টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামে রেলের জমি গিলে খাচ্ছে রেলওয়ে

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস

চট্টগ্রাম,  ০৩ নভেম্বর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস):: রেলওয়ের সবচেয়ে বেশি জমি রয়েছে চট্টগ্রামে। এসব জমির সিংহভাগই অবৈধ দখলে। যার সাথে নানা কায়দায় জড়িত খোদ রেলওয়ে কর্মকর্তারা। এরমধ্যে রয়েছে প্রতিকী মূল্যে জমি বরাদ্দ। আছে ইজারাও। যা থেকে সরকারের তেমন কোন আয় না হলেও মোটা অঙ্কের আয় ঠিকই হচ্ছে রেলওয়ে কর্মকর্তাদের। আদায় করে নিচ্ছে নানা সুযোগ-সুবিধাও।

সূত্রমতে, রেলওয়ের প্রায় ১০০ একর জমি প্রতীকী মূল্যে বরাদ্দ দেয়া আছে বিভিন্ন সংস্থার কাছে। ব্যক্তিস্বার্থে ১-৫ হাজার টাকায় বরাদ্দ দেয়া এসব জমি থেকে রেলওয়ের কোনো আয় নেই। আর ১ হাজার ৫৯৩ একর জমি ইজারা দেয়া হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো থেকে অর্থ পায় না রেলওয়ে। এসব বিষয়ে যেন একেবারেই উদাসীন সংস্থাটি।

রেলওয়ে চট্টগ্রামের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগে রেলের মোট জমির পরিমাণ ৭ হাজার ৭০১ একর। এর মধ্যে সংস্থার নিজস্ব প্রয়োজনে ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার একর। আর অব্যবহৃত জমির পরিমাণ ১ হাজার ৭৩ দশমিক ৯৭ একর। বাকি জমি হয় বেদখল, না হয় ইজারা বা প্রতীকী মূল্যে বরাদ্দ দেয়া।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ভ‚স¤পত্তি বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ইউএসটিসি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালকে চার দফায় ৭ দশমিক ৭৮ একর জমি প্রতীকী মূল্যে দেয় রেলওয়ে। এক্ষেত্রে মূল্য ধরা হয় ১ থেকে ৫ হাজার টাকা। তবে ব্যক্তিস্বার্থ সংরক্ষণের জন্য এসব ক্ষেত্রে অভিনব কিছু শর্ত জুড়ে দেয়া হয়।

প্রথম দফায় ইউএসটিসিকে জমি দেয়ার ক্ষেত্রে শর্ত ছিল, রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের সন্তানদের বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য পাঁচটি আসন বরাদ্দ রাখা। বিষয়টি নিশ্চিত করতে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটিতে রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক মনোনীত একজন প্রতিনিধি থাকবে। সেবার বরাদ্দ দেয়া হয় ৩ দশমিক ৭৮ একর জমি।

দ্বিতীয় দফায় ১ একর জমি দেয়ার সময় শর্ত ছিল, হাসপাতালটিতে চিকিৎসায় আরো পাঁচটি আসন সংরক্ষণ ও ইউএসটিসি মেডিকেল কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে রেলওয়ের জন্য পাঁচটি আসন সংরক্ষণ করা হবে। এসব আসনে রেয়াতি হারে ভর্তির সুযোগ দেয়া হবে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের।

তৃতীয় দফায় ১ দশমিক ৪৩ একর জমি দেয়ার ক্ষেত্রে শর্ত ছিল, হাসপাতালের ১০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ, আরো পাঁচটি আসন ভর্তির জন্য বরাদ্দ রাখা এবং অন্যান্য আসনেও ভর্তির ক্ষেত্রে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।

আর চতুর্থ দফায় ১ দশমিক ৫৭ একর জমির মূল্য বাবদ ১৫ লাখ টাকা ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসেবে জমা রেখে তা থেকে প্রাপ্ত সুদ ইউএসটিসিতে অধ্যয়নরত রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সন্তানদের বৃত্তি হিসেবে প্রদান করা।

ব্যক্তিস্বার্থে রাষ্ট্রীয় জমি বরাদ্দ দেয়া হলেও সে চুক্তি মানছে না ইউএসটিসি। ফলে রেলওয়ের জন্য বরাদ্দ কোটায় ভর্তি হতে পারছে না সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সন্তানরা। এছাড়া ইউএসটিসির গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবে রেলের মনোনীত ব্যক্তির পদটিও বাতিল করেছে ইউএসটিসি। ফলে নামমাত্র মূল্যে জমি দিয়েও ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল কর্তৃপক্ষ।

তবে ইউএসটিসির রেজিষ্টার শামস-উদ-দোহা এ প্রসঙ্গে বলেন, রেলওয়ের সাথে প্রতিকী মূল্যে জমি বাদ্দের শর্ত রেলওয়ে নিজেই লঙঘন করেছে। তারা প্রতিনিধি না পাঠালে আমাদের কি করার আছে। তারা চাইলে অবশ্যই শর্তের সকল সুযোগ-সুবিধা পাবেন।

রেল কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বিপুল পরিমান রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির যথেচ্ছার ব্যবহার করে শুধুমাত্র রেলওয়ে কর্মকর্তারা নানা সুযোগ সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রতিকী মূল্যের নামে জমি বরাদ্দকালে গোপনে লেনদেন হয় লাখ টাকাও। ফলে শর্ত ভাঙার পরও রহস্যজনক নিরব ভুমিকা পালন করছে রেলওয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। চালিয়ে যাচ্ছে প্রতীকী মূল্যে জমি বরাদ্দ দেয়াও।

ভুসম্পত্তি বিভাগের তথ্যমতে, কোটা আর বিভিন্ন শর্তে চট্টগ্রাম কিডনি ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি, বাংলাদেশ মানসিক প্রতিবন্ধী কল্যাণ ও শিক্ষা সমিতি, সোসাইটি ফর অ্যাসিস্ট্যান্ট টু হিয়ারিং ই¤েপয়ার্ড চিলড্রেন, উইলিয়াম কেরি একাডেমি, কুমিরা আবাসিক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স, পাহাড়তলী কলেজ, টিকেট প্রিন্টিং প্রেস কলোনি স্কুল, রেলওয়ে পাবলিক স্কুল, ইউসেপ বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম অফিসার্স ক্লাব, ইনস্টিটিউট অব ডিপে¬ামা ইঞ্জিনিয়ার্স এবং জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতিকে প্রতীকী মূল্যে রেলওয়ের জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

বাণিজ্যিক শর্তে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র ও ফয়স লেকের জন্য জমি দিলেও তা থেকে রেলওয়ের আয় নেই বললেই চলে। ফয়স লেক ইজারা নিয়ে কনকর্ড গ্রæপ বিনোদন পার্ক তৈরি করলেও রেলওয়েকে কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। বিজেএমইএকে বরাদ্দ জমিতে ভবন নির্মিত হলেও প্রাপ্ত ফ্লোর ভাড়া দিতে পারেনি রেলওয়ে। ফলে বাধ্য হয়ে বিনা দরপত্রে নামমাত্র মূল্যে ফ্লোরটি বিজেএমইএকেই ভাড়া দেয়া হয়েছে। একই অবস্থা বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের ক্ষেত্রেও।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ভুসম্পত্তি বিভাগের ব্যবস্থাপক দেলোয়ার হোসেন জানান, সরকারি পর্যায়ে চট্টগ্রাম বন বিভাগ, কর্ণফুলী পেপার মিলস, মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা সিটি করপোরেশন রেলের জমি ইজারা নিয়েও বকেয়া পরিশোধ করছে না। এ নিয়ে একাধিকবার আন্ত:মন্ত্রণালয় বৈঠক হলেও সরকারি এসব সংস্থা অর্থ পরিশোধে গড়িমসি করছে। বেসরকারি পর্যায়ে রেলওয়ে সমবায় ঋণদান সমিতি, আন্তঃজেলা ট্রাক মালিক সমিতি, ধুমঘাট ট্রাক মালিক সমিতি এবং রেলওয়ে মেন্স স্টোর্সের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা করা হলেও অর্থ আদায়ে কার্যকর অগ্রগতি নেই।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল (চট্টগ্রাম) এর মহাব্যবস্থাপক আবদুল হাই এ প্রসঙ্গে বলেন, ইজারা বাবদ বকেয়া আদায়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের নিয়মিত চিঠি পাঠানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। আর প্রতিকী মূল্যে জমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে শর্ত না মানায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেয়া হয়েছে। চুক্তির শর্তানুযায়ী ন্যায্য হিস্যা আদায়ে প্রয়োজনে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বিভাগে রেলের মোট ইজারা দেয়া জমির পরিমাণ ১ হাজার ৫৯২ দশমিক ৫৮ একর। এ বিপুল জমি ইজারা দেয়া হলেও ভ‚স¤পত্তি বিভাগের আয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য বাড়েনি। বরং গত কয়েক বছরের ব্যবধানে চট্টগ্রাম বিভাগে রেল ভ‚মি ইজারা বাবদ বকেয়ার পরিমাণ ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ২০১১ সালে রেলের ইজারা বাবদ বকেয়ার পরিমাণ ছিল ৪০ কোটি ৩৯ লাখ ৫৫ হাজার ৩০৩ টাকা।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত