টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

উন্নয়নের পথে হাঁটছে চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম, ০৮ অক্টোবর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস):: আশাতীত উন্নয়নের পথে হাঁটছে চট্টগ্রাম। সরকারি-বেসরকারি এবং বিদেশি বিনিয়োগে গড়ে তোলা হচ্ছে ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিদ্যুৎ উন্নয়ন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় আসছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। প্রায় আশি হাজার কোটি টাকার এসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পাল্টে যাবে চট্টগ্রাম। পাশাপাশি শিল্পায়ন, পর্যটন, আবাসন এবং ব্যবসাবাণিজ্যে আসবে ব্যাপক গতি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যোগাযোগ এবং জ্বালানিখাতের ব্যাপক উন্নয়নই দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করবে। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার ক্ষেত্রে চট্টগ্রামে গৃহীত প্রকল্পগুলো বড় ধরনের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে।

চট্টগ্রাম মহানগরীসহ সন্নিহিত এলাকার যান চলাচলের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত গতি আনার জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) নগরীর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ফিডার রোড উন্নয়নের পাশাপাশি ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে। ইতিমধ্যে সিডিএ কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয় করে নির্মাণ করেছে একাধিক ফ্লাইওভার।

নগরীর প্রথম ফ্লাইওভার হিসেবে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়। এরপর নগরীতে একে একে বেশ কয়েকটি ফ্লাইওভার ও ওভারপাস নির্মাণ করা হয়েছে। ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের ফ্লাইওভারটির কার্যকারিতা আরো বাড়ানোর জন্য ইতিমধ্যে নকশায় পরিবর্তন এনে ‘ওয়াই আকৃতি’ করা হচ্ছে। ফ্লাইওভারটির সাথে আরাকান সড়কের যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য বিশেষ এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার ছাড়াও কদমতলীতে ১.৩ কিলোমিটার দীর্ঘ দুই লেনের একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে ৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে। এই ফ্লাইওভারের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে দেওয়ানহাটে দশমিক ৬৫ কিলোমিটারের একটি ওভারপাস নির্মাণ করা হয়েছে ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে।

মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত চার লেনের ৫ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ চলতি বছরের মধ্যে শেষ করার তোড়জোড় চলছে। ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এই ফ্লাইওভারটিতে ষোলশহর দুই নম্বর গেট এবং জিইসি মোড়ে গাড়ি ওঠানামার সুযোগ রাখা হচ্ছে।

সিডিএ ফ্লাইওভার প্রকল্পের পাশাপাশি চারটি বিশেষ উদ্দেশ্য সামনে রেখে আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ আউটার রিং রোড প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সাগরপাড়ের বেড়িবাঁধ এবং রাস্তা হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলেও এটির বহুমুখী ব্যবহার আশা করা হচ্ছে।

এর মধ্যে জলোচ্ছ্বাস থেকে নগরীকে রক্ষার পাশাপাশি পর্যটন শিল্পের বিকাশে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। নগরীর যানজট নিরসনেও প্রকল্পটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। কর্ণফুলীর তলদেশে প্রস্তাবিত টানেলের এপ্রোচ রোড হিসেবে আউটার রিং রোড ব্যবহৃত হবে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে ফৌজদারহাট হয়ে গাড়ি কর্ণফুলীর তলদেশ দিয়ে কক্সবাজার সড়কে গিয়ে পৌঁছবে। এতে ঢাকা বা দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে আসা গাড়িগুলো নগরীতে প্রবেশ না করেই চলাচল করতে পারবে। এই প্রকল্পের সাথে মিল রেখে ফৌজদারহাট-বায়েজিদ ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের বাইপাস রোড নির্মাণ করা হচ্ছে। দুইশ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাস্তাটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে বায়েজিদ বোস্তামি সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত। এই রাস্তাটি চালু হওয়ার সাথে সাথে জাকির হোসেন রোড এবং জিইসি মোড়সহ (অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ চত্বর) সন্নিহিত এলাকার যানজট পঞ্চাশ শতাংশ কমে যাবে।

কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল নির্মাণের প্রক্রিয়াও দ্রুত চলছে। চলতি বছরের মধ্যেই এই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলটির তিন কিলোমিটার থাকবে নদীর ৩৩ মিটার গভীরে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে ব্যয় হবে ৯ হাজার কোটি টাকা। চীন এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।

কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে প্রায় এগার কিলোমিটার দীর্ঘ এপ্রোচ রোড নির্মাণ করে টানেলের সাথে কক্সবাজার সড়কের সংযোগ নিশ্চিত করা হবে। দেশের প্রথম এই টানেল নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তৃত এলাকায় শিল্পায়ন, পর্যটন এবং আবাসনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। এই প্রকল্প দেশের অর্থনীতিতেও ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি জ্বালানি খাতের উন্নয়নেও ব্যাপক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রসহ জ্বালানি সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীতের ক্ষেত্রে যোগাযোগ এবং জ্বালানি নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৮৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।

২০২১ সালে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়াবে ২৪ হাজার মেগাওয়াট। ২০৪১ সালে দেশে বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে ৬০ হাজার মেগাওয়াট। এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্যাস বা ফার্নেস অয়েল দিয়ে উৎপাদন করা সম্ভব নয়। এই অবস্থায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী এলাকায় ৩৫ হাজার কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে।

আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্রজেক্ট নামের এই প্রকল্পের জন্য প্রায় ৬ হাজার একর ভূমি হুকুম দখল করা হচ্ছে। জাপানের জাইকা, বাংলাদেশ সরকার এবং কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড যৌথভাবে এই প্রকল্পে অর্থায়ন করবে। কয়লাভিত্তিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে।

কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, জ্বালানি সংকট নিরসনে গ্যাসও বড় ফ্যাক্টর। কিন্তু দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে প্রত্যাশিত গ্যাস চট্টগ্রামে আনা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করে চট্টগ্রামে দৈনিক পাঁচশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এলএনজি আমদানি এবং চট্টগ্রামে সরবরাহ করার জন্য মহেশখালীতে একটি এলএনজি টার্মিনাল এবং মহেশখালী থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা পর্যন্ত ৯২ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপ লাইন নির্মাণের কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে পেট্রোবাংলা যুক্তরাষ্ট্রের এস্ট্রাওয়েল অ্যান্ড এক্সিলারেট কনসোর্টিয়াম লিমিটেডের সাথে চুক্তি করেছে।

এক লাখ ৩৮ হাজার ঘনমিটার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন টার্মিনাল থেকে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়া হবে। এই গ্যাস পাওয়া গেলে চট্টগ্রামের জ্বালানি সংকট অনেক দিনের জন্য ঘুচে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন এবং জ্বালানি সংকট সুরাহার সাথে সাথে চট্টগ্রামের শিল্পায়ন এবং পর্যটনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেই প্রয়োজন মেটাতে নির্মাণ করা হয়েছে চট্টগ্রামের প্রথম পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লু চিটাগাং বে ভিউ। প্রায় আটশ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হোটেলটি ইতিমধ্যে কেবল চট্টগ্রামেই নয়, বিশ্বের দরবারে চট্টগ্রামের অবস্থানে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। চট্টগ্রামে আরো একটি পাঁচ তারকা হোটেল চালুর প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের সংগঠন চট্টগ্রাম চেম্বার নগরীর আগ্রাবাদে দুইশ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছে দেশের প্রথম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কার্যক্রম বিশ্বের বাণিজ্য জগতে চট্টগ্রামকে বিশেষ মর্যাদার আসন দিয়েছে। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দশম থেকে বিশতলা পর্যন্ত জায়গায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একটি পাঁচ তারকা হোটেল প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলছে।

মতামত