টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

বিশ্ব নদী রক্ষা দিবস: পরিবেশের স্বার্থে মুমূর্ষু কর্ণফুলীকে বাঁচানোর আকুতি

মসরুর জুনাইদ

ছবিঃ অনুপম বড়ুয়া

ছবিঃ অনুপম বড়ুয়া

চট্টগ্রাম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস):: ‘কর্ণফুলীরে সাক্ষী রাখিলাম তোরে, অভাগিনীর মনের কথা কইলাম তোরে’ এ রকম আরো কত গান আর ঐতিহ্যে লালিত এক সময়ের প্রমত্তা স্রোতস্বিনী চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী।

হাজার বছরের কালের সাক্ষী এ নদী। অনেক শিল্পী অনেক গান লিখেছেন কর্ণফুলীকে নিয়ে। অনেক পুঁথি, কবিগান ও পালাগান সৃষ্টি হয়েছে লুসাই পাহাড় থেকে নেমে আসা বঙ্গোপসাগরে মিশে যাওয়া এ নদীকে নিয়ে।

দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ নদী শুধু চট্টগ্রামের নয়, সমগ্র দেশের সমৃদ্ধির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর কর্ণফুলীর তীরেই গড়ে ওঠেছে। অর্থনৈতিক মুক্তির স্বর্ণধার হয়ে বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতিক ও সংস্কৃতির চালিকাশক্তি এ কর্ণফুলী নদী।

এই কর্ণফুলী নদী এখন অবৈধ দখলদারদের কবলে, দুষণে, বিপন্ন ও মরণাপন্ন।

এদিকে, কর্ণফুলী নদীতীরের দুই হাজার ১৮১টি অবৈধ স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায় প্রকাশের ৭ দিনের মধ্যে এসব স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে বলা হয়েছে।

উচ্ছেদের জন্য আদালত ৯০ দিন সময়সীমা বেঁধে দিয়ে রায় ঘোষণা করার এক মাস পেরিয়ে গেলেও উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

এ কারণে দখল ও দূষণে দিন দিন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কর্ণফুলী।

আপরদিকে, কারখানার বর্জ্য ও নদী পাড়ের হাজার হাজার মানুষ খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগের কারণে দূষিত হয়ে পড়েছে কর্ণফুলী নদীর পানি।

এতে বিভিন্ন প্রজাতির মিঠা পানির মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। মাছ শিকারের ওপর নির্ভরশীল কয়েক হাজার জেলে পরিবারে দুর্দিন চলছে।

ছবিঃ অনুপম বড়ুয়া

ছবিঃ অনুপম বড়ুয়া

ভারতের মিজোরাম লুসাইকন্যা থেকে ধেয়ে আসা কর্ণফুলী নদীর উৎপত্তি। কর্ণফুলী নদী পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে কাপ্তাই-রাঙ্গুনিয়া-রাউজান হয়ে চট্টগ্রামে সাগরের সাথে মিশেছে।

কর্ণফুলী নদীতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। জলবায়ুর প্রভাব, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীর পানি মাত্রাতিরিক্ত দূষিত হওয়াতে এসব মাছ হারিয়ে যাচ্ছে।

কর্ণফুলী নদীতে ২৩০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তি হয়েছে। ২৫ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। নদীতে ৭০ প্রজাতির মাছ হুমকির মুখে রয়েছে বলে বেসরকারি এনজিও সংস্থা পিপলস রিভার্স ডিফেন্ডার (পিআরডি) গবেষণায় জানানো হয়েছে।

নদীতে মাছ শিকার করে কর্ণফুলী নদীতে প্রায় ২০ হাজার জেলে পরিবার নির্ভরশীল।

জানা গেছে, কারখানার বর্জ্যে কর্ণফুলী নদীর পানি দিন দিন ভয়াবহভাবে দূষিত হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে মাছের আবাসন। কৃষকদের সেচকার্যে দূষিত পানি ব্যবহার হচ্ছে। ফলে হাজার হাজার একর জমির উর্বরা শক্তি কমে যাচ্ছে। উৎপাদনও কমে এসেছে।

প্রয়োজনীয় ড্রেজিং ও সংস্কারের অভাবে নদীর নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে। সামান্য বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পানি বৃদ্ধি পায় নদীতে। এতে শাখা ও উপশাখা নদী দিয়ে পানি দ্রুতগতিতে প্রবাহিত হয়। কাপ্তাই-রাঙ্গুনিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে সহজেই বন্যায় কবলিত হয়ে গুমাইবিল, ইছামতিসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়।

চট্টগ্রামের শস্য ভান্ডারখ্যাত বৃহত্তম গুমাইবিলে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। উল্লেখযোগ্য মাছ গুমাইবিলে পাওয়া যায় না।

সূত্র মতে, কর্ণফুলী নদীর পানি ভয়াবহ দূষণ প্রক্রিয়া পূর্বের তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীর তীরবর্তী এলাকায় শতাধিক গ্রামে দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এসব পরিবারে প্রতিদিন লেগে থাকে অসুখ-বিসুখ।

কাপ্তাই থেকে চট্টগ্রাম শহর পর্যন্ত অর্ধশতাধিক কারখানা গড়ে উঠেছে। দূষিত বর্জ্যগুলো কোনো প্রকার পরিশোধন না করে ক্ষতিকারক রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ছেড়ে দেয়া হয়।

এসব দূষিত পানি নদীতে মিশে একাকার হয়ে যায়। নদীর পানি বিষাক্ত হয়েছে। পানির ঘনত্ব বেড়েছে। বিষাক্ত গ্যাস সিএসটু রাসায়নিক গ্যাস পোড়ানোতে তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন মানব কল্যাণ সংগঠন মানববন্ধনসহ বিভিন্নভাবে প্রতিবাদ করেছে।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, কাপ্তাই-রাঙ্গুনিয়ার কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী এলাকার মধ্যে রাইখালী, কোদালা, চন্দ্রঘোনা, কদমতলী, মরিয়মনগর, শিলক, সরফবাটা, ইছামতি, সৈয়দবাড়ী, গোচরা, নোয়াগাঁও, ফকিরখিল, পোমরা, বেতাগীসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীর পানি ব্যবহার করে।

এছাড়া রাউজান, হাটহাজারী, বোয়ালখালীসহ বিভিন্ন উপজেলার মানুষ সরাসরি নদীর পানি পান ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করে। নদীর পানি ব্যবহার করে তাদের মতে, প্রায় দেড় লাখ মানুষ দূষিত পানি ব্যবহার করে।

জরিপ মতে, কর্ণফুলী নদীতে ২৩০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়েছে। ৭০ প্রজাতির মাছ কর্ণফুলীতে অস্তিত্ব রয়েছে। তার মধ্যে ২৫ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তর পথে। মূলত দূষিত পানি নদীতে মিশে মাছের আবাসন হারিয়ে যাচ্ছে। এতে মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে। বেসরকারি এনজিওটি দাবি করছে দূষিত বর্জ্যের কারণে মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে।

অন্যদিকে একযুগের বেশি কর্ণফুল নদীর কোনো সংস্কার করা হয়নি। বর্তমানে কর্ণফলী নদী চরমভাবে নাব্যতা হারিয়েছে।

কর্ণফুলী নদীর শাখা খালগুলোর মধ্যে রাইখালী, চিংমরম, মারামগিরি, কাপ্তাই, ওয়াপ্পা, কোদালা, ধোপাঘাট, ডংখাল, মাহফুর খাল (হাশেম খাল), কাটাখালী, ইছামতি, শিলক, চিরিঙআ, চেংখালী, বেতাগী অসংখ্য খাল এবং মদুনাঘাটস্থ হালদা নদী দিয়ে পানির প্রবাহের ফলে কর্ণফুলী নদীতে ঢুকে পড়েছে মিল-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য মিশ্রিত পানি। তেমনি নদী ভরাট হয়ে দিন দিন গভীরতা নষ্টসহ নাব্যতা হারাচ্ছে।

তাছাড়া কর্ণফুলী পেপার মিল, রেয়ন মিল কমপ্লেক্স, বিএফআইডিসি ইস্টার্ন কেমিকেল লিঃ, কর্ণফুলী জুট মিল, কাপ্তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অর্ধশতাধিক মিল-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে অপরিকল্পিতভাবে ফেলা হচ্ছে।

ফলে কর্ণফুলী নদীর পানি কেমিকেল রিজার্ভারে পরিণত হয়েছে। মাছশূন্য হয়ে পড়ছে কর্ণফুলী নদী। মাছ আগের চেয়ে একেবারে কম ধরা পড়ছে। মাছ না পেয়ে জেলেরা মানবেতন দিন কাটাচ্ছেন। শত শত জেলে বেকার জীবন কাটাচ্ছেন। জেলেদের মতে, কল-কারখানাগুলো থেকে নির্গত দূষিত বর্জ্য মাছের আবাসন নষ্ট হয়েছে।

তাছাড়া কেমিকেল রিবার্জারের কারণে জমির উর্বরা শক্তি দিন দিন কমে যাচ্ছে। কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী কয়েক হাজার একর ফসলী জমিতে দূষিত রঙ্গিন পানি কৃষকরা সেচকার্যে ব্যবহার করে।

প্রতিবছর হাজার হাজার কৃষক ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

প্রতিবছর বর্ষা মওসুমের প্রবল বর্ষণে তেড়ে আসা স্রোত বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। সামান্য বৃষ্টিতে নদীর কূল ভরাট হয়ে সহস্রাধিক বাড়িঘর পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। নদীর যেমন নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে। তেমনি নদীর পাড়বর্তী বসতি এলাকা ভাঙ্গনের কবলে পড়ছে।

ক্রমাগত হারে প্রতিবছর নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে নদীর গভীরতা নষ্ট হচ্ছে।

শীত মওসুমে নদীর পানি কমে গেলে নদী পারাপারের যাত্রীদের মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। ফলে চরম দুর্ভোগের সীমা থাকে না।

বিদ্যমান এই পরিস্থিতির মধ্যেই বিশ্বের অন্যান্য স্থানের ন্যায় দেশে আজ বিশ্ব নদী রক্ষা দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য- ‘সুস্থ নদী, সুস্থ শহর (হেলদি রিভার, হেলদি সিটি)।

চট্টগ্রামেও দিবসটি পালনের লক্ষ্যে বিভিন্ন সংগঠন পৃথক পৃথক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

কর্ণফুলী নদীর দুই তীরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে বস্তি, বাড়িঘর, দোকান ও শিল্প-কারখানা। দেশের প্রভাবশালী শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতারা নদী দখলে নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে দখল প্রক্রিয়া চলে আসলেও তা রোধ করা যায়নি।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, কর্ণফুলী দখলে জড়িত ২২শ জন। এই তালিকায় দেশের রাঘব-বোয়ালরাও রয়েছেন। ২০১০ সালের কর্ণফুলী নদীর গতিপথ স্বাভাবিক রাখতে নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখল, ভরাট ও নদীতে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখার জন্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করা হয়।

মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস এ- পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জনস্বার্থে এ রিট দাখিল করেছিলেন।

ওই বছরের ১৮ জুলাই হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও ভূমি জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেন।

জেলা প্রশাসন গত বছর সহকারী কমিশনার (ভূমি) আগ্রাবাদ সার্কেলকে আহ্বায়ক করে ১৬ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে।

কমিটি কর্ণফুলী নদীর সীমানা ও অবৈধ স্থাপনা নির্ধারণ করেছে। কর্ণফুলীর মোহনা থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত অংশে এ জরিপ চালানো হয়। কমিটি ২০১৫ সালের ১৮ জুন জেলা প্রশাসকের কাছে নদীর অবস্থান, অবৈধ দখলদার, স্থাপনা চিহিৃত করে প্রতিবেদন দাখিল করে।

হাইকোর্টের সেই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর জেলা প্রশাসন কর্ণফুলীর সীমানা নির্ধারণ ও অবৈধ স্থাপনা চিহিৃত করেছে। আরএস ও বিএস খতিয়ানের ম্যাপ অনুযায়ী দুই ধরনের জরিপ করে জেলা প্রশাসন।

জেলা প্রশাসন জরিপ প্রতিবেদনটি গত বছরের ৯ জুন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্টার ও এটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে হাইকোর্টে দাখিল করেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ১৩৩টি প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী নদীতে তরল বর্জ্য নির্গমন করছে। এরমধ্যে ১২৩টি প্রতিষ্ঠানের ইটিপি কাগজে-কলমে থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান ইটিপি চালু করেনি। এসব শিল্প-কারখানার তরল বর্জ্যে নদী দূষিত হচ্ছে।

গত বছর নদী রক্ষা টাস্কফোর্সের ৩০তম সভায় নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছিলেন, দখল ও দূষণ থেকে কর্ণফুলীকে রক্ষা করতে না পারলে কর্ণফুলীকেও বুড়িগঙ্গার ভাগ্য বরণ করতে পারে।

বিপন্ন বা মরণাপন্ন নদী কর্ণফুলীকে বহুমুখী সমস্যার হাত থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে আমাদের সকলকে। নির্ধারিত স্থান ছাড়া শিল্পাঞ্চল করা অনুচিত ও বেআইনী, কাজেই সংজ্ঞাহীন বিষয় বিচার বিশ্লেষণ করে অবিলম্বে কর্ণফুলী নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করে কর্ণফুলীকে বাঁচাতে হবে।

লেখক: সম্পাদক, সিটিজি টাইমস ডটকম
ফেসবুক- https://www.facebook.com/mosrurzunaid.official/
ই-মেইলঃeditor.ctgtimes@gmail.com

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত