টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রাম থেকে ১২ লাখ দ্বীপবাসীর যাতায়াতে দুটি জাহাজ

এস এম ইব্রাহিম
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস

biwtcচট্টগ্রাম, ১৬ অক্টোবর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস):: বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম থেকে নৌ-পথে সন্দ্বীপ ও হাতিয়া অঞ্চলের ১২ লাখ দ্বীপবাসীর যাতায়াতের একমাত্র ভরসা এমভি আবদুল মতিন ও এমভি মনিরুল হক নামে দুটি জাহাজ। সপ্তাহে মাত্র তিন দিন চলে জাহাজ দুটি।

তাও আবার ধারণক্ষমতার ৫ গুণেরও বেশি যাত্রী ও তিনগুণেরও বেশি মালামাল পরিবহন করা হয় জাহাজ দুটিতে। ফলে প্রায় দূর্ঘটনায় পতিত হয়। যান্ত্রিক ত্রুটিতে বিকল হয়ে সাগরের মাঝখানে যাত্রীদের পোহাতে হয় ভোগান্তি।

সূত্র জানায়, এমভি আবদুল মতিন ও এমভি মনিরুল হক সপ্তাহের শনি, সোম ও বুধবার চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ ও হাতিয়া নৌ-পথে যাত্রী নিয়ে চলাচল করে। তবে সপ্তাহের প্রতিদিন যাতায়াত করে মাছ ধরার ট্রলার ও অনুমোদনহীন ইঞ্জিন বোট। তাতেও মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে ১০ গুণেরও বেশি যাত্রী পরিবহণ করা হয়।

ফলে হরহামেশা ডুবে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরছে এতদঞ্চলের মানুষ। যাদের অধিকাংশেরই খবর প্রকাশ পায় না। বড় দূর্ঘটনা হলেই জানাজানি হয় শুধু। নেতিবাচক প্রভাবের ভয়ে এসব দূর্ঘটনার হিসাবও রাখে না বাংলাদেশ আভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহণ করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) কর্তৃপক্ষ বা যাত্রী পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম নৌ-পথের সবচেয়ে বড় স্টেশন সদরঘাটে এ বিষয়ে আলাপকালে সন্দ্বীপ ও হাতিয়ার দ্বীপাঞ্চলের ভুক্তভোগী মানুষের কাছ থেকে বেরিয়ে আসে এসব তথ্য। আর এ ব্যাপারে জানতে চাইলেও কোন রকম তথ্য দিতে নারাজ বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা। কতিপয় তথ্যের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেও তা জানেন না বলে জানান নৌ-পরিবহণ খাতের এই নিয়ন্ত্রণ সংস্থার দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা।

অবশ্যই এর পেছনে বিআইডব্লিটিসির কর্মকর্তাদের সীমাহীন দূর্নীতির কথাও জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। বলেন, চট্টগ্রাম থেকে যাতায়াতে নতুন জাহাজ না বাড়ানো এবং সপ্তাহের প্রতিদিন জাহাজ চলাচল না করানোই নানা দুর্ভোগ ও প্রাণহানীর জন্য দায়ী।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জাহাজ না বাড়ানো ও প্রতিদিন জাহাজ চলাচল না করার পেছনে হাত রয়েছে মাছ ধরার ট্রলার চালক ও মালিকদের। মাছ ধরার ট্রলারের মালিকরা এ জন্য বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তাদের মোটা অংকের অর্থ ঘুষ দিয়ে থাকেন।

এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে বিআইডব্লিউটিসির চট্টগ্রাম সদরঘাট স্টেশনের ম্যানেজার (বাণিজ্য) নাসির উদ্দিন মোহাম্মদ চৌধুরী ঘুষ নেওয়ার কথা অস্বীকার করে সিটিজি টাইমসকে বলেন, নতুন জাহাজ তো দূরের কথা চট্টগ্রাম নৌ-পথে কয়েক বছর ধরে এমভি আবদুল মতিন ও এমভি মনিরুল হকও চলছে ধুঁকে ধুঁকে।

তিনি জানান, ২০০৮ সালের আগে চট্টগ্রাম নৌ-পথে সন্দ্বীপ ও হাতিয়া দ্বীপবাসীর যাতায়াতে পাঁচটি জাহাজ চলাচল করত। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে ২০১১ সালের জুন থেকে বন্ধ রয়েছে এমভি বার আউলিয়া। এমভি আলাউদ্দিন বন্ধ রয়েছে ২০০৯ সালের এপ্রিল থেকে। এরপর গত এক যুগে চট্টগ্রাম নৌ-পথে চলাচলের জন্য নতুন কোনো জাহাজ কেনা হয়নি।

প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের বরাবরে এ ব্যাপারে একাধিক প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ না নিলে এ সমস্যার সুরাহা করবেন কে?। কোন সমস্যা হলেই শুধু কর্মকর্তাদের দোষ দেয়া ট্রেডিশনে পরিণত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাহাজ সংকটের কারণে মাছ ধরার ট্রলারে করে মানুষ যাতায়াত করছে। এতে লাভবান হচ্ছে ট্রলারগুলো।

তিনি আরও বলেন, যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে এমভি আবদুল মতিন ও এমভি মনিরুল হকের যেমন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। তেমনি মাছ ধরার ট্রলার ও অননুমোদিত ইঞ্জিন বোটে যাতায়াতে সন্দ্বীপ ও হাতিয়া অঞ্চলের ১২ লাখ মানুষের জীবন হুমকির মুখে রয়েছে।

যাতায়াতে এসব মানুষের নানা দুর্ভোগের পাশাপাশি নৌকাডুবি, ট্রলার ও জাহাজডুবির ঘটনায় প্রাণহানীর ঘটনা ঘটার কথা স্বীকার করলেও তিনি গত এক মাসে বা ৬ মাসে এমনকি এক বছরে কত প্রাণহানী ঘটেছে এ ব্যাপারে কোন কথা বলতে তিনি নারাজ।

তবে নাম এবং পদবি প্রকাশ না করার শর্তে বিআইডব্লিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, গত ৫ বছরে শুধুমাত্র জাহাজডুবির ঘটনায় ৭০০ লোকের প্রাণহানী ঘটেছে। নৌকা ও ট্রলার ডুবিতে প্রাণহানীর নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে এই সংখ্যা আরও তিনগুণ বলে জানান তিনি।

বিআইডব্লিইটসির চট্টগ্রাম কার্যালয় সূত্র জানায়, সপ্তাহের প্রতি শনিবার, সোমবার ও বুধবার চট্টগ্রাম সদরঘাট থেকে সকাল ৯ টায় যাত্রী নিয়ে স›দ্বীপ ও হাতিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় এমভি আবদুল মতিন ও এমভি মনিরুল। আসনের দ্বিগুণ বেশি জাহাজ দুটিতে নিয়ে গেলেও অনেক যাত্রী বাড়ি ফিরতে পারে না। নিরুপায় হয়ে মাছ ধরার ট্রলারে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীরা বাড়ি ফিরে। এতে প্রতিনিয়ত কোন না কোন ট্রলার সাগরের মাঝপথে গিয়ে দূর্ঘটনায় পড়ে। কিছু কিছু দূর্ঘটনার খবর প্রকাশ হলেও অনেকে লাশ হয়ে ঘরে ফেরার বা সাগরে তলিয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশ হয় না।

গত ৩ জুলাই হাতিয়া উপজেলার বয়ারচরের কাছে মেঘনা নদীতে ট্রলার ডুবিতে তিনজনের প্রাণহানী ঘটলেও তা তেমন প্রকাশ পায়নি। এর আগে জাহাজ ডুবিতে ৫ জন নিহতের খবর প্রকাশ হয়। স›দ্বীপ যাতায়াতের সময়ও গত সেপ্টেম্বর মাসে দুটি ট্রলার ডুবির ঘটনায় তিনজন নিহত হয় বলে সূত্র জানান। এভাবে চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১১টি নৌকা, ট্রলার ও জাহাজ ডুবির ঘটনায় ৪৭ জনের প্রাণহানী ঘটে বলে সূত্র জানায়।

biwtc2ভুক্তভোগীদের আভিযোগ :

এ ব্যাপারে কথা হয় হাতিয়া অঞ্চলের বাসিন্দা নুরজাহান বেগম ও তার স্বামী নুরুল আলমের সাথে। তারা বলেন, জীবিকার সন্ধানে ১১/১২ বছর ধরে চট্টগ্রামে বসবাস করি। কিন্তু জাহাজে চলাচলে ভোগান্তির কারনে তেমন বাড়ি ফেরা হয় না। দুয়েকটি রমজানের ঈদে বাড়ি ফিরতে হয়েছে মাছ ধরার ট্রলারে করে। এতে একবার পানিতে ডুবে গেলেও সাতরিয়ে কোন রকমে বেচে যায়।

সন্দ্বীপ এলাকার বাসিন্দা মোরশেদ আলম (২৪) জানান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে লেখাপড়া করেন তিনি। কিন্তু জাহাজ স্বল্পতার কারনে সদরঘাট থেকে বাড়ি ফিরতে চেয়েও বহুবার ফেরত যেতে হয়েছে। শেষে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড দিয়ে মাছ ধরার ট্রলারে করে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। ২০১৪ সালের জুলাইয়ে একবার বাড়ি ফেরার সময় ট্রলারডুবিতে তার প্রাণ যায় যায় অবস্থা হয়েছিল বলে জানান তিনি।

সন্দ্বীপ উপজেলার ভুমি অফিসের তহশীলদার মো. রাসেল (৩৬) বলেন, সরকারি চাকরির কারনে এই মৃত্যুদ্বীপের বাসিন্দা আমি। যাতায়াতে মৃত্যুঝুঁকির কারনে গত দুই বছর ঈদে পর্যন্ত বাড়ি যায়নি। কিন্তু সরকারি কাজের কারনে কোনো সময় চট্টগ্রাম জেলা শহরে গেলে আর এই মৃত্যুদ্বীপে ফিরতে ইচ্ছে করে না।

একইভাবে মাছ ধরার ট্রলারে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে যাতায়াতের কথা জানান সন্দ্বীপ উপজেলা সদরের বাসিন্দা ও আরবান আমেরিকান হাউজিং সোসাইটির মালিক মো. আনোয়ার হোসেন (৫১), হাতিয়া অঞ্চলের বাসিন্দা আবদুল আলী (৪২) ও জাফর আহমদ (৫৭) সহ অনেকেই।

নৌকা, ট্রলার ও জাহাজডুবির কারণ :

যান্ত্রীক ত্রুটির সাথে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি যাত্রী ও মালামাল বোঝাইয়ের কারনেই নৌকা, ট্রলার ও জাহাজডুবির ঘটনা ঘটছে। এমন দাবি যাত্রী ও সংশ্লিষ্ট সকলের হলেও নিরুপায় বলছে বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম সদরঘাট স্টেশনের ম্যানেজার (পরিচালন) মাহিনুর আলম সিটিজি টাইমসকে বলেন, যাত্রীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় এবং সপ্তাহে মাত্র তিনদিন চলাচলের কারনে এই ঝুঁকি। আমরা নিরুপায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এমভি আবদুল মতিন ও এমভি মনিরুল সর্বোচ্চ ৩০০ যাত্রী ও ১৫০ টন মালামাল পরিবহনে সক্ষম হলেও এক হাজারের অধিক যাত্রী ও ৪শ টনেরও বেশি মালামাল নিয়ে যাতায়াত করছে। ফলে প্রায় সময় সাগরের মাঝখানে বিকল হয়ে পড়ে। নতুবা ডুবে যায় সাগরে। এতে নানা ভোগান্তি পোহাতে হয় যাত্রীদের।

অপরদিকে মাছ ধরার ট্রলার ও অননুমোদিত ইঞ্জিন বোটে যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের কোন সুযোগ নেই। তাতেও অতিরিক্ত যাত্রী ও মালবোঝাই নিয়ে যাতায়াতে ট্রলার ও নৌকাডুবির ঘটনা ঘটছে। এসব মাছ ধরার ট্রলার ও ইঞ্জিন বোটের যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের বিরুদ্ধে কোনরকম আইনগত ব্যবস্থাও নিচ্ছে না প্রশাসন।

জেলা প্রশাসনের বক্তব্য :

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাব্বির আহমেদ সিটিজি টাইমসকে বলেন, নৌ-পথে জাহাজে অতিরিক্ত যাত্রী ও মাছ ধরার ট্রলারে যাত্রী পরিবহণের কোন সুযোগ নেই। অতিরিক্ত যাত্রী ও মালবোঝাইয়ের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালনা করা হবে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত