টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামে ‘অ্যাম্বুলেন্স সেবায়’ চলছে চরম নৈরাজ্য!

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস

ambuচট্টগ্রাম, ২০ অক্টোবর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস):: চট্টগ্রাম নগর জুড়ে অ্যাম্বুলেন্স সেবায় চলছে চরম নৈরাজ্য। সরকারি খাতে যেমন রয়েছে নানা অনিয়ম তেমনি বেসরকারি খাতেও চলছে জমজমাট অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা।

সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্স উল্টে হতাহতের ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্স সেবার বিষয়টি সচেতন মহলের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। যদিও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কারও এ ব্যাপারে এখনো টনক নড়েনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করার আগে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনের (বিআরটিসি) অনুমোদন লাগে। একইভাবে বেসরকারি খাতেও বিআরটিসির অনুমোদন ছাড়া অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালুর কোন নিয়ম নেই। এক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম থাকলেও তা অনুসরণ করছে না বিআরটিসি।

সরকারি বিধি অনুযায়ী, অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসে রোগী ও চিকিৎসকের জন্য স্পেশাল সিট থাকতে হবে। জরুরী প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য সচল অক্সিজেন সিলিন্ডার ও প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জামের টুল বক্স থাকতে হবে। রোগীর অন্তত একজন স্বজন বসার ব্যবস্থা থাকতে হবে। তাছাড়া ওই অ্যাম্বুলেন্সের ফিটনেস সার্টিফিকেট নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর এসব নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করেই চট্টগ্রামে চলছে সিংহভাগ অ্যাম্বুলেন্স।

এ ব্যাপারে বিআরটিসি চট্টগ্রাম অঞ্চলের ম্যানেজার (অপারেশন) মোস্তাফিজুর রহমান সিটিজি টাইমসকে বলেন, যে কোন যানবাহনের মতো অ্যাম্বুলেন্সের ফিটনেস সার্টিফিকেট দেখে সার্ভিস চালুর অনুমতি দেয় বিআরটিসি। এক্ষত্রে ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয় চুয়েটের মেকানিক্যাল বিভাগ। সরকারি হাসপাতাল হোক আর বেসরকারি হাসপাতাল হোক প্রতিষ্ঠানের নামেই অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস অনুমোদন দেয় বিআরটিসি।

প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনিয়ম বা কারচুপি সংক্রান্ত যে কোন বিষয় তদারকি করার দায়িত্বে সড়কে তৎপর রয়েছে পুলিশ। পুলিশ প্রশাসন সঠিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই অ্যাম্বুলেন্স কেন কোন খাতেই নৈরাজ্য চলতে পারে না।

চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারি কমিশনার মো. কামরুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, নগরে শুধু সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠানের নামে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চলে না। ব্যক্তির নামেও অ্যাম্বুলেন্স চলে। যা ব্যক্তির নামেই অনুমোদন দিয়েছে বিআরটিসি। এতে পুলিশ প্রশাসনের কি করার আছে?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতালসহ ১৫ উপজেলার সবকটি সরকারি হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস রয়েছে। কিন্তু এসব অ্যাম্বুলেন্স চলাচলে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও তা অনুসরণ করেন না চালকরা।

কোন কোন চালক তার নিজের ইচ্ছেমত অতিরিক্ত ভাড়া নেন মুমুর্ষ রোগীদের কাছ থেকে। হেরফের হলে নানা অজুুহাতে বন্ধ রাখা হয় অ্যাম্বুলেন্স। যানবাহন সম্পর্কে অনভিজ্ঞ হাসাপাতালগুলোর স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও চিকিৎসকরা এ ব্যাপারে কোন সদুত্তর দিতে পারেন না। চালকদের নৈরাজ্যের কথা বুঝতে পেরে কিছু বললেও যান্ত্রীক ত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে মেরামতের জন্য উল্টো বিল দাবি করেন।

আবার রেফারকরা হাসপাতালে রোগী নিয়ে গেলেও ফেরার পথে রিজার্ভ বা লোকেল প্যাসেঞ্জার তুলে ভাড়া মারেন। এমনকি সংরক্ষিত বনের কাঠ, মদ, ইয়াবাসহ নানা অবৈধ পণ্য পাচার করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে চালকদের বিরুদ্ধে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎিসক আবু হাসান বলেন, অ্যাম্বুলেন্সের ক্ষেত্রে চালকের হাতে জিম্মী চিকিৎসক ও রোগীরা। নানা অনিয়ম ও নৈরাজ্যের কারনে কোন চালকের বিরুদ্ধে তাৎক্ষনিক কোন ব্যবস্থাও নেওয়া যায় না। একটু চাপ দিলেই ব্যস, অ্যাম্বুলেন্স আর চলে না। অ্যাম্বুলেন্স তো আর সকলে চালাতে পারে না। চালক যা বলে তাই।

প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চালকের ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তাদের কিছু বললেও কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। সর্বোচ্চ বদলি করা হয়। এরপর দেখা যায় আর চালকই পাওয়া যায় না। অ্যাম্বুলেন্স পড়ে থাকে গ্যারেজে। চালক দিলেও সবার একই অবস্থা। সুরাহা মেলে না।

অ্যাম্বুলেন্স সেবায় নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির কথা স্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকীও। তিনি বলেন, চালক সঙ্কটের কারনে সরকারি খাতে আর আইনি দূর্বলতার সুযোগে বেসরকারি খাতে অ্যাম্বুলেন্স সেবার নামে চলছে বাণিজ্য ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক নাসির উদ্দিন সিটিজি টাইমসকে বলেন, সরকারি চাকুরি করে আমরা যে সার্ভিস দেয়; বেসরকারি খাতে তা কখনও পাওয়া যাবে না। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তিন-চারগুণ ভাড়া দিয়েও অ্যাম্বুলেন্স সেবা সরকারি এম্বুলেন্সের মতো পাওয়া যায় না। বেসরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়গুলো ভাবলে আমাদের দোষ কিছুই না।

উপজেলা পর্যায়ের এক অ্যাম্বুলেন্স চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে না হয় ২০০-৩০০ টাকা বেশি ভাড়া নেয় চালকরা। খালি ফেরার সময় না হয় ২০০-৩০০ টাকার ভাড়া মারে। তাও সবসময় না। তবে কাঠ পাচার, মদ পাচার, ইয়াবা পাচারের কোন কোন চালক জড়িত থাকলেও তিনি জড়িত নন বলেন দাবি করেন।

বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকের চেয়ে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকের বেতন ও সুবিধাদি অনেক বেশি, তা সত্তে¡ও কেন বাড়তি আয়ের জন্য অনিয়ম করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাসপাতালের বড় কর্তারা কি করে দেখেন আমাদের মত ছোট কর্মচারীদের দিখে চোখ দেন শুধু।

অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে নানা সময়ে দুর্ভোগ পাওয়া নগরীর কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, অ্যাম্বুলেন্সে রোগীর জন্য যেসব সুযোগ সুবিধা থাকার কথা তার বিন্দুমাত্রও নেই। সরকারি বেসরকারি কোন এম্বুলেন্সে নেই রোগী ও চিকিৎসক বসার জন্য স্পেশাল সিট, সচল অক্সিজেন সিলিন্ডার ও প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। সাধারণ মাইক্রোবাসের মতো যাত্রী বসার সিট ছাড়া আর কিছুই নেই।

এ বিষয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম মহানগরীর একাধিক অ্যাম্বুলেন্স চালকদের সাথে। তাতে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। চট্টগ্রাম বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতালের চালক আনিসুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকারি হাসপাতাল ও কয়েকটি উচু মানের বেসরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস ছাড়া অধিকাংশ অ্যাম্বুলেন্স তৈরী করা হয়েছে মাইক্রোবাস কেটে। যার ফলে এসব অ্যাম্বুলেন্সে রোগীর প্রয়োজনীয় সুবিধাজনক কোন কিছুই নেই। আছে শুধু যাত্রী বসার সিট। রোগী নেওয়ার সময় সিট টেনে হাসপাতালের ট্রলিসহ এসব মাইক্রোবাসে ঢুকিয়ে নেয়া হয়। রোগী না থাকলে সিট বসিয়ে দিয়ে যাত্রী আনা-নেওয়া করা হয়।

তিনি বলেন, অ্যাম্বুলেন্স দেখলে সাধারণ যে কোন যানজট থেকে সহজে ছাড়া পাওয়া যায়। হরতাল অবরোধেও নির্বিঘ্নে চালানো যায়। এ সময় সুস্থ লোককে রোগী সাজিয়ে ভাড়া টানা যায়। পুলিশসহ প্রশাসনের কেউ অ্যাম্বুলেন্সের দিকে চোখ দেয় না।

এ সুবাধে বেসরকারি হাসপাতালের এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন অনেক এম্বুলেন্স সংরক্ষিত বনের কাঠ, মদ, ইয়াবাসহ নানা অবৈধ সামগ্রী পাচার করে মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করছে। এসব অ্যাম্বুলেন্সের গায়ে ‘অ্যাম্বুলেন্স’ লেখা থাকলেও আসলে বৈধ কোন কাগজপত্র নেই। তবে কিছু অ্যাম্বুলেন্সের ‘বিআরটিসি‘র’ অনুমোদন রয়েছে। যা রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাবে এবং মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অনুমোদন দিয়েছে বিআরটিসি। এ রকম শতাধিক অ্যাম্বুলেন্স নগরীতে চলাচল করছে বলে জানান চালকরা।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত