসেছিলেন গতকাল। তখন তার কাছে ১৮ হাজার টাকা দাবী করা হয়েছিল। তিনি অত টাকা না থাকায় ফিরে যেতে চাইলে অফিসার ১০ হাজার টাকায় খাজনার রশিদ কেটে দিবেন বলে জানান। আজ ১০ হাজার টাকায় খাজনার রশিদ নিতে এলে অফিসার ৪ হাজার ৬শ’ টাকার রশিদ কেটে দেন। কামাল উদ্দিন, মুন্সি মিয়া, আবদুর রহমান, খালেকুজ্জামান, রশিদ আলী, বাদশা মিয়াসহ উপস্থিত প্রায় ২০-২৫ জন ভূমি মালিক জানান, তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই ১০ টাকা খাজনার রশিদের বিনিময়ে ৩শ’ টাকা করে নেয়া হয়েছে।

নোয়াগাঁও পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মুফিজুল হক, পোমরা ইউনিয়নের দক্ষিণ পোমরা এলাকার নেজাম উদ্দিন, বেতাগী ইউনিয়নের কাউখালী এলাকার এখলাস মিয়া ১০ টাকার খাজনার রশিদের বিনিময়ে ৩শ’ টাকা করে নেয়ার কথা স্বীকার করে ইউনিয়ন উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্যে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাবী জানিয়েছেন। তারা ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সেবা প্রার্থীদের সাথে অসদাচরণেরও অভিযোগ আনেন।

পোমরা জামেয়া নঈমিয়া তৈয়বীয়া সিনিয়র মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা হারুন রশিদ জানান, তার প্রতিবেশী আবদুল কাদের গত ২৩ অক্টোবর তার মায়ের নামে নামজারীকৃত সাড়ে ৫ শতাংশ বাড়ি ভিটার খাজনা দিতে গেলে ভূমি কর্মকর্তা এন আলম সিদ্দিকী ২০ হাজার টাকা দাবী করেন। আবদুল কাদের অনেক অনুনয়-বিনয় করে ১৫ হাজার টাকায় খাজনার রশিদ দেয়ার বিষয়ে রাজী করান। পরদিন ২৪ অক্টোবর ১৫ হাজার টাকা ওই অফিসারের হাতে দিলে তিনি আবদুল কাদেরকে ৭ হাজার ৭ টাকার একখানা খাজনার রশিদ দেন। আবদুল কাদের খাজনার রশিদ নিয়ে তার অফিসে এলে তিনি বিস্মিত হয়ে যান। তিনি সাথে সাথেই বিষয়টি স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে পোমরা ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক জাহেদুল ইসলামকে জানান। তিনি ওই অফিসারকে ফোন করে শাসানোর সাথে সাথেই তিনি ৮ হাজার টাকা আবদুল কাদেরকে ফেরত দিতে বাধ্য হন। পোমরা ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক জাহেদুল ইসলাম বিষয়টি এ প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন। খাজনা আদায়ে এই তুঘলকি কারবার ছাড়াও এ অফিসের দুই কর্মচারী ফাহিমা ও কোহিনুর ভূমি মালিকদের কাছ থেকে খসড়া খতিয়ানের প্রতিটি পৃষ্ঠার জন্যে আদায় করেন ১শ’ টাকা করে। দাগ ভাঙানোর জন্যে প্রতিটি দাগে নেন ৫০ টাকা। এসব ছাড়া এ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্য কাজটি হচ্ছে নামজারী খতিয়ান সৃজনের অর্ডার নেয়া। গ্রামের সহজ সরল ভূমি মালিকরা নামজারি নামের যাঁতাকলে পড়ে সর্বশান্ত হয়ে পড়ছেন। এমনিতেই জমির মারপ্যাঁচ তারা খুব একটা বোঝেন না। তার উপর জমা খারিজ করে নিজের নামে নামজারি খতিয়ান সৃজন করা যেন মরার উপর খরার ঘাঁ। এ ব্যাপারে ভূমি অফিসে আসলেই তাদের মাথার উপর আকাশ ভেঙে পড়ে। একটি নামজারির জন্যে এন আলম সিদ্দিকী হাতিয়ে নেন ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এতে তাকে সহযোগিতা করেন দুই কর্মচারী ফাহিমা ও কোহিনুর। প্রকৃতপক্ষে কাউখালি ভুমি অফিসে সেবা গ্রহিতা এলে তাকে কৌশলে ফাঁদে ফেলেন দ্ইু কর্মচারী। পরে স্যারের সাথে কথা বলতে ডেকে নিয়ে যান ভূমি অফিসের বাইরের উত্তর পাশের কক্ষটিতে। সেখানে বেেস স্যার (এন আলম সিদ্দিকী) দর কষাকষি শেষে কাজ হাতে নেন। এই দুই নারী কর্মচারী সেবা গ্রহিতাদের বলেন স্যার ১০ হাজার টাকার নিচে ঘুষ নেননা। তাই আমাদের সাথে কথা বলে লাভ নেই স্যারের সাথেই কথা বলেন।

ভূক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, একটি সাধারণ নামজারির জন্যে একজন ভূমি মালিক থেকে নেয়া হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। এর বাইরে দুই বা ততোধিক দলিল হলে কিংবা জমির পরিমাণ ১ একরের চেয়ে বেশী হলে দলিল কিংবা জমির পরিমাণ অনুযায়ী টাকার পরিমাণও দ্বিগুণ থেকে কোন কোন সময় ৪ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৭৫ সালে রেজিস্ট্রি হওয়া দলিল হলে তো আরো বিপদ। সাল অনুযায়ী সে দাবী ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে যায়। টাকা দেয়ার পরও ভূমি মালিকরা সঠিক সময়ে খতিয়ান ফেরত পাচ্ছেন না। এ ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে গেলে ভূমি কর্মকর্তার হাতে তাদের চরমভাবে লাঞ্চিত হতে হয়। এ ব্যাপারে সীতাকুন্ড উপজেলার হালিমপুর এলাকার ননী গোপাল দাশ জানান, তিনি ও তার স্ত্রী ঊষা রাণী দাশ তার এক নিকটাত্মীয়কে দিয়ে পোমরা মৌজার ২৪২১নং খতিয়ানের তাদের নামে খরিদা জমির নামজারি করানোর জন্যে আবেদন করলে পোমরা ভূমি অফিস ৩০ হাজার টাকা দাবী করেন। পরে ২৫ হাজার টাকায় করে দেয়ার জন্যে রাজী হন। এ ব্যাপারে ইউনিয়ন উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা এন আলম সিদ্দিকীকে ৫ হাজার টাকা অগ্রিম দেয়া হয়। পূর্বে এ খতিয়ান থেকে অন্য একটি নামজারি সৃজিত হলেও ভিপি সম্পত্তির ‘ক’ ছক ভূক্ত হওয়ায় ভূমি অফিস নামজারি আবেদনটি খারিজ করে দেয়। ফলে অগ্রিম বাবদ দেয়া টাকা ফেরত চাইলে এন আলম সিদ্দিকী সেই টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান। ওই অফিসার দম্ভ করে বলেন, তিনি টাকা নিতে জানেন, দিতে নয়। পরে অবশ্য সেই টাকা ফেরত দিতে তিনি বাধ্য হন।

এ অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া আসেন হাটহাজারী থেকে, উপ-সহকারী কর্মকর্তা এন আলম সিদ্দিকী বান্দরবান থেকে, দুই কর্মচারীর মধ্যে ফাহিমা নগরীর চান্দগাঁও আর কোহিনুর আসেন পটিয়ার খরনা থেকে। প্রতিদিন তারা এসব স্থান থেকে অফিস করতে আসার কারণে কোনদিনও সঠিক সময়ে তারা অফিসে আসতে পারেন না। তার উপর ফেরার বেলায় অফিস সময়ের আগেই বাড়ির পথ ধরেন। যেটুকু সময় অফিস করেন তা চলে যায় ঘুষ বাণিজ্যের দহরম-মহরম করতে করতে। এসব ব্যাপারে এন্তার অভিযোগ থাকলেও অদৃশ্য কারণে উর্ধতন র্কতৃপক্ষ নিরবই থেকেছেন।

এ ব্যাপারে অবিযুক্ত ইউনিয়ন উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা এন আলম সিদ্দিকী পোমরা ইউনিয়নের আবদুল কাদেরের খাজনা আদায়ের অতিরিক্ত ঘুষের টাকা ফেরত দেয়ার সত্যতা স্বীকার করে বলেন বিষয়টি সুরাহা হয়েছে, আপনি অফিসে আসলে বসে কথা বলবো। বান্দরবান থেকে প্রতিদিন আসা যাওয়ায় অতিরিক্ত খরচ ও পরিশ্রম হওয়ায় কেউ কেউ কিছু টাকা হাতে গুজে দেন বলে তিনি স্বীকার করেন, কারো কাছ থেকে দাবী করে টাকা নেননা, তবে এটাকে তিনি ঘুষ বলতে রাজী নন অতিরিক্ত পারিশ্রমিক হিসেবেই মানুষে দেন বলে তিনি দাবী করেন।

এ ব্যাপারে ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, একমাস আমি মেয়ের চিকিৎসার জন্য ছুটি নিয়ে দেশের বাইরে থাকাকালীন নুরে আলম সিদ্দিকী দায়িত্বে ছিলেন, এসময়ে তিনি কি করেছেন আমি জানিনা। তবে কিছু কিছু অসঙ্গতির আভাস পাচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, কেউ আমার কাছে লিখিত অভিযোগ করেননি এসব বিষয়ে। কাউখালী ইউনিয়ন ভুমি অফিসে ঘুষের হাট বসার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করলেও উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা এন আলম সিদ্দিকী আসার পর থেকে সেবা নিতে আসা মানুষগুলো হযরানীর শিকার হবার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেননি।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত