টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

যৌতুক কেড়ে নিলো মিরসরাইয়ের রিমাকে

একের পর এক যৌতুকের চাহিদা মেটাতে নিঃস্ব হয়েও বাঁচানো গেলো না অন্তঃস্বত্ত্বা রিমাকে

এম মাঈন উদ্দিন 
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি 

mirsarai-rimaচট্টগ্রাম, ১৮ অক্টোবর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস): অসহায় দরিদ্র কৃষক মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেনের একমাত্র মেয়ে রিমা। ভালোবেসে পালিয়ে বিয়ে করে নোমান নামের এক য্কুবকে। প্রথমে বিয়ে মিনে নিতে না চাইলেও একমাত্র মেয়ে হওয়ার কারণে বিয়ে মেনে নিলেন জাহাঙ্গীর হোসেন। আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়েকে তুলে দিতে চাইলেন শশুর বাড়ি। কিন্তু মেয়ের জামাই, শশুর-শাশুড়ি যৌতুক ছাড়া বউ ঘরে তুলতে রাজি নেই। তার ধার-দেনা করে মেয়েকে শশুর বাড়িতে তুলে দিলেন। বিধিবাম বেশিদিন শশুর বাড়িতে থাকতে পারেনি রিমা। চলে গেছেন অনেক দুরে..যেখান থেকে কেউ আর ফিরে আসেনা। সলিল সমাধি হল তার ভালোবাসার।

জানা গেছে, মোবাইলে অপরিচিত একটি নাম্বারে ফোনালাপের পর পরিচয় হয় মিরসরাইয়ের মেয়ে শারমিনা আক্তার রিমার (১৯) সাথে পাশ্ববর্তী ফেনী জেলার আব্দুল্লাহ আল নোমানের (২২)। পরিচয় থেকে একে অপরের মাঝে ভালোবাসার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। এরপর বিয়ে অতঃপর হত্যার মাধ্যমে সমাপ্তি। রিমা উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের উত্তর ওয়াহেদপুর গ্রামের ছাবেদ আলী মোল্লাবাড়ীর জাহাঙ্গীর হোসেনের একমাত্র মেয়ে। নোমান ফেনী পৌর সদরের কেএম হাট এলাকার সুলতানপুর গ্রামের মো: হানিফের ছেলে। দীর্ঘ দুই বছর প্রেমের সম্পর্ক শেষে চলতি বছরের ১১ মার্চ পরিবারের কাউকে না জানিয়ে ঢাকায় গিয়ে কোর্ট ম্যারেজ করে দু’জন। মেয়ে পক্ষ তাদের সম্পর্ক মেনে নিলেও ছেলে পক্ষ বিয়ে মেনে নেওয়ার জন্য নগদ এক লাখ টাকা, দেড় ভরি স্বর্ণালঙ্কার, ৫০ হাজার টাকার ফার্নিচার, ২’শ জন বরযাত্রীর ভূরীভোজ খাওয়ানো দাবী করে। পরবর্তীতে মেয়ে পক্ষ ধার দেনা করে ছেলে পক্ষের চাহিদা মিটিয়ে সামাজিকভাবে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে। বিয়ের পরবর্তীতে পুনরায় ৫ লাখ টাকা যৌতুকের জন্য রিমাকে নির্যাতন শুরু করে স্বামী আর শশুর-শাশুড়ী। গত ২৬ সেপ্টেম্বর রিমাকে হত্যার মধ্য দিয়ে সমাধি হয় রিমার ভালোবাসার গল্প।

রিমার বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বিয়ের ১০-১৫ দিন পর স্বামী নোমান এবং তার মা-বাবা পুনরায় ৫ লাখ টাকা যৌতুক দাবী করে রিমার পরিবারের কাছে। দ্রæত সময়ের মধ্যে বাবার বাড়ী থেকে টাকা আনার জন্য রিমার উপর শারিরীক ও মানসিক ভাবে শুরু হয় নির্যাতন। সর্বশেষ রিমা বাবার বাড়িতে স্বামীকে নিয়ে বেড়াতে আসে। ৩-৪ দিন বেড়ানোর পর গত ২৬ সেপ্টেম্বর স্বামী নোমান তার হাত খরচের জন্য রিমাকে তার বাবা-মা থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে দেওয়ার জন্য বলে। রিমা মা-বাবা কে টাকার বিষয়টি বলার পর সুদের উপর ৫ হাজার টাকা জোগাড় করে নিয়ে আসে তার বড় ভাই রেজাউল করিম। বাবার বাড়ীতে আসার পর রিমা মাকে বলে সে চার মাসের অন্ত:সত্ত¡া। স্বামীর কাছে টাকা নেই বলে ডাক্তার দেখাতে পারছেনা। তাই মা মেয়ের চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত ৩ হাজার টাকা দেয়। টাকা দেওয়ার পর একই দিন বিকালে রিমাকে নিয়ে স্বামী নোমান তার নিজ বাড়ী ফেনী সদরের সুলতানপুর গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। এসময় চাহিদামত ৩০ হাজার টাকা না দেওয়ায় পথিমধ্যে রিমাকে তার স্বামী চড়-থাপ্পড় দেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। ২৬ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৭টার সময় ঠিকভাবে বাড়িতে গেছে কিনা, মেয়েকে ডাক্তার দেখিয়েছে কিনা তা জানার জন্য মেয়ের জামাইয়ের মোবাইলে কল দেন রিমার মা। মেয়ের জামাই নোমান কল রিসিভ করার পর বলেন তারা বাড়িতে পৌঁচছে ডাক্তার পরে দেখাবে এ কথা বলে সংযোগ বিছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে রাত সাড়ে আটটার দিকে নোমান শাশুড়ির মোবাইলে কল দিয়ে বলেন রিমা অনেকক্ষণ অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলো কিছুক্ষণ আগে মারা গেছে আপনারা দ্রুত আসেন। এটি শুনার পর রিমার বাবা, মা, ভাই ও এলাকার ইউপি সদস্য রিমার শশুর বাড়িতে যান। সেখানে যাওয়ার পর রিমার লাশ রাখা কক্ষে কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। সবাইকে জিম্মী করে রাখা হয়েছে। অনেক আকুতি-মিনতি করেও মেয়ের লাশ দেখতে পারেনি রিমার হতভাগ্য বাবা-মা। পরে লাশের কোন ধরনের সুরতহাল করার আগেই গোসল দেয়া হয়েছে। তারা রিমাকে বাড়িতে এনে দেখেন তার গলায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চি‎হ্ন দেখা যাচ্ছে। রিমার নাক এবং মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। বাবার বাড়িতে জানাযা শেষে দাফন করা হয়েছে। তার জানাযা-দাফনে স্বামী-শশুর কেউ উপস্থিত হয়নি। তার স্বামী পক্ষ থানায় মামলা না করার জন্য হুমকি দেয়।

এলাকার বাসিন্দা কামরুজ্জামান সাইফুল,মনিরুল ইসলাম তুহিন,ফারভেজ সাহিন নিলয় বলেন, রিমার পরিবার খুবই নিরীহ। তারপরও মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে যৌতুক দিয়েছে। কিন্তু তারপরও তার ঘাতক স্বামীর কবল থেকে শেষ রক্ষা হলোনা। আমার তার স্বামীসহ যারা এই হত্যাকান্ডে জড়িত সবার বিচার চাই।

এদিকে গত ২৯ সেপ্টেম্বর রিমাকে হত্যা করার অভিযোগে ফেনী জজ আদালতের অধিনে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট ও আমলি আদালতে রিমার পিতা মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন বাদী হয়ে স্বামী আবদুল্লাহ আল নোমান, শশুর মোহাম্মদ হানিফ ও শাশুড়ি দেলোয়ারা বেগমকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা (নং ১৫৫/২০১৬) দায়ের করেন।

রিমার বড় ভাই রেজাউল করিম বলেন, রিমা আমার একমাত্র বোন। বোনের সুখের কথা চিন্তা করে ছেলে পক্ষের চাহিদা পূরণ করার জন্য ৮ লাখ টাকা ঋণ নিই। যা এখনো পরিশোধ করতে পারিনি। কিন্তু বিয়ের পর তারা পুনরায় ৫ লাখ টাকা যৌতুক দাবী করে। টাকা দিতে পারিনি বলে তারা আমার বোনটিকে নির্যাতন করতে করতে মেরে ফেলেছে। তিনি বোন হত্যার বিচার দাবী করে বলেন, এমন নরপশুদের মত্যুদন্ডের মধ্য দিয়ে আমার বোনের আত্মা শান্তি পাবে।

এবিষয়ে ওয়াহেদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফিরোজ কবির বলেন, রিমা মারা যাওয়ার খবর শুনে আমি বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য ফরহাদনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন টিপুর ব্যক্তিগত মোবাইলে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। এখন হত্যাকান্ডের ঘটনায় আদালতে মামলা দায়ের হয়েছে। আমি আশা করবো মামলার সঠিক তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়।

বাদি পক্ষের আইনজীবি এডভোকেট এস এম আনোয়ারুল করিম ফারুক বলেন, গত ২৯ সেপ্টেম্বর আদালতে মামলা দায়ের করার পর বিজ্ঞ আদালত তদন্তের জন্য ফেনী সদর থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। মামলার তদন্ত করে দ্রুত রিপোর্ট প্রদান করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে। আমি আশা করছি সঠিকভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত অপরাধীরা রেহাই পাবেনা।

এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ফেনী সদরের বোগদাদিয়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপ-পরিদর্শক (এস আই) জহিরুল হক বলেন, বাদী ও বিবাদী পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহন করা হয়েছে। আরো বিস্তারিত তদন্ত করে রিপোর্ট প্রেরণ করা হবে।

মতামত