টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বিএনপির হোমওয়ার্ক শুরু

চট্টগ্রাম, ১৭ অক্টোবর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস):: ঘরোয়া রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি। তাদের কার্যক্রম হলো দু-একটি সভা, সেমিনার আর সংবাদ সম্মেলন। বর্তমানে দাবি আদায়ের আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে নেই কোনো নেতাকর্মী।

আন্দোলন তো দূরের কথা দলের পুনর্গঠনসহ ভবিষ্যত কর্মপন্থা নির্ধারণ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন দলের সিনিয়র নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। রাজনীতির মাঠে ঘুরে দাঁড়াতে আগামী নির্বাচনকালীন রোডম্যাপ তৈরির পরিকল্পনা করছে দলটি।

নির্বাচন কমিশনের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) উল্লেখ আছে, কোনো রাজনৈতিক দল পর পর দু’টি নির্বাচনে অংশ না নিলে নির্বাচন কমিশন থেকে তাদের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। ফলে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলে নির্বাচন কমিশন থেকে তাদের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। নিবন্ধন বাতিল হলে বিএনপি আর রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচিত হবে না। তখন দল শুধুমাত্র একটি সংগঠনে পরিণত হবে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী হয়তো আগাম নির্বাচনের চিন্তা-ভাবনা করছেন। তিনি গত ২৬ জুলাই আ.লীগের সংসদীয় দলের সভায় দলীয় এমপিদের প্রতি আগামী সংসদ নির্বাচনের জন্য কাজ শুরু করতে নির্দেশ দেন। যদি ২০১৭-তে অথবা ২০১৮-এর শুরুতে নির্বাচন এসে যায়, বিএনপি তখন কী করবে?

দলের এমন পরিণতি দেখতে চান না কোনো নেতাকর্মীরাই। ফলে এই মুহূর্তে বিএনপির লক্ষ্য সংসদে যাওয়া। তারই ধারাবাহিকতায় গত ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ খুঁজে বের করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হোমওয়ার্ক শুরু করেছে দলটি।

বিএনপির বিভিন্ন নেতাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, যে কোনো মূল্যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায় বিএনপি। তাই দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অতীত ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে আগামী নির্বাচনের জন্য একটি রোডম্যাপ নির্ধারণে বেশকয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে প্রতিবেদন তৈরি করার দায়িত্ব দিয়েছেন। আর সে জন্যই আগে থেকেই নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে দলটি।

প্রসঙ্গত, ২০০৬ সালের অক্টোবরে ক্ষমতা হারানোর পর টানা দুই বছর সংসদের বাইরে থাকে বিএনপি। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিরোধী দল হিসেবে সংসদে যাওয়ার সুযোগ পায় তারা। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করে আবার সংসদের বাইরে চলে যায় বিএনপি। তারপর প্রায় ৩ বছর কেটে গেলেও বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম করেও সরকারকে চাপে ফেলে মধ্যবর্তী নির্বাচন আদায়ের আন্দোলনে সফলতার মূখ দেখেনি দলটি।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আলোকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচনে গেলে ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারই ক্ষীণ। তবে সন্তোষজনক আসন নিয়ে প্রধান বিরোধীদল হতে পারবে বিএনপি। বিষয়টি বিবেচনা করেই দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলের সকল নেতাকর্মীদের কৌশলী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সর্তক থাকতে বলেছেন। এমনটাই জানা গেছে বেশিরভাগ নেতাকর্মীদের কাছ থেকে।

সূত্রে জানা গেছে, দলের ক্রান্তিকালে বিএনপি তাদের মূল দাবি নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয় থেকে চুল পরিমাণও সরে আসেনি, বরং নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে চায় তারা। সে জন্যেই দেশে-বিদেশে জনমত গঠনে অগ্রসর হচ্ছে তারা। উদ্দেশ্য থাকবে, প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসনে জিতে সরকার গঠন করা। না হলে আপাতত সংসদে যাওয়া।

বিএনপি সঠিক পথেই হাটছে মন্তব্য করে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, অন্য কোনো দেশের রাষ্ট্রপতিরা এদেশে আসলে সরকার প্রধান, রাষ্ট্রপতি, বিরোধীদলের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। সেই বিরোধীদল, যারা পার্লামেন্টে আছে তাদের সাথে সাক্ষাত হয়না। কিন্তু বিএনপি পার্লামেন্টে না থাকলেও যারাই এদেশে আসেন, তারাই বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন।

সম্প্রতি চীনের রাষ্ট্রপতি পরিষ্কারভাবে এই মেসেজ দিয়ে গেলেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

খন্দকার মোশাররফ বলেন, ‘যেহেতু বাংলাদেশের নির্বাচিত পার্লামেন্ট নয়, দেশে প্রকৃত জনগণের প্রতিনিধি বা বিরোধীদল নেই। তাই বিরোধীদলকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে জনগণের ১৬ কোটি মানুষের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। এতে আমরা বিশ্বাস করি চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটা বার্তা ও ইশারা দিয়ে গেছেন।’

পুনর্গঠনের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে বিএনপি ১৯ মার্চ তাদের দলীয় কাউন্সিল সম্পন্ন করে। কিন্তু কাউন্সিল পরবর্তী সময়ে বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে যে উদ্দীপনা দেখা গিয়েছিল তাও ধীরে ধীরে কমে যায়। নতুন কমিটি ঘোষণার পর যেখানে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর কথা, সেখানে দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের উদ্দীপনা ধীরে ধীরে হতাশায় রূপ নেয়। শুধু বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি নয়, অঙ্গ সংগঠনগুলোর অবস্থাও একই রকম।

এছাড়া কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হলেও বিএনপিতে বিষয়ভিত্তিক উপ-কমিটি গুলো গঠনের উদ্যোগ এখনো শুরুই হয়নি। এমনকি এক নেতার এক পদের বিধানও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ডজন খানেক নেতা এক পদ ছাড়লেও দলের নীতি নির্ধারণ পর্যায়ের অনেকেই এখনো একাধিক পদ আঁকড়ে আছেন।

বিএনপি নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, শুধু অঙ্গসংগঠন নয়, রয়েছে জেলা ও উপজেলা কমিটি গঠন নিয়েও জটিলতা। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কমিটি গঠনের দেখভালের দায়িত্ব মহাসচিবের হলেও সেই দায়িত্বে নেই তিনি। তার সাংগঠনিক দায়িত্বে আছেন ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানের ওপর। এ নিয়েও দলের মধ্যে অনেক মতবিরোধ রয়েছে এবং দিনে দিনে চরম আকার ধারণ করতে যাচ্ছে।

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দুই ধারার নেতারা নিজেদের মতামতকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে দলকে বিপদে ফেলছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিএনপির নীতিনির্ধারণী কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। নীতিনির্ধারকদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে। এ কারণেই যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যু নিয়ে বিএনপি কার্যত কোনো স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারেনি। জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় দলের করণীয় নির্ধারণ করতে পারেনি। এর ফলে দলের শক্তি সঞ্চয়ের পরিবর্তে দিন দিন তা ক্ষয়ের দিকে যাচ্ছে।

মতামত