টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রাম ওয়াসার কোটি টাকার পানি বাণিজ্য!

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস 

চট্টগ্রাম, ২৬ অক্টোবর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস): চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রতিষ্ঠার ৫২ বছর পরও নগরীর ৫৮ শতাংশ এলাকা পানি সরবরাহের আওতায় আসেনি। ৪২ শতাংশ এলাকা আওতায় আসলেও চাহিদার তুলনায় পানি সরবরাহ এখনো এক তৃতীয়াংশের কম।

সরকারি এই সেবা খাতের আওতায় চাহিদার তুলনায় ৬৮ ভাগ পানি সঙ্কট দেখালেও অবৈধপথে প্রতিদিন চলছে চট্টগ্রাম ওয়াসার কোটি টাকার পানি বাণিজ্য। এই বাণিজ্যের সাথে জড়িত খোদ ওয়াসার উর্ধ্বতন কর্তারা।

ওয়াসা সূত্র জানায়, নগরবাসীর পানির চাহিদা পুরণে ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম ওয়াসা। এরমধ্যে ৫২ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু নগরীর অধিকাংশ এলাকায় এখনো পানি সরবরাহে সক্ষম নয় ওয়াসা। ফলে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানির হাহাকার লেগেই আছে। আর এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ এক শ্রেণীর প্রভাবশালী মহলকে ব্যবহার করে অবৈধপথে চালিয়ে যাচ্ছে পানি বাণিজ্য।

ওয়াসার তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় দৈনিক দেড় থেকে দুই কোটি লিটার ওয়াসার পানি অবৈধভাবে বিক্রি হয়। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন সিন্ডিকেট ওয়াসার লাইন থেকে পানি নিয়ে এ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীর দক্ষিণ হালিশহর ইপিজেড এলাকার রেল ক্রসিং থেকে শুরু করে ১ নম্বর মাইলের মাথায় লিমনের দোকান, ব্যারিস্টার কলেজ, তিন রাস্তার মোড়, আব্দুল মাবুদ সওদাগরের বাড়ির পাশে, ফ্রি পোর্ট বে শপিং গণশৌচাগার, বন্দরটিলা জালাল প্ল¬াজা, চক্ষু হাসপাতাল, সিটি ব্যাংকের পাশে, নারকেল তলা, রেইনবো কমিউনিটি সেন্টার, চিটাগাং আইডিয়্যাল স্কুলসহ বিভিন্ন জায়গায় কমপক্ষে শতাধিক ব্যক্তি ওয়াসার এই অবৈধ পানি ব্যবসার সাথে জড়িত। যাদের সহযোগীতায় রয়েছে ওয়াসার অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

মূলত এই দুষ্ট চক্রের সহযোগিতায় ব্যবসায়ীরা ওয়াসার পানি সরবরাহের সময় নিজেদের ইচ্ছেমতো পানি বড় ট্যাংকে মজুদ করে রাখে। পরবর্তীতে ওই পানি জারে সংরক্ষণ করে বিক্রি করা হয়। এছাড়াও ওয়াসার পানি সরবরাহকারী গাড়িতে করেও চলছে এই ব্যবসা। ওয়াসার পানি বিক্রি করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হলেও এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয় না কর্তৃপক্ষ।

জানা যায়, নগরীর বন্দরটিলা এলাকায় অবৈধপথে ওয়াসার পানি বিক্রির সাথে জড়িত মো. বাবুল। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে তার এই পানির ব্যবসা।

দৈনিক কি পরিমাণ পানি বিক্রি করে জানতে চাইলে বাবুল বলেন, প্রতি জার ১৫ টাকা করে নেয়া হয়। প্রতি ভ্যানে ১৫ থেকে ২০টি জারে পানি সরবরাহ করা হয়। প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ ভ্যান পানি বিক্রি করা হয়। কখনো কখনো এর চেয়ে বেশিও বিক্রি হয়।

বাবুল জানান, নগরীর হালিশহর থেকে বন্দরটিলা পর্যন্ত প্রতিদিন অন্তত ৩০ লাখ লিটার ওয়াসার পানি অবৈধভাবে বিক্রি হয়। এসব জায়গায় দীর্ঘ লাইনে ভ্যান গাড়ী পানি ভর্তি করার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। ভ্যানে করে জারের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরাই চাহিদা অনুযায়ী গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেন। প্রতি জার পানি বিক্রি হয় ১৫- ২০ টাকায়। আর ভ্যানে করে এলাকায় নিয়ে সেই পানি ভর্তি জার বিক্রি হয় ৩৫-৫০ টাকায়।

নগরীর হালিশহর এলাকার শওকত হোসেন জানান, এক জন বিক্রেতা প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ ভ্যান পানি বিক্রি করেন। প্রতি জারে ২০ লিটার হিসাবে একজন বিক্রেতা প্রতিদিন বিক্রি করে অন্তত ৩০ হাজার লিটার পানি। সেই হিসেবে অবৈধপথে যায় অন্তত ৩০ লাখ লিটার পানি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার এক কর্মকর্তা বলেন, জার প্রতি পাইকারি হিসেবে ১৫ টাকা ধরা হলে একজন বিক্রেতা প্রতিদিন ২২ হাজার ৫০০ টাকার পানি বিক্রী করে। সেই হিসেবে ওই এলাকায় প্রতিদিন পানি বিক্রী হয় ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকার। এভাবে নগরীর সহ¯্রাধিক পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন কোটি টাকার পানি অবৈধপথে বিক্রী হয়।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফজলুল্লাহ বলেন, ওয়াসার পানি ব্যবহারে ধরা-বাধা কোন নিয়ম নেই। তবে ওয়াসার পানি নিয়ে ব্যবসা করার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরণের সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে গ্রাহকের লাইন কেটে দেওয়া হয়। বিধিমতে জরিমানাও করা হয়।

এদিকে মাত্র ৪২ শতাংশ এলাকায় পানি সরবরাহ সম্পর্কে জানতে চাইলে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, নগরীর পুরো এলাকা ওয়াসার আওতায় আনতে হলেও নতুন লাইন সম্প্রসারন ও ট্রিটমেন্ট প্লান্ট গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু অর্থসহ নানা কারণে এখনো তা সম্ভব হয়ে উঠেনি। সরবরাহ লাইন ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আওতাধীন এলাকায়ও পানি সরবরাহ ব্যাহত হয়।

প্রশ্নের জবাবে এ কে এম ফজলুল্লাহ বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের লোকবল অনেক কম। তাই সবকিছু সঠিকভাবে তদারকি করা আমাদের পক্ষে অনেক সময় সম্ভব হয় না। পানি বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেলেও অভিযানে গিয়ে আলামত পাওয়া যায় না; তাই আমাদেরও করার কিছু থাকে না।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত