টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মিরসরাইয়ের চার ঝর্ণায় পর্যটকের ঢল

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি 

mirsarai-porjotonচট্টগ্রাম, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ (সিটিজি টাইমস): যে ঝর্ণার অপরূপ সৌন্দর্য থেকে চোখ ফেরানো যায় না সহজে। প্রকৃতির অপূর্ব এক সৃষ্টি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের এই খৈয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া, হরিনাকুন্ড বুনো ঝর্ণাধারা। ইতোমধ্যে অনেক দেশী-বিদেশী পর্যটক বিমুগ্ধ হয়ে বলেছেন, মাধবকুন্ডকে ছাড়িয়ে দৈর্ঘ্য-প্রস্থসহ পানির লেবেল এবং প্রাকৃতিক বৈচিত্রে খৈয়াছড়াই দেশের সবচেয়ে বড় ঝর্ণা। দুর্গম পাহাড়ের গহীনে বলেই খ্যাতি পায়নি ঝর্ণাটি।

উঁচু-নিচু অসংখ্য পাহাড় আর পাহাড়ের গায়ে নাম না জানা নানা রকম গাছের সবুজ পাহাড়কে মনে হয় যেন এক সবুজের অভয়ারণ্য। আর এই সবুজ পাহাড়ের বুক চিড়ে কল কল ধ্বনিতে নেমে আসছে বুনো ঝর্ণা খৈয়াছড়া। মিরসরাইয়ের ঢাকা-চট্টগ্রামের মহাসড়কের পূর্ব পার্শ্বে বড়তাকিয়া এলাকার খৈয়াছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের উল্টো দিকের মূল রাস্তা থেকে পিচঢালা পথ চলে গেছে রেললাইন পর্যন্ত। সেখান থেকে মেঠোপথ আর খেতের আইলের শুরু। তারপর চলতে চলতে হঠাৎ করেই যেন মাটি সরে গিয়ে উদয় হবে একটা ঝিরিপথের। টলটলে শান্ত পানির চুপচাপ বয়ে চলার ধরনই বলে দেবে এর উৎস অবশ্যই বিশাল কিছু থেকে।

স্থানীয় লোকদের বাড়ি ও খেতের আইলের পাশে বেড়ে উঠেছে আম, নারিকেল আর পেঁপের বাগান। এরপর শুধু ঝিরিপথ ধরে এগিয়ে যাওয়া। কিছুক্ষণের মধ্যেই পর্যটকরা আবিষ্কার করবেন লাল আর নীল রঙের ফড়িংয়ের মিছিল! যত দূর পর্যন্ত ঝিরিপথ গেছে তত দূর পর্যন্ত তাদের মনমাতানো ঝিঁঝি পোকার গুঞ্জন শোনা যায়। হাঁটতে হাঁটতেই শুনতে পাওয়া যায় পানি পড়ার শব্দ। চারপাশে মন ভালো করে দেওয়া সবুজ দোল খাচ্ছে ফড়িংয়ের পাখায়। মাঝে মাঝে এখানে শোনা যায় হরিণের ডাক।

যেতে যেতে পরিচয় হবে বুনো অর্কিড, পাথরে লেগে থাকা প্রায় অদৃশ্য সবুজ শেওলা, অচেনা পাখিদের ডাক, ঘাসের কার্পেট বিছানো উপত্যকার সাথে। কিছুদূর হেঁটে একটা মোড় ঘুরলেই চোখের সামনে নিজের বিশালতা নিয়ে হাজির হবে খৈয়াছড়া ঝর্ণা।

অনেক ওপর থেকে একটানা পানি পড়ছে। সৌন্দর্যের শুরু এখান থেকেই, পর্যটকরা এখান পর্যন্ত এসেই চলে যায়, ওপরের দিকে আর যায় না। এই ঝর্ণার ওপরে আছে আরও আটটা ধাপ। এখানকার নয়টা ধাপের প্রতিটিতেই রয়েছে প্রসস্থ জায়গা, যেখানে তাঁবু টানিয়ে আরাম করে পূর্ণিমা রাত পার করে দেয়া যায়।

একটু চুপচাপ থাকলেই বানর আর হরিণের দেখা পাওয়া যায়। অদ্ভুত সুন্দর এই সবুজের বনে একজনই সারাক্ষণ কথা বলে বেড়ায়, বয়ে যাওয়া পানির রিমঝিম ঝর্ণার সেই কথা শুনতে শুনতে আর বুনো ফুলের মিষ্টি সুবাস নিতে ঘুমিয়ে পড়া যায় নিশ্চিন্তে। তৃষ্ণা পেলে বুনো ঝর্ণা থেকে সুপেয় পানি খেয়ে নিতে পারেন দর্শনার্থীরা।

এসব দৃশ্য দেখে ক্ষণিকের জন্য ভুলে যাবেন শহরের ব্যস্ততা, কোলাহল। মনের মাঝে বইবে মাতাল হাওয়া সে হাওয়ায় ভেসে যাবে জীবনের ক্লান্তি! এমন সুন্দর দর্শনীয় স্থান আমাদের কাছে অপরিচিত ছিল এতদিন, ভাবতেই অবাক লাগে। দুর্গম বুনো এই ঝর্ণা পিপাসু পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকছে প্রতিদিন।

পাহাড়ের সবুজ রং আর ঝর্ণার স্বচ্ছ জল মিলেমিশে একাকার হয়েছে মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝর্ণায়। প্রকৃতির নান্দনিক তুলিতে আঁকা এ ছবি দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন দেশের ভ্রমণ পিয়াসী মানুষ।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বড়দারোগাহাট থেকে জোরারগঞ্জ পর্যন্ত মানুষের ভীড়। সবাই দুর-দুরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন। ঈদের ছুটিতে বেরিয়ে পড়েছেন একটু বেড়ানোর জন্য। কেউ দল-বল নিয়ে ছুটছেন খয়াছড়া ঝর্ণায়, কেউ নাপিত্তাছড়া ঝর্ণায় আবার কেউবা পরিবার পরিজন নিয়ে ছুটছেন মহামায়ার জাদু দেখতে। সকলের গন্তব্য পর্যটন স্পটগুলো। এবারের ঈদের ছুটিতে ভ্রমন পিপাসু মানুষের পদচারনায় মুখরিত মিরসরাইয়ের পর্যটন ছয়টি স্পট । তার মধ্যে বেশি পর্যটক ভিড় করছে আট স্তর বিশিষ্ট জলপ্রপাত খৈয়াছড়া ঝর্ণা, নয়দুয়ারিয়া নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা, ওয়াহেদপুর হরিনাকুন্ড ঝর্ণা, বড়কমলদহ ঝর্ণা মহামায়া লেক ও মুহুরী প্রজেক্টে। আবহাওয়া ভালো থাকায় ঈদের দিন বিকেল থেকে অর্ধবদি হাজার হাজার উপস্থিত হয়েছে এসব পর্যটন স্পটে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা এখানে ছুটে আসছেন।

চট্টগ্রাম শহরের ষোলশহর এলাকা থেকে খৈয়াছড়া ঝর্ণায় ঘুরতে এসেছেন তানভীর, রাইহান, চয়ন, সুমন আরিফসহ ১২জন বন্ধু। স্যোসাল মিডিয়া ও বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম তারা জানতে পারেন মিরসরাইয়ে অনেকগুলো পর্যটন স্পটের বিষয়টি অবগত হয়েছেন। তাই তারা ছুটে ছুটে এসেছেন আনন্দ উপভোগ করতে। প্রথমে খৈয়াছড়া ঝর্ণা, তারপর মহামায়া ও সর্বশেষ মুহুরী প্রজেক্টে ঘুরতে যাবেন তারা।

ফেনীর রামপুরা থেকে নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা দেখে বাড়ি ফিরছিলেন রাশেদ-তানিয়া দম্পতির। অনেকক্ষণ হেঁটে হাপিয়ে উঠেছেন তারা। কিন্তু চোখে মুখে ক্লান্তির কোন চাপ নেই। রাশেদ বলেন, ঝর্ণাটি পাহাড়ের অনেক ভিতরে তাই অনেক কষ্টে যেতে হয়েছে। সেখানে গিয়ে ঝর্ণাধারা দেখার পর বুঝলাম এমন অপরূপ দৃশ্য দেখতে এমন কষ্ট করা স্বাভাবিক। রিমঝিম পানি পড়ার শব্দ শুনে আর পানিতে মানুষের ধাপাধাপি দেখে মুহর্তে সব কষ্ট ভূলে গেলাম।

জানা গেছে, প্রতিবছরের মতো এবারও ঘরে বসে থাকতে পারেনি ভ্রমন পিপাসু মানুষরা। তারা ছুটে এসেছেন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম লেক মহামায়া, দেশের ষষ্ঠ সেচ প্রকল্প মুহুরী প্রজেক্ট, আট স্তর বিশিষ্ট খৈয়াছড়া ঝর্ণা ও নয়নাভিরাম বাওয়াছড়া লেক, নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা ও বড়কমলদহ ঝর্ণায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই উপজেলার ঠাকুর দীঘি বাজারের এক কিলোমিটার পূর্বে। ছায়াঘেরা সড়ক। কিছুদূর পর দেখা মিলেছে রেলপথের। প্রাণের টানে ছুটে আসা পথ যেন ক্রমশই বন্ধুর হতে চাইছে মনের কোণে জাগা মৃদু উত্তেজনায়। দূর থেকে দেখা যায় প্রায় পাহাড়সম বাঁধ। উভয় পাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। বাঁধে উঠতেই…! আহ, কি অপরূপ শোভা। বাঁধের ধারে অপেক্ষমান সারি সারি ডিঙি নৌকো আর ইঞ্জিনচালিত বোট। ১১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের লেক কেবল সুভা ছড়ায়। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে স্বচ্ছ পানিতে তাকাতেই দেখা যায় নীলাকাশ। কিছুদূরেই দেখা গেছে পাহাড়ের কান্না। অঝোরে কাঁদছে পাহাড়। অথচ তার কান্না দেখে নিজের কাঁদতে একটুও ইচ্ছে হয়নি। বরং কান্নার জলে গা ভাসিয়েছে অনেকেই। ঝর্ণা দেখার জন্য প্রতিজন থেকে নেওয়া হয় ইঞ্জিন চালিত বোডে ৩০ টাকা করে। আর ডিঙ্গি নৌকা রিজার্ভ ভাড়া নেওয়া হয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। নৌকা বা বোডে করে যেতে হয় ঝর্ণা দেখার জন্য। বোডের ভাড়া কম হওয়াতে অনেকেই ছুটে যান ঝর্ণা দেখতে। এবারের ঈদে মানুষের ঢল নেমেছে অপরূপ সৌন্দর্য্যরে আট স্তর বিশিষ্ট ঝর্ণায়। বড়তাকিয়ায় খৈয়াছড়া সড়কে ঈদের দিন থেকে মানুষের ভীড় ছিল চোখে পড়ার মতো। মিরসরাই উপজেলা ছাড়াও ঝর্ণার পানিতে নিজের ঘাঁ ভাসিয়ে দিতে দূর দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছে অনেক আবাল বৃদ্ধ বনিতা। নান্দনিক তুলিতে আঁকা সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছে দেশের ভ্রমণ পিয়াসী মানুষ। প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি সেতুবন্ধন করে, সবুজের চাদরে ঢাকা বনানী রূপের আগুন ঝরায়, যেখানে প্রকৃতি খেলা করে আপন মনে, ঝুম ঝুম শব্দে বয়ে চলা ঝর্ণাধারায় গা ভিজিয়ে মানুষ যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ থেকে নিজেকে ধুয়ে সজীব করে তুলছে খৈয়াছরা ঝরনায়। গ্রামের সবুজ শ্যামল আঁকা বাঁকা মেঠো পথ পেরিয়ে শরীরটা একটু হলেও ভিজিয়ে নেয়া যায় নিঃসন্দেহে। এছাড়া নয়দুয়ারিয়া নাপিত্তাছড়া ঝর্ণায়ও ঢল নেমেছে মানুষের। দেশের ষষ্ঠ সেচ প্রকল্প ও প্রথম বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প মুহুরী প্রজেক্ট প্রকৃতির আরেক নাম। এখানে আছে আলো-আঁধারির খেলা আছে জীবন-জীবিকার নানা চিত্র। মুহুরীর চর, যেন মিরসরাইয়ের ভেতর আরেক মিরসরাই। অন্তহীন চরে ছোট ছোট প্রকল্প। এপারে মিরসরাই, ওপারে সোনাগাজী। ৪০ দরজার রেগুলেটরের শোঁ শোঁ আওয়াজ শোনা যায় দূর থেকে। পশ্চিমে মৎস্য আহরণের খেলা, আর পূর্বে মন কাড়ানিয়া প্রকৃতি। নুয়ে পড়া মনোবল জেগে উঠবে পূবের জেগে ওঠা চরে। ডিঙি নৌকায় ভর করে কিছুদূর যেতেই দেখা মিলবে সাদা সাদা বক। এখানে ভিড় করে সুদূরের বিদেশী পাখি, অতিথি পাখি বলেই অত্যধিক পরিচিত এরা। চিকচিকে বালিতে জল আর রোদের খেলা চলে সারাক্ষণ। সামনে পেছনে, ডানে-বামে কেবল সৌন্দর্য আর সুন্দরের ছড়াছড়ি। এবারের ঈদে পর্যটকদের পদভারে মুখরিতম হয়েছে মুহুরী প্রজেক্ট।

পানির ¯্রােতের গতি দেখে বোঝা যাচ্ছে ঝরনা একেবারে ভরা যৌবনা। চারপাশেই বিশাল পাহাড়ের সারি। তার উপরের আকাশ মেঘে ঢাকা। যে কোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে।

নয়নাবিরাম প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাওয়াছড়া সেচ প্রকল্প। উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের মধ্যম ওয়াহেদপুর বাওয়াছড়া পাহাড়ীয়া এলাকায় যুগ যুগ ধরে ঝর্ণা প্রবাহিত হচ্ছে। সবুজ শ্যামল পাহাড়ীয়া লেকে পাখিদের কলতানে আবাল, বৃদ্ধ, বণিতা সকলের প্রান জুড়িয়ে যাবে। এবার পর্যটক গত বছর গুলোর তুলনায় এক এসেছে বলে জানিয়েছেন বাওয়াছড়া প্রকল্পের উদ্যোক্তা সাবেক চেয়ারম্যান সালাহ উদ্দিন সেলিম
ঈদের দিন থেকে আবহাওয়া ভালো থাকায় মানুষের ভিড় বেড়েছে দর্শনীয় স্থানগুলোতে।

পর্যটন স্পটগুলোতে নিরাপত্তার বিষয়ে মিরসরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমতিয়াজ এমকে ভূঁইয়া এবং জোরারগঞ্জ থানার সেকেন্ড অফিসার বিপুল দেবনাথ জানান, ঈদে মিরসরাইয়ের পর্যটন স্পট গুলোতে নিরাপত্তার জন্য সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পুলিশ উপস্থিতি ছিল। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান সহ মহাসড়কে পুলিশের টহল অব্যাহত রয়েছে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত