টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

বাঁকখালী রক্ষায় ২ বছরেও কার্যকর হয়নি হাইকোর্টের নির্দেশ

ইমাম খাইর
কক্সবাজার ব্যুরো

bakkhaliচট্টগ্রাম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস):: আজ ২৫ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব নদী দিবস। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে পালিত হবে দিনটি। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ নদী, সুস্থ নগর।’ প্রতি বছর দিবসটি যায় আর আসে। অথচ নদীমাতৃক দেশে নদী রক্ষায় কাঙ্খিত উদ্যোগ নেই। নদী রক্ষা, সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কর্তৃপক্ষের উদাস মানসিকতা বেশ লক্ষণীয়। বিশেষ করে কক্সবাজারের প্রধান নদী ‘বাঁকখালী’ অনেকটা অভিভাবকহীন। যে কারণে দখল হয়ে যাচ্ছে নদীর দু’কুল। নির্মিত হচ্ছে অবৈধ স্থাপনা। নদীর নাব্যতা হারিয়ে সুপেয় পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। শহরের কয়েক হাজার নলকূপের পানি ইতিমধ্যে লবণাক্ত হয়ে পড়েছে।

৬ নং জেটিঘাটের করুণ অবস্থা। নদী ড্রেজিং না হওয়ায় জলযান ভিড়তে পারেনা জেটিতে। হাটু পরিমাণ কাদাপানি পেরিয়ে জলযানে ওঠতে হয় যাত্রীদের। এতে ঘটছে দুর্ঘটনাও। তাছাড়া বাঁকখালী নদী রক্ষায় ২ বছরেও কার্যকর হয়নি হাইকোর্টের নির্দেশ। অধিকন্তু দিনে দিনে বাড়ছে দখলপ্রক্রিয়া।

প্রায় ৮০ কিলোমিটারের এই নদীর বাংলাবাজার থেকে নুনিয়াছটা পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার অংশে দখলের ঘটনা বাড়ছে। এসব এলাকায় দখলদারের সংখ্যা অন্তত এক হাজার। হিসেবে করলে এই তালিকা আরো দীর্ঘ হবে। দখলদারের তালিকায় রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীদের নামও রয়েছে। বিপুলসংখ্যক দখলদারকে উচ্ছেদে প্রশাসনের যৌথ অভিযান দরকার। তাহলেই বাঁকখালী নদী রক্ষা সম্ভব হবে বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।

এ প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী পরিচালক সর্দার শরিফুল ইসলাম জানান, বাঁকখালীতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছিল। বেশ কয়েকটি মামলাও হয়েছে দখলদারদের বিরুদ্ধে। সময় মতো উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা না পাওয়ায় সদিচ্ছা থাকলে অভিযানে নামা সম্ভব হয়না। তবে, জনবল সংকটের কারণে ফলপ্রসু সিদ্ধান্তে যাওয়া যাচ্ছেনা বলে দাবী করেন পরিবেশের এই কর্মকর্তা।

এদিকে বর্জ্য ফেলা অব্যাহত রাখায় পৌরসভার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসককে চিঠি দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। চিঠিতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করে কস্তুরাঘাট বিআইডবিøউটিএ টার্মিনাল সংলগ্ন পুরাতন ডাম্পিং স্টেশনের জায়গাটি অধিগ্রহণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাঁকখালী নদীর বেশ কয়েকটি পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, শহরের উত্তর নুনিয়াছরা থেকে মাঝেরঘাট পর্যন্ত নদীর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় ভরাট ও দখল তৎপরতা বেশি। কস্তুরাঘাটস্থ বিআইডবিøউআইটি টার্মিনাল সংলগ্ন নদীর ভরাট জমিতে গড়ে উঠেছে নানা স্থাপনা। তৈরি হয়েছে চিংড়িঘের, লবণ উৎপাদনের মাঠ, প্লট বিক্রির হাউজিং কোম্পানি, নৌযান মেরামতের ডকইয়ার্ড, ময়দা ও বরফ কল, শুটকিমহালসহ অসংখ্য ঘরবাড়ি। দেখা গেছে, কক্সবাজার পৌরসভার ময়লা-আবর্জনা সোজা বাঁকখালী নদীতে ফেলা হচ্ছে। কস্তুরাঘাটে আবর্জনায় নদী অর্ধেকের বেশি অংশ ভরাট হয়ে গেছে। ওই স্থানে নদীর পানি প্রবাহও অনেকটা বন্ধ। চারপাশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এসব আবর্জনা। পৌরসভার কিছু কর্মচারী নদীতে আবর্জনা ফেলার কাজে জড়িত রয়েছে। অথচ পৌর কর্তারা এসব দেখেও না দেখার ভান করে থাকেন বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এ ব্যাপারে পৌরসভার মেয়র (ভারপ্রাপ্ত) মাহবুবুর রহমান জানান, শহরের ময়লা আবর্জনা ফেলার জন্য রামুর চাইন্দা এলাকায় জমি কিনে এখন সেখানে ভাগাড় (ডাম্পিং স্টেশন) তৈরির কাজ চলছে। নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

তবে মাহবুবুর রহমান দাবি করেন, এক সময় নদীতে বর্জ্য ফেলা হলেও উচ্চ আদালতের নির্দেশের পর তা বন্ধ রয়েছে। এখন পৌরসভার ট্রাক দিয়ে নদীতে কারা ময়লা ফেলছে তা খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের ৬ নম্বর জেটিঘাটের করুণ আবস্থা। বাঁকখালী নদী ড্রেজিং-সংস্কার অভাবে জলযান কূলে ভিড়তে পারেনা। ঘাট থেকে অন্তত ১০০ ফুট দূরে অবস্থান করতে হয় জলযানগুলোকে। বাধ্য হয়ে হাটু পরিমাণ কাদাপানি পেরিয়ে জলযানে ওঠতে হয় যাত্রীদের। এতে যাত্রীদের অবর্ণনীয় ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেক সময় ঘটে থাকে দুর্ঘটনাও। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোন মাথা নেই।

বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি সরওয়ার আলম বলেন, আদালতের নির্দেশের পর প্রশাসন কতিপয় দখলদারের একটি তালিকা তৈরি করে নোটিশ জারি করেছিল। এরপর কয়েক দফা লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ হয়নি। উচ্ছেদ হয়নি অবৈধ দখলদারও।

সুত্র জানায়, বিশ্ব নদী দিবসটি এমন সময়ে পালিত হচ্ছে যখন পর্যটন শহর কক্সবাজারের প্রধান নদী বাকঁখালী ভরাট এবং অবৈধ দখলের কারণে অস্থিত্ব সংকটে পড়েছে। প্রশাসনসক বেসরকারী একাধিক সংগঠন এ দিবসটি বিভিন্ন ভাবে পালনের উদ্যোগ নিলেও কয়েক লাখ মানুষের নির্ভরশীল এবং পর্যটন এলাকার প্ররিবেশ-প্রতিবেশ সংশ্লিষ্ট এ নদীটি রক্ষায় কার্যকর কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছেনা।

স্থানীয়রা জানায়, সকাল ১১টা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত অন্তত ২০ থেকে ২৫টি ট্রাকে ময়লা ফেলা হয়। ব্যবহৃত হয় পৌরসভার ট্রাক-ডাম্পার। এতে নদীর গতিপথ সংকুচিত হচ্ছে। গতিপথে হওয়ায় বিপাকে পড়ছে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত ট্রলার। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ট্রলারগুলো নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এই নদীতে রাখা হয়।

এদিকে কক্সবাজারের প্রধান নদী বাকঁখালী দখলদারদের তালিকা তৈরী করে তাদের উচ্ছেদ এবং দূষণের উৎস চিহ্নিত করে তা বন্ধের নির্দেশ দেয় হাইকোর্টের বিচারপতি মির্জা হাঈদার হোসেন ও ভবানী প্রসাদ সিংহ এর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। ২০১৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুল জারি করে।
একই সাথে আদালত নদীর তীর চিংড়ি, তামাক বা ভিন্ন কোন উদ্দেশ্যে ইজারা প্রদান থেকে বিরত থাকতে ভুমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকসহ ১০ সরকারী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়।

রুলে বাঁকখালী নদীটি কেন প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হবেনা, কেন প্রাথমিক প্রবাহ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণপুর্বক তা রক্ষা করার নির্দেশ প্রদান করা হবেনা এবং কেন নদীর উভয় তীরের উপকুলীয় বন ফিরিয়ে আনার নির্দেশ প্রদান করা হবেনা তা জানতে চাওয়া হয়। সেই নির্দেশের দুই বছর পার হরো। বাস্তবায়নের কোন লক্ষণ নেই।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা)’র পক্ষ থেকে রিট মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল। কিন্তু কক্সবাজারের গুরুত্বপুর্ণ এ নদী রক্ষায় আদালতের নির্দেশনার দুইি বছর পার হয়ে গেলেও জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা কক্সবাজার পৌরসভা কার্যকর কোন পদক্ষেপই নেয়নি। উল্টো প্রতিদিন শহরের যত ময়লা-আবর্জনা সবই ফেলা হচ্ছে বাঁকখালী নদীতে। নতুন নতুন গড়ে উঠছে বিভিন্ন স্থাপনা। এমনকি খোদ পৌরসভা কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন বর্জ্য ফেলে ভরাট করছে নদী। পাশাপাশি উজাড় হচ্ছে নদীর পাশের প্যারাবন। ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। এত সংকুচিত হয়ে পড়ছে নদীর গতিপথ। পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা, এই অবস্থা চলতে থাকলে বাঁকখালীর ‘মরণ’ অনিবার্য।

ইয়ুথ এনভায়রণমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) কক্সবাজারের সভাপতি ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, এক সময় বাঁকখালী নদীর কস্তুরাঘাট ছিল শহরে প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। আর এখন মৃত্যুপুরী। শহরের একাধিক পাহাড় কাটার মাটি নেমে আসছে নদীতে। আর শহরের ময়লা-আবর্জনা ফেলে নদীর তলদেশ ভরাট করছে খোদ পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। ভরাট নদীতে ময়লা আবর্জনা ও পলিথিন ছড়িয়ে কেওড়া ও বাইন গাছের প্যারাবন মরে যাচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য।

জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশে নদীর দখলদারদের তালিকা তৈরি ও ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। এখন নদীর সীমানা নির্ধারণের কাজ চলছে। কতিপয় ব্যক্তির উচ্চ আদালতে মামলা এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে উচ্ছেদ অভিযান জোরদার করা যাচ্ছে না। তাছাড়া নদীতে জেগে ওঠা চরের জমি বন্দোবস্তিচেয়ে দুটি পক্ষ আবেদন করেছে। এখনো কোনো পক্ষকে ওই জমি বন্দোবস্তি দেওয়া হয়নি।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত