টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

কাপ্তাই হ্রদের তীর ঘেঁষে অবৈধ ভবন: ঝুঁকিতে মানুষ ও হ্রদ

cচট্টগ্রাম, ০৬ অক্টোবর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস): প্রকৃতিপ্রেমীদের অন্যতম আকর্ষণ কাপ্তাই হ্রদের তীর ঘেঁষে দখল করা ভূমিতে গড়ে উঠছে অবৈধ ভবনের সারি। ঝুঁকিপূর্ণ এসব অবৈধ ভবনে বসবাসকারী মানুষেরা বাস করছেন মৃত্যুর আশঙ্কায়। রূপ হারাচ্ছে প্রকৃতি। শহরের সব আবর্জনা হ্রদে ফেলায় এর পানি পানের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, নিরুপায় হয়ে এসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বাস করছেন তারা। সংশ্লিষ্টরা জানান, গুরুত্ব সহকারে অবৈধ ভবন সমস্যার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, পাহাড়ের কিছু অংশ বাদে ব্যাপকভাবে বেদখল হয়েছে হ্রদ। হ্রদের তীরজুড়ে সারি সারি অবৈধ বসতবাড়ি আর দালানকোঠা গড়ে ওঠেছে। হ্রদের তীর এতোই জনবসতিপূর্ণ হয়ে পড়েছে যে, শহরে দু’চারটি এলাকা বাদ দিলে কোথাও নিরিবিলিতে হ্রদ দেখার সুযোগ নেই। রাঙামাটি জেলা শহরের এমন কোনও স্থান নেই যেখানে দখল হয়নি হ্রদ। সবচেয়ে বেশি দখল হয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ রিজার্ভ বাজার, বনরূপা, তবলছড়ি এবং কলেজগেইট এলাকায়।

সরকারি প্রজ্ঞাপণ অনুসারে, কাপ্তাই হ্রদের ১২০ এমএসএল (মিনস সি লেভেল) এর মধ্যে কোনও ভবন নির্মাণ করার অনুমতি নেই। কাপ্তাই হ্রদের পানি ধারণক্ষমতা ১০৯ এমএসএল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সরকারি প্রজ্ঞাপণের তোয়াক্কা না করে ১০৯ এসএসএল পানির ভেতরেই মানুষ ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তুলছেন। অথচ ১০৫ এমএসএল পানি হলেই পর্যটন কমপ্লেক্সের ঝুলন্ত সেতুর পাটাতন তলিয়ে যায়। ফলে হ্রদের পানি সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর পূর্বেই শহরের বেশিরভাগ ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে যাচ্ছে। এসব ভবনের বেশিরভাগই কাপ্তাই হ্রদের ওপর অবৈধভাবে তৈরি করা হয়েছে। এতে খুঁটি থেকে মাটি সরে গিয়ে ভবন ধসের ঘটনা ঘটছে।

৪ অক্টোবর, মঙ্গলবারই এরকম একটি ভবন ধসের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (৪ অক্টোবর) বিকাল সাড়ে ৫টায় রাঙামাটি সদরে মহিলা কলেজ সড়কে হ্রদের পাড়ে অবস্থিত দুই তলা ভবনটি হেলে পড়তে শুরু করে। মাত্র ১০ মিনিট সময়ের মধ্যে ভবনটির নিচতলা পুরোটাই হ্রদের পানির নিচে চলে যায়। এ সময় ভবনের দুটি ফ্লোরে অন্তত চারটি পরিবার আটকা পড়ে। তবে পাশের একটি নারিকেল গাছের কারণে পুরো ভবন তলিয়ে যেতে পারেনি। তখন ভবনের কয়েকজন বাসিন্দা বের হয়ে আসেন। এ ঘটনায় শিশুসহ ৫ জন নিহত হন।

দখলকরা জমিতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব ভবনে বাস করা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও স্থানীয়রা জানান, নিরুপায় হয়েই তারা এসব বাসায় বাস করছেন। সেরকমই এক স্থানীয় ভাড়াটিয়া তারিকুল ইসলাম (তুহিন)। তিনি বলেন, ‘ আমরা দূর উপজেলা থেকে এখানে এসেছি। কিন্তু মঙ্গলবার যা ঘটেছে তাতে আমরা আতংকিত। অথচ অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ নাই আমাদের। কারণ মুল শহরের বাসা ভাড়া এত বেশি, যা ঢাকা বা চট্টগ্রামের চেয়েও বেশি হতে পারে।’

তুহিন আরও বলেন, ‘তাহলে আমরা স্বল্প আয়ের লোকেরা কোথায় যাব? ঝুকিপূর্ণ হলেও আমাদের এখানের থাকতে হবে। মূল শহরের বাসাগুলোর ভাড়া যদি আমাদের আয়ের মধ্যে থাকতো তাহলে কখনও আমরা এখানে থাকতাম না।’

পরিবেশবাদী সংগঠন গ্লোবাল ভিলেজের সভাপতি হেফাজত বারী সবুজ বলেন, ‘কাপ্তাই হ্রদের তীরবর্তী স্থানগুলো যেভাবে দখল হয়ে যাচ্ছে, তাতে রাঙামাটিকে আর পর্যটন এলাকা হিসেবে মনে করা যায় না। অপরিকল্পিতভাবে নগরায়নের ফলে যেকোনও সময় এখানে বড় ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা রয়েছে।’

মঙ্গলবারের ভবন ধসে প্রাণহানির ঘটনায় মালিক পক্ষকে দোষারোপ করে সবুজ বলেন, ‘হ্রদের ওপর পিলার (খুঁটি) তৈরি করে ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন মালিকপক্ষ। ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও মালিকপক্ষ ভাড়া দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’ হ্রদের তীরবর্তী এলাকা থেকে সব অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

এদিকে, দখল ও অবৈধ ভবন নির্মাণ ছাড়াও হ্রদের তীরের বসতবাড়িসহ শহরের প্রায় সব বাসা, অফিস ও স্থাপনার বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনের সংযোগ লাইন কাপ্তাই হ্রদে গিয়ে মিশেছে। ফলে বদ্ধ পানির এই জলাশয়টিতে অপরিচ্ছন্ন আবর্জনা পড়ে এর পানি পানের অনুপযোগি হয়ে পড়েছে। এখন ছড়া ঝরণা বা গভীর নলকূপই খাবারের পানির বিকল্প ভরসা হিসেবে কাজ করছে।

রাঙামাটি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী সজল কান্তি দাশ জানান, কাপ্তাই হ্রদের পানির বর্তমান যে অবস্থা তাতে এই পানি বিশুদ্ধকরণ ছাড়া কোনওভাবেই পান করার উপযুক্ত নয়। হ্রদের চারদিকে হওয়ায় শহরের মানুষ সব পয়ঃনিষ্কাশনের লাইন এবং সব বর্জ্য হ্রদেই ফেলা হচ্ছে। এছাড়া হ্রদে ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচলও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ফলে হ্রদের পানি দিনে দিনে আরও বেশি পান করার অনুপযোগী হচ্ছে।

রাঙামাটি পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান জানান, হ্রদের তীর ঘেঁষে যেসব স্থাপনা তৈরি হয়েছে, তা এখন ভাবনার বিষয়। পৌরসভা রেকর্ডীয় জায়গায় ভবন নির্মাণ করে। খাস জায়গায় যেসব স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে প্রশাসনের সহযোগিতায় খুব দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হবে।

মঙ্গলবারের ভবন ধসের ঘটনা সম্পর্কে আতিকুর রহমান বলেন, ‘ধসে পড়া ভবনটি খাস জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে পৌরসভার অনুমোদন দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি যে সুপারিশ করবে, সে ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাঙামাটি পৌরসভার মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘হ্রদ দেখতে আসা পর্যটকরা হ্রদের তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ ভবন দেখে হতাশ হচ্ছেন। এটা সত্যিই হতাশার। এসব স্থাপনা শহরের সৌন্দর্যকে নষ্ট করছে। ফলে রাঙামাটির নেতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে উঠছে। আমরা বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছি।’

শহরে আবাসন সমস্যার সমাধানে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে পৌর মেয়র বলেন, ‘একটা সামগ্রিক নগর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই পরিকল্পনায় ভবিষ্যতের শহরের একটি রূপরেখা দাঁড়াবে। একই সঙ্গে হ্রদের তীরের সাধারণ মানুষকে সরিয়ে নিতে একটি নতুন উপশহর করার ভাবনাও থাকছে আমাদের পরিকল্পনায়।’-  বাংলা ট্রিবিউন

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত