টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

স্বপ্নদুয়ার খোলার অপেক্ষায় চট্টগ্রামবাসী

আজ কর্ণফুলী টানেলও চীনা ইকোনমিক জোনের ভিত্তি স্থাপন

কর্ণফুলী টানেল

কর্ণফুলী টানেল

চট্টগ্রাম, ১৪  অক্টোবর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস): দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে শুক্রবার ঢাকা আসছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। চীনা নেতার এ সফর দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায় সৃষ্টির ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীনের প্রেসিডেন্টের এ সফর সফল করতে দুই দেশই সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ঢাকায় তাকে দেয়া হবে লাল গালিচা সংবর্ধনা।

দীর্ঘ ৩০ বছর পর কোনো চীনা প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরকে বেশ গুরুত্বের সাথে দেখছে বাংলাদেশ। সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্টকে সর্বোচ্চ সম্মান ও মযার্দা দেয়া হবে।

এদিকে, স্বপ্নদুয়ার খোলার অপেক্ষা চট্টগ্রামবাসীর সামনে । কর্ণফুলী নদীর দুই তীর মিলতে যাচ্ছে এক নতুন স্বপ্নে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিন পিং যৌথভাবে ভিত্তি স্থাপন করবেন কর্ণফুলীর তলদেশে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের ।

সেই সঙ্গে ভিত্তি স্থাপিত হবে আনোয়ারার চীনা ইকোনমিক জোনের। যেখানে বিনিয়োগ হবে ১৬ হাজার কোটি টাকা।

টানেল ও ইকোনমিক জোনের ভিত্তি স্থাপনকে ঘিরে কর্ণফুলী নদীর ওপারে আনোয়ারায় চলছে সাজ সাজ রব। পতেঙ্গার নেভাল এভিনিউ ও কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে সিইউএফএল-কাফকো এলাকার অস্থায়ী বিভিন্ন স্থাপনা সরিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে।

আনোয়ারা কালা বিবির দীঘি এলাকায় ইকোনমিক জোনের প্রস্তাবিত স্থানে নির্মিত হয়েছে পতাকা স্ট্যান্ড। যেখানে পৃথক স্ট্যান্ডে বাংলাদেশ ও চীনের পতাকা টাঙ্গানোর ব্যবস্থা ছাড়াও বেজা ও সহযোগী সংস্থাগুলো পতাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা থাকছে।

সূত্র জানায়, চীনের রাষ্ট্রপ্রতি শি জিন পিং ঢাকার পৌঁছার পর কর্ণফুলী টানেল নিয়ে একটি কাঠামোগত চুক্তির পাশাপাশি দুটি ঋণচুক্তি সই হবে। এর আওতায় বাংলাদেশকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেবে চীন।

এই ঋণের শর্তগুলো সহজতর করতে কাজ করে যাচ্ছেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ৮ সদস্যের নেগোসিয়েশন টিম ।

ব্যাপক আলোচনার পর চুক্তির ম্যানেজমেন্ট ফি শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ করতে সম্মত হয়েছে চীন। ২ শতাংশ সুদের হারে এই ঋণ পরিশোধের সময় ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ২০ বছর।

চীনের বড় ধরনের সহযোগিতায় বাস্তবায়নাধীন এই টানেলের মাধ্যমে চট্টগ্রামের মূল শহরের সঙ্গে কর্ণফুলীর ওপারকে যুক্ত করে চীনের সাংহাইয়ের আদলে গড়ে তোলা হবে বাণিজ্যিক কেন্দ্র।

বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রাম শহরের যানজট কমবে। বদলে যাবে পুরো চট্টগ্রামের চেহারা। সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব কমবে ৩৪ কিলোমিটার ।

২০০৮ সালে চট্টগ্রামের লালদীঘির মাঠে নির্বাচনী জনসভায় কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই প্রতিশ্রুতির কতটা কল্পনাবিলাসী এবং কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে নানা কথা ছিল তখন থেকেই।

২০১২ সালে সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন চূড়ান্ত হওয়ার পর স্থান নির্বাচন নিয়ে কালক্ষেপণ হয়।

২০১৪ সালের শেষ দিকে এসে কর্ণফুলীর মোহনায় টানেল নির্মাণে নগর পরিকল্পনাবিদ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দুই বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা একমত হলে স্বপ্ন ও বাস্তবের দূরত্ব কমে আসে।

আজ শুক্রবার ভিত্তি স্থাপনের মধ্য দিয়ে স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেতে যাচ্ছে।

টানেল বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একটি সূত্র জানায়, স্বপ্নের টানেল বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম হবে সাংহাই । বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধশালী দেশ চীনের বাণিজ্যিক রাজধানীর প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবে বন্দরনগরী।

একটি টানেলে এক করা হবে দুই তীরের দুই অংশকে। পুরনো শহরের পাশাপাশি গড়ে উঠবে নতুন আরেক শহর।

চোখে ভাসবে চীনের ওয়াংপু নদীর দুই তীরের দুই শহর পুডং ও পুশি। টানেল নির্মাণে নদীর তলদেশে প্রায় একশ’ ফুট গভীরে বসানো হবে ৩৫ দশমিক ৪৩ ফুট প্রশস্ত দুটি টিউব। যা নদীর বর্তমান তলদেশ থেকে আরো অন্তত ৯০ ফুট গভীরে থাকবে।

দুটি টিউবে গাড়ি চলাচলের জন্য দুটি করে লেন থাকবে। প্রতিটি লেনের প্রস্থ হবে ৩ দশমিক ৬৬ মিটার। দুটি টিউবের মধ্যে কমপক্ষে ৩৬ ফুট দূরত্ব থাকবে।

উন্নত বিশ্বে নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের কনসেপ্ট বেশ আগের হলেও কর্ণফুলী টানেলটি হবে বাংলাদেশে প্রথম টানেল। এজন্য ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশী বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে করা হয়েছে সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডিজ) কাজ।

টানেল নির্মাণে ব্যয় হবে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে চীন সরকার দেবে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা।

নদীর তলদেশে টানেলের দৈর্ঘ্য হবে তিন কিলোমিটারের বেশি । কর্ণফুলী নদীর ভাটির দিকে নেভাল একাডেমির কাছে হবে টানেলের প্রবেশপথ।

টানেলের বহির্গমনপথ হবে আনোয়ারায় কাফকো সার কারখানার পাশে। ভিত্তি স্থাপনের পর অর্থায়ন প্রক্রিয়া ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী ডিসেম্বরে শুরু হবে মূল কাজ। ২০২০ সাল নাগাদ টানেলটির ব্যবহার শুরু হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে প্রস্তাবিত টানেলের সঙ্গে যুক্ত করে ১৪শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে রিং রোড প্রকল্পের কাজও এগিয়ে চলছে। কর্ণফুলী টানেলের কানেকটিং সড়ক হিসেবেও ব্যবহার করা হবে এই রিং রোড।

আগামী তিন বছরের মধ্যে সড়কটি নির্মিত হলে কক্সবাজারমুখী গাড়িগুলো সহজেই পতেঙ্গার নেভাল একাডেমির পাশ দিয়ে টানেল হয়ে কর্ণফুলীর ওপারে চলে যেতে পারবে।

ফলে বাস্তবায়নাধীন চায়না ইকোনমিক জোনসহ কর্ণফুলীর অন্য পার আনোয়ারায় শিল্প বিকাশে এই যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম ইপিজেডের সঙ্গেও সংযুক্ত হবে এই রিং রোড। ইপিজেড লাগোয়া রিং রোডের সঙ্গে একটি আলাদা গেট করা হবে, যেটি দিয়ে ইপিজেডে উৎপাদিত পণ্য ও কাঁচামাল পরিবহনে ব্যবহৃত কাভার্ড ভ্যান ও লরি রিং রোড ব্যবহার করে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরসহ অন্যান্য গন্তব্যে যাবে বলে বেপজা সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে স্বপ্নের কর্ণফুলী টানেলের মতোই আজ ভিত্তি স্থাপনের তালিকায় থাকা চীনা ইকোনমিক জোন প্রকল্প নিয়েও এলাকায় রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। জি টু জি (বাংলাদেশ ও চায়না সরকার) পদ্ধতিতে আনোয়ারা উপজেলায় ৭৭৪ একর জমিতে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে ১৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে চায় বাস্তবায়নকারী সংস্থা চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি।

এতে ৩৭১ শিল্প-কারখানায় কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে ৫৩ হাজারের বেশি মানুষের।

এই অর্থনৈতিক জোনে বাংলাদেশ সরকারের ৩০ শতাংশ আর চীনা বিনিয়োগকারীদের ৭০ শতাংশ অংশীদারিত্ব থাকবে। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে তৈরি পোশাক, রাসায়নিক, ফার্মাসিউটিক্যালস, টেলিযোগাযোগ, কৃষিনির্ভর শিল্পকারখানা, রাসায়নিক দ্রব্য, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রোনিকস, টেলিভিশন/মনিটর,চিকিৎসা/অপারেশনের যন্ত্র, প্লাস্টিক, আইটি ও আইটি সম্পর্কিত কারখানা গড়ে উঠবে।

বাংলাদেশ এক্সপোর্ট জোন অথরিটি বেজা চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে ইকোনমিক জোন শিল্প কারখানা স্থাপনের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে । এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত