টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

উজাড় হচ্ছে কক্সবাজারের বনাঞ্চল

ইমাম খাইর
কক্সবাজার ব্যুরো

cox-forestচট্টগ্রাম, ২০ অক্টোবর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস):: উজাড় হতে চলেছে সরকারী বন বিভাগের জায়গা। বনের জায়গা দখল করে নির্মিত হচ্ছে বসতবাড়ী-দোকানঘর। বনখেকোরা কেটে নিয়ে যাচ্ছে শতবর্ষী ‘মাদার ট্রি’। দিনি দিন ছোট হয়ে আসছে সামাজিক বনায়ন ভূমি। দখলদার চক্রের কব্জায় সরকারী উড লট ও আগর বাগান। স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় বিক্রি হচ্ছে বনাঞ্চলের পাহাড়ের মাটি। জব্দকৃত মালামাল বিক্রি করে ফেলছে বন রক্ষকরা। প্রভাবশালীরা বিভিন্ন ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে দখল করে রেখেছে কয়েকশ একর সরকারী জায়গা। প্লট বানিয়ে বিক্রি হচ্ছে বনের জায়গা। এমনকি, ধর্মীয় রীতির বাইরে গিয়ে বনের জায়গাতে বানানো হচ্ছে কবরস্থান-শ্বশান। এমন গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় কিছু অসাধু বনবিট কর্মকর্তা ও বন জায়গিরদারদের যোগসাজসে দখলযজ্ঞ চলছে। আর এসব দেখে-শুনেও ‘চুপচাপ’ সংশ্লিষ্টরা কর্মকর্তারা।

এসবকিছু শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হচ্ছে। সেই সিন্ডিকেটে জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, হেডম্যান, ভিলেজারের নামও রয়েছে। সংবাদের পরবর্তী কিস্তিতে সিন্ডিকেটের বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে।

তবে, এত্তসব অভিযোগ মানতে রাজি নন কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা কেরামত আলী মল্লিক। জানতে চাইলে তিনি রাগ ঝেড়ে বলেন, আপনারা শুধু বন বিভাগের দূষ খোঁজেন। আমরা তো দখল করছিনা। বনের জায়গা দখল করছে জনগণই। আবার অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে গিয়ে আমরা বাঁধাগ্রস্ত হই। প্রভাবশালীরা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বলেন, কোথায় কোথায় দখল হচ্ছে; কারা দখল করছে- সেগুলো নিয়ে লিখেন। আপনাদের লিখনি দিয়ে মানুষকে সচেতন করেন। তাহলেই সরকারী সম্পদ বাঁচবে।

coxকেরামত আলী মল্লিক জানিয়েছেন, কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগে ১৩ হাজার ৭৫৪.১২ একর জমি দখল হয়ে গেছে। দখলদারের বিরুদ্ধে বিচারাধীন মামলা সংখ্যা ৪৪৮৩ টি। তাদের মোট জমির পরিমাণ ৯১,৮৬৪.২১ একর। সেখান থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে আইনি প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর করা হয়েছে ১৬,৮৮৪ একর।

জানা গেছে, চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী রেঞ্জাধীন সেগুন বাগিচা বাগানিপাড়া এলাকায় ২০০৭/০৮ সালের উডলট ও ২০০৮/০৯ সালের আগর বাগানের ৩০ একর জায়গা দখল হয়ে গেছে।

খুঠাখালীর সেগুন বাগিচার গাছ কাটতে কাটতে এখন যেন ঢাকার সেগুন বাগিচা। বাগানের ফাঁকে ফাঁকে অবৈধ বসতি ছাড়া আর কিছুই নেই। ওঠানো হচ্ছে স্থায়ী দালান-কোটা। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি বসতি থেকে নেয়া হয়েছে ন্যুনতম ৪০/৫০ হাজার টাকা। মেধাকচ্ছপিয়া বনবিটেরও একই হাল।

ঠান্ডাছড়ি মধুশিয়া এলাকার শতবর্ষি গর্জন বাগান থেকে ইতিমধ্যে ২০০ এর অধিক ‘মাদার ট্রি’ কাটা হয়েছে। সংরক্ষিত বনেও ঢুকে পড়েছে মানুষ। নির্মিত হচ্ছে বসতঘর-স্থাপনা। গত কয়েক বছরে খুটাখালী বন বিটের আওতা থেকে অন্তত ৩০ হাজার গর্জন গাছ উজাড় হয়ে গেছে। এসব দখলের পেছনে স্থানীয় বিট কর্মকর্তার সম্পৃক্তা রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

ফুলছড়ি রেঞ্জের অফিসের ১০০ গজের মধ্যে বন বিভাগের জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে বসতঘর ও দোকানপাট। ফ্রি স্টাইলে দখলযজ্ঞ চললেও মাথা ব্যাথা নেই ‘বস’দের। স্থানীয় একটি সুত্রের দাবী, এখানে একটি বাড়ী করার জন্য বন বিভাগের এক কর্মকর্তাকে ১লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে।

ইসলামাবাদ-ইসলামপুর মধ্যবর্তী শাহ ফকির বাজারে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য দোকান ঘর। নির্মিত হচ্ছে বসতি। সেখানেও জড়িত রয়েছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।

নাপিতখালী বনবিটের অধীন ২০০৫/০৬ সালের ‘উডলট’ বাগানের কোন চিহ্ন বাকী নেই। সব গাছ বন খেকোরা সাবাড় করে ফেলেছে। একই সঙ্গে সামাজিক বনায়ন ও বনাঞ্চলের পাহাড়ও শেষ হয়ে যাচ্ছে। ৭/৮টি পাহাড় কেটে সমান করে ফেলা হয়েছে।

এসব দখলবাজদের সাথে ফুলছড়ি রেঞ্জ অফিসার কাজি মোকাম্মেল কবিরের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবী স্থানীয় বাসিন্দাদের। তাদের মতে, কাজি মোকাম্মেল যোগদানের দেড় বছরে বন বিভাগ সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দৃশ্যমান অভিযানে নামেননি তিনি। দখলবাজচক্রের সাথে তার গভীর সখ্যতা রয়েছে। এ সুযোগে বনের জায়গা বেহাত হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।

অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃতি ধ্বংস করা হলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের খবর নেই। পাহাড় কেটে সমতল করা হচ্ছে। পাহাড়ী সমতল জমি দখল করে দেদারছে বিক্রি করে যাচ্ছে একটি সিন্ডিকেট। সম্প্রতি সরকারী বনের জমি ও পাহাড় প্লট বানিয়ে চড়াদামে বিক্রি করার খবর এসেছে। মাঝে মধ্যে ‘লোক দেখানো’ অভিযানে নামে বন বিভাগ। পরে মোটা অংকে ম্যানেজ হয়ে যায় অভিযানকারীরা।

জুমনগর এলাকার এক মহিলা গত বছর স্থানীয় এক প্রভাবশালীর কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে ১৫ কড়া পাহাড়ী জমি ক্রয় করে ঘর নির্মাণ করেছে বলে জানান। অবশ্যই ওই প্রভাবশালীর নাম প্রকাশ করতে সাহস করেনি।

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সর্দার শরিফুল ইসলামের কাছে পাহাড় কাটার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, পাহাড় কাটার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বনকর্মকর্তারা নিরব ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরকে কোন ধরণের তথ্য প্রদান করে না। তাই সহজে অভিযানে যাওয়া যায় না। ফুলছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী মোকাম্মেল কবিরের বক্তব্য জানতে গিয়ে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও রিসিভ করেননি।

এদিকে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ইসলামপুর রেঞ্জের আওতাধীন বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় নাপিতখালী চাকার দোকান এলাকা থেকে পাচারকালে বিশালাকার গর্জন গাছের ৬টি টুকরো জব্দ করা হয়। একই প্রতিদিন দিন দুপুরে চান্দেরগাড়ী, ডাম্পার, ট্রাক নিয়ে মহাসড়ক হয়ে কাঠ পাচার হলেও সংশ্লিষ্ট বনকর্মকর্তারা রহস্যজনক ভ‚মিকা পালন করছেন। সংঘবদ্ধ গাছ খেকোরা সামাজিক বনায়নের গাছ কেটে সাবাড় করলেও ঘুম ভাঙ্গছেনা বনরক্ষকদের।

এদিকে চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী মেধাকচ্ছপিয়া ন্যাশনাল পার্কের শতবর্ষী ‘মাদার ট্রি’ কেটে সাবাড় করছে বনখেকোরা। বনখেকোদের পাশাপাশি স্থানীয় বন জায়গিরদারদের সখ্যতায় বননিধনযজ্ঞ অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে জাতীয় উদ্যানটি দিন দিন বৃক্ষশুন্য হয়ে পড়ছে।

চট্টগ্রাম-ককসবাজার মহাসড়ক সংলগ্ন খুটাখালী মৌজার মেধাকচ্ছপিয়া এলাকায় প্রায় ১ হাজার একর বন বিভাগের জমিতে ন্যাশনাল পার্ক বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় সরকার। গত ২০০৪ সালের এপ্রিল মাসে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এই বন ভ‚মিকে ন্যাশনাল পার্ক হিসাবে ঘোষণা করেন। কিন্তু সরকারের ন্যাশনাল পার্ক ঘোষণাটি শুধু সাইনবোর্ড লাগানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। একারণে পার্কের সীমানার প্রায় ৪শ একর বন ভ‚মি অবৈধ দখল দারদের দখলে চলে গেছে।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, শতবর্ষী গর্জন বাগান এবং ন্যাশনাল পার্ক (জাতীয় উদ্যান) পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই কাঠ পাচারকারীরা দিন দুপুরে গাছ কেটে সাবাড় করছে। এ গর্জন বাগানকে ন্যাশনাল পার্ক ঘোষণার কয়েক বছর অতিবাহিত হলেও বন দস্যূদের একের পর এক বেপরোয়া নিধন যজ্ঞে শতবর্শী গর্জন বাগান হারিয়ে যেতে বসেছে।

একটি সুত্র মতে, প্রায় ৫ শত কোটি টাকা মূল্যে ১০হাজারের ও অধিক মাদার ট্রি রক্ষার জন্য আর্ন্তজাতিক এনজিও সংস্থা অরন্য ফাউন্ডেশন এবং ককসবাজার উত্তর বন বিভাগ আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও বন ভক্ষক ও বন বিট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও হেডম্যানদের সহযোগিতায় একের পর এক মাদার ট্রি কাটা যাচ্ছে। এতে প্রাকৃতিক ঐতিহ্যবাহী গর্জন বাগানটি উজাড় হয়ে যাচ্ছে।

খুটাখালি থেকে অন্তত ৫ কিলোমিটার পূর্বে গেলে বিশাল বাগান। সারি সারি করে দাঁড়ানো ‘মা গর্জন’ গাছগুলো। গর্জন গাছের বংশ বিস্তারের জন্য ১৯৫২ এবং ১৯৯৩ সালে সৃজিত হয় এ বাগান। কিন্তু বর্তমানে বাগানের অবস্থা খুবই করুণ। দূর থেকে চোখে পড়া ‘মা গর্জন’র বাগানে ঢুকলে দেখা যাবে ‘প্রকৃত চিত্র’। সহ¯্রাধিক ‘মা গর্জন’ গাছ নির্মমভাবে কেটে ফেলা হয়েছে। পড়ে আছে গাছের গোড়ালিগুলো। ইউনিয়নের হরিখোলা, ঘেছখোলা, খেলির বিল, গুল ডেবা, মুধর শিয়া ও গয়ালমারায় ‘মা গর্জন’ বাগানের এ দশা। বাগানের এ পরিস্থিতি পেছনে স্থানীয়রা এক ‘ভিলেজার ও সংঘবদ্ধ গাছ চোর সিন্ডিকেট’কে দায়ী করেছেন।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পড়ে থাকা গাছের ‘গোড়ালি’ দেখে বুঝা যাবে-হয়তো ঘন্টা খানেক পূর্বেই কাটা হলো গাছ গুলো। বাগানের ভেতরে যতো ঢুকা হয় ততোই চোখে পড়ে গাছের ‘কাটা চিহ্ন’। এক জায়গা থেকে এক সাথে ১০ টি গাছও কেটে ফেলা হয়েছে। আবার অনেক স্থানে গাছের চিহ্নও নেই।

স্থানীয় বন জায়গিরদাররা জানান, একটি পরিচিত কাঠচোর সিন্ডিকেট ন্যাশনাল পার্কের শতবর্ষী গর্জন গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এতে ব্যবহার করছে লোকাল শ্রমিক, বার্মাইয়া নারী ও শিশুদের। প্রতিদিন ভোর ও সন্ধ্যায় এসব বার্মাইয়াদের দিয়ে গাছের গোড়া চেছে ফেলে চালায় নিধনযজ্ঞ। বিট কর্মকর্তার অবহেলার কারণে ন্যানশাল পার্কের বৃক্ষরাজী লুটপাট হচ্ছে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত