টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

বন্দরনগরীতে ঘোষনা দিয়ে অভিযান, কমলো না জিনিসপত্রের দাম

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস

bazar-sobzi
চট্টগ্রাম, ২৩ অক্টোবর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস):  ঘোষনা দিয়ে চট্টগ্রামের সবকটি বাজার তদারকি অভিযান শুরু করেন জেলা প্রশাসনের বাজার মনিটরিং কমিটি। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গত ২১ ও ২২ অক্টোবর অন্তত ১৪টি বাজার মনিটরিং করা হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। একটুও কমলো না জিনিসপত্রের দাম।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাইকারী ও খুচরা বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া রোধে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বাজার তদারকি অভিযান শুরু করা হয়। এতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মমিনুর রশিদ, সাব্বির রহমান সানি ও শারমিন আক্তার।

মনিটরিং কমিটি সূত্র জানায়, গতকাল শনিবার নগরীর কর্ণেলহাট, পাহাড়তলী ও ফিরিঙ্গীবাজার, বক্সিরহাট, চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ ও বংশাল রোড বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্য তদারকি করা হয়। এর আগের দিন নগরীর কাজীর দেউরি, রেয়াজউদ্দিন বাজার, চকবাজার, আতুরার ডিপো বাজার, ষোলশহরের কর্ণফুলী কমপ্লেক্স, বিবিরহাট ও ফইল্যাতলী বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য তদারকি করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা।

নিবার্হী ম্যাজিস্ট্রেট শারমিন আক্তার বলেন, স¤প্রতি বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য মূল্যের উর্ধ্বগতিতে জনমনে নাভিশ্বাস উঠে। ফলে জেলা প্রশাসক মো. সামসুল আরেফিনের নির্দেশে ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মমিনুর রশিদের নেতৃত্বে গত শুক্রবার থেকে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পাইকারী ও খুচরা বাজারে পণ্যের মূল্য মনিটরিং শুরু করা হয়।

এতে দেখা যায়, চালের আড়ত গুলোতে মূল্য তালিকা টাঙিয়ে রাখা হলেও অন্যান্য নিত্য পণ্যের দোকানে কোন মূল্য তালিকা টাঙিয়ে রাখা হয়নি। পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের রশিদও দেখাতে পারেনি দোকানীরা। এ দুটি বাজারে চালের মূল্য মোটামুটি স্থিতিশীল। তবে নিত্যপণ্যের দাম বেশি। আড়তের সাথে পাইকারী ও খুচরা দোকানে তরিতরকারির মূল্য দোকান, বাজার ও প্রকারভেদে কেজি প্রতি ১৫-২০ টাকা পর্যন্ত পার্থক্য রয়েছে। মাছের দামও তুলনামূলক বেশি।

তিনি বলেন, জনগণের ভোগান্তি রোধে পাইকারী ও খুচরা বাজারের আড়ৎসহ প্রত্যেক দোকানে পণ্যের মূল্য তালিকা টাঙিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক। একই সাথে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের রশিদপত্র সাথে রাখতে শেষবারের মত নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ নির্দেশ অমান্য করলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যবসায়ী ও আড়তদারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। নিত্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বাজার মনিটরিং কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানান শারমিন আক্তার।

ক্রেতা সাধারণের অভিযোগ, জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি রোধে জেলা প্রশাসনের বাজার মনিটরিং কমিটি অভিযান চালালেও জিনিসপত্রের মূল্য মোটেও কমেনি। ক্রমশ বাড়ছে। ঘোষনা দিয়ে তদারকি অভিযানে নামায় তদারক কমিটি জিনিসপত্রের প্রকৃতমূল্য সম্পর্কেও জানেননি।

নগরীর কাজীর দেউরি বাজারে হাজী মো. ইলিয়াস নামে এক ক্রেতা জানান, ২১ অক্টোবর জেলা প্রশাসনের বাজার তদারকি করার সময় কৌতুহলবশত আমিও ছিলাম। এ সময় বিক্রেতারা প্রতিটি জিনিসের মূল্য কেজি প্রতি অনেক কম বলেছে। ঘোষনা দিয়ে অভিযান চালানোর কারনে প্রকৃত বিক্রয় মূল্যও জানতে পারেননি তারা।

ফিরিঙ্গ বাজারে সাহাবুদ্দিন নামে এক ক্রেতা জানান, বাজার মনিটরিং কমিটি বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্যের ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্য জানলেও মুনাফার ব্যাপারে কোন তাগাদা দেননি। ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের সত্যতাও যাচাই করেনি। উল্টো বিক্রেতারা পরিবহন খরচ, দোকানভাড়াসহ নানা খরচ দেখিয়ে লাভের পরিমান সামান্য বলেই দেখান। এতে চুপ থাকেন কমিটি। ফলে তদারক অভিযানের কোন সুফল পায়নি ক্রেতারা। অভিযানের পরও কমেনি জিনিপত্রের দাম।

বাজার তদারকির পর দেশের দুটি জনপ্রীয় অনলাইন নিউজ পোর্টালে জিনিসপত্রের দাম কমার খবর প্রকাশ করা হয়। যা দেখে বিস্মিত হন ক্রেতাসাধারণ। এ নিয়ে বাজারে ক্রেতা সাধারণের মাঝে চলছে ব্যাপক গুঞ্জন ও ক্ষোভ। সাংবাদিকরাও প্রশাসনের দালাল হয়ে গেছে বলে গালি দিতেও শুনা গেছে ক্রেতা সাধারণের মুখে।

আজ রবিবার সকালে বাজার তদারকি সম্পন্ন হওয়া কয়েকটি বাজার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ৫০ টাকার কমে মৌসুমি কোন তরিতরকারি বিক্রী হচ্ছে না। বরং বাজার মনিটরিংয়ের আগের দিনের তুলনায় ৫ থেকে ১০ টাকা কোন কোন জিনিসের মূল্য কেজি প্রতি ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

বাজার মনিটরিংয়ের পর ফার্মের মুরগি কেজি প্রতি বেড়ে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা, কাঁকরোল ঢেঁড়শ, বেগুন, মুলা ও তিতকরলা ৫০ থেকে বেড়ে ৬০ টাকা, ঝিঙ্গা ৪০ থেকে ৫০, আলু ২৩ থেকে ২৪ টাকা, বরবটি ও পটল ৪০ থেকে ৫০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১০০ থেকে ১২০ টাকা, টমোটো ১০০ থেকে ১২০ টাকা, বাঁধাকপি ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে রসুন, আদা, গাজর, ধনেপাতা ও শসা। একইভাবে বাজারে প্রতি কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা বেড়ে ইরি চাল ৩৬ টাকা, সিদ্ধ পারী ৩৮, মিনিকেট ৪২ টাকা, দিনাজপুরী পাইজার ৪০ টাকা, দেশি বেতী ৩৮ টাকা, পারী আতপ ৪০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে।

জিনিসপত্রের মূল্য বাড়ার কথা স্বীকার নগরীর বিবিরহাট হাটহাজারী স্টোরের বিক্রেতা নজরুল ইসলাম বলেন, পাইকারী দোকানে যেমন দাম বাড়ছে তেমনি খুচরা দোকানেও বাড়ছে। তবে পাইকারি দোকানে টনের ওপর ১০০ টাকা বাড়লে খুচরা বাজারে কেজি হিসেবে তা ১০০০ টাকা বাড়ে বলে স্বীকার করেন ওই বিক্রেতা।

কয়েকজন বিক্রেতা আলাপকালে বলেন, রমজান মাসে অভিযানে জরিমানা করা হয়। এবার তো কোন জরিমানা করেনি। শুধুমাত্র মূল্য তালিকা, পণ্য বিক্রির রশিদ ব্যবহারের কথা বলেছেন। জরিমানা না করায় জিনিপত্রের দাম কমেনি বলেও মন্তব্য করেন বিক্রেতারা।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাব্বির রহমান সানি বলেন, চালের দাম বাড়ার কথা না। কিন্তু অজ্ঞাত কারনে বাড়ছে। সবজির দামও অনেক বেড়েছে। অভিযানে পণ্য বিক্রীর মূল্য তালিকা টাঙানো ও বিক্রীর রশিদ ব্যবহার সহ নিয়মকানুন মেনে চলার তাগাদা দেওয়া হয়েছে। তদারকি শেষে মনিটিরিং কমিটি বৈঠকে পণ্যমূল্য নির্ধারণের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. সামসুল আরেফিন বলেন, দ্রব্যমূল্য উর্ধ্বগতির কারনে জনমনে নাভিশ্বাস উঠেছে। ভোক্তা সাধারণের কথা চিন্তা করে তদারক অভিযান চালানো হচ্ছে। এ সময়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বর্তমানে ১৯ জন ম্যাজিস্ট্রেট ট্রেনিং এ আছেন। এরপরও যারা আছেন, তাদেরকে নিয়েই বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে। তদারকি শেষে বাজার মনিটরিং কমিটি ব্যবসায়ীদেরকে পণ্য বিক্রির লভ্যাংশ কত শতাংশ হবে তা ঠিক করে দেবে। এতে সুফল পাবে ক্রেতাসাধারণ।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত