টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

রেকর্ড দামেও হতাশ লবণচাষিরা

ইমাম খাইর
কক্সবাজার ব্যুরো

Cox-Salt-Picচট্টগ্রাম, ৩১  আগস্ট ২০১৬ (সিটিজি টাইমস)::ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ রেকর্ড লবণের দামে। প্রতিমণ লবণ মাঠে বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৫শ থেকে ৬শ টাকা। আর এই লবণ ঢাকায় নিয়ে এক হাজার থেকে ১২শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। অথচ মাত্র চার বছর আগেও প্রতিমণে ২০ টাকায় বিক্রি করে চাষিরা। ওই সময় বিদেশ থেকে অতিমাত্রায় লবণ আমদানির কারণে মারা পড়ে দেশীয় লবণশিল্প। হাল ছেড়ে দিয়েছিল লবণচাষিরা। উৎপাদনে না যাওয়ায় খালি পড়ে থাকে কয়েক হাজার একর লবণ মাঠ। নেমে আসে লবণশিল্পে চরম বিপর্যয়। নীতিনির্ধারকদের যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে ধ্বংসের মুখোমুখি হতে যাওয়া দেশীয় লবণশিল্প আবারো প্রাণ ফিরে পায়। পুরোদমে শুরু হয় লবণ উৎপাদন। উৎকণ্ঠিত লবণচাষিদের মুখে ফুটে ওঠে নতুন হাসি।

মৌসুমের শেষ সময়ে এসে রেকর্ড পরিমাণ দাম ওঠলেও শুরুতে লোকসান গুনতে হয় চাষিদের। সম্প্রতি বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় রোয়ানোর আঘাতে কৃষকের উৎপাদিত লবণের অন্তত একলাখ মেট্টিকটন লবন ভেসে যায়। তবে, বিসিকের ভাষ্য মতে, রোয়ানোতে ২৫ হাজার ৫০০ মেট্রিকটন লবণের ক্ষতি হয়। এজন্য বিসিকের কর্মকর্তাদের দুষছেন লবণ চাষিরা।

কক্সবাজার লবণমিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনজুর আলম জানান, লবণের দাম পাওয়া নিয়ে অতীতের মতো অনিশ্চয়তা ছিল। এ কারণে অধিকাংশ চাষি আগেভাগেই লবণ বিক্রি করে দিয়েছে। তার মতে, বিসিক থেকে যথা সময়ে তথ্য না পাওয়ায় মাঠ পর্যায়ের লবণচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের আরো আন্তরিক হওয়া দরকার বলে মনে করেন।

এদিকে তাছাড়া সঠিক সময়ে তথ্য না পাওয়ায় চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, বিসিক কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে চাষিদের খোঁজ নেননা। অফিসে বসেই লবণের রিপোর্ট করেন। যেই রিপোর্টের সাথে বাস্তবতার সাথে কোন মিল থাকেনা।

এ অভিযোগ মানতে রাজি নন কক্সবাজার লবনশিল্পের উন্নয়ন কার্যালয়ের (বিসিক) উপ-মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আবসার উদ্দিন। তিনি জানান, তথ্য দেবে আবহাওয়া অফিস। এখানে বিসিকের কোন সংশ্লিষ্টতা নাই। তবে, তিনি স্বীকার করেছেন, ১২টি কেন্দ্রের প্রত্যেকটিতে জনবল রয়েছে দুইজন করে। এত অল্প সংখ্যক লোক দিয়ে লবণের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘চ্যাম্বল সার্ভে’ করেই সাপ্তাহিক রিপোর্ট করা হয়। আপনাদের কাছে এমন কোন ‘ম্যাকানিজম’ থাকলে বলেন, সেটি প্রয়োগ করলে সঠিক তথ্য নেয়া যাবে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুঠিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) এর মতে, জেলার চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, টেকনাফ, কক্সবাজার সদর উপজেলা ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী (আংশিক) উপজেলার ১২টি কেন্দ্রে লবণ চাষযোগ্য জমি ৬০ হাজার একর।

দেশে লবণের চাহিদা রয়েছে ১৬ লক্ষ ৫৮ হাজার মেট্রিকটন। এ বছর উৎপাদন হয় ১৫ লাখ ৫৫ হাজার মেট্টিকটন। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১৮ লাখ মেট্রিকটন। চাহিদার তুলনায় কম উৎপাদন হয় প্রায় এক লাখ মেট্টিকটন। লবন উৎপাদন মৌসুম শেষ হয়েছে গত ২১ মে। আগামী নভেম্বর থেকে শুরু হবে নতুন মৌসুম। এ পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে লবণ মজুদ আছে প্রায় ৩৬ হাজার মেট্টিকটন।

এদিকে আগামী মাসে ঈদুল আযহা সামনে রেখে দেড় লাখ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। গত ১৪ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রধান আমদানী ও রপ্তানী নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে অনুমতি নিয়ে ব্যবসায়ীরা ঋণপত্র খুলতে পারবেন। দেড় লাখ টনের মধ্যে ৭৫ হাজার টন সাধারণ ও ৭৫ হাজার টন শিল্পে ব্যবহার্য লবণ আমদানি করা যাবে।

লবণচাষি ফরিদুল আলম বলেন, সরকার বিবেচনা করে দেড় লাখ মেট্টিকটন লবণ আমদানির অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু যে পরিমাণ লবণ আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছে, তার চেয়ে বেশী আমদানি করা হলে সামনের মৌসুমে লবণের দামে প্রভাব পড়বে। ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হতে পারে তৃণমূলের লবণচাষিরা।

স্থানীয় লবণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কৌশলে দ্বিগুন/তিনগুনের চেয়েও বেশী লবণ আমদানি করতে পারে একটি চক্র। তাদের বিষয়ে সরকারকে সতর্ক হতে হবে।

কক্সবাজার সদরের ইসলামপুরের লবণচাষি অহিদুল্লাহ বলেন, লবণের মাঠ করে দু’বেলা ঠিক মতো ভাতও জুটেনি। ভর্তুকিতে মাঠ চালাতে হয়েছে। এবারই আমরা ন্যায্যমূল্য পেয়েছি। লবণচাষে আমরা উৎসাহিত হয়েছি।

তবে আশংকা জানিয়ে লবণচাষি অহিদুল্লাহ বলেন, শুনলাম আবার লবণ আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। প্রয়োজন হলে আমদানি করুক, তাতে আপত্তি নাই। দেশীয় লবণশিল্প বাঁচিয়ে আমদানি করা হোক। কিন্তু আমদানির সুযোগে যেন কোন সিন্ডিকেটের পকেট ভারি করা না হয়।

কক্সবাজার সদরের ইসলামপুরের মক্কা সল্ট ক্রাশিং এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এর মালিক ছলিম উল্লাহ কাদেরীর মতে, যে পরিমাণ লবণ মজুদ আছে তা দিয়ে আরো অন্তত দুই মাস চলবে। সরকার বিবেচনা করে যে লবণ আমদানীর অনুমতি দিয়েছে তাতে যথেষ্ট। এর চেয়ে বেশী আনা হলে মাঠে প্রভাব পড়বে।

লবণচাষিরা জানান, এবারের লবণ মৌসুমের শুরুতে একশ/দেড়শ টাকায় বিক্রি করতে হলেও শেষ পর্যায়ে প্রতিমণ লবণের দাম ছিল ৫/৬শ টাকা। তার মতে, দাম পাওয়া গেলেও লবণ পাওয়া যায়নি মাঠে। অতীতের মতো দামের অনিশ্চয়তায় আগেভাগে বিক্রি করে ফেলেছে অনেকেই। মধ্যস্বত্বভোগিদের খপ্পরে পড়ে তাদের অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হয়েছে। অনেক চাষিকে দাদনদাতাদের হাতে জিম্মি থাকতে হয়েছে সারাবছর। এ অবস্থার উত্তরণন চায় চাষিরা।

লবণচাষিদের অভিযোগ, ভ্যাকোয়াম লবণ বাজারে মারাতœক প্রভাব ফেলছে। সাধারণ লবণ যেখানে মাঠে প্রতি কেজি ১৫ টাকা, সেখানে ভ্যাকোয়াম লবণ বিক্রি হয় ৪০থেকে ৪৫ টাকায়। ‘চকচকে লবণ’ দেখিয়ে অধিক মূল্য হাতিয়ে নিয়ে একটি সিন্ডিকেট।

লবণশিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, কেউ কেউ হয়তো একথাও বলবেন যে, বর্তমানে যা আনা হচ্ছে তা খাওয়ার লবণ নয়। এগুলো ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট বা শিল্প কল-কারখানায় ব্যবহার করার লবণ মাত্র। তারা বলবেন, আমাদের গার্মেন্টস কারখানায় লবণ লাগে, বস্ত্র শিল্প এবং রাসায়নিক কারখানায়ও লবণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তদুপরি, আমাদের ট্যানারীতে চামড়া সংরক্ষণের জন্যেও পর্যাপ্ত লবণ প্রয়োজন হয়। আমাদের দেশের লবণের মান নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলবেন। তারা যুক্তি দেখাবেন, আমাদের দেশের লবণ স্বচ্ছ নয়, এটা নয়-ওটা নয় ইত্যাদি নানা রকম ফন্দিবাজির কথা বলবেন। আসলে এগুলো সবই মিথ্যা কথা। অগ্রহণযোগ্য বুলি মাত্র। কারণ, ভারত মহাসাগরের জল থেকে আহরিত লবণ দিয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল চাহিদা পূরণ করলে বঙ্গোপসাগরের জল থেকে আহরিত লবণ কি দোষ করেছে? আর লবণের স্বচ্ছতা যদি মাপকাঠি হয় তাহলে আমাদের সল্ট রিফাইনারীগুলো আরো আধুনিক করা হচ্ছে না কেন?

আসলে আমাদের দেশীয় লবণ অত্যন্ত স্বচ্ছ করা যায় এবং বর্তমানেও এ গ্রেডের লবণ যথেষ্ট পরিমাণ স্বচ্ছ। কিন্তু যেহেতু ধান্ধাবাজ আমদানিকারকরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল বা মেকানিক্যাল সল্ট ঘোষণা দিয়ে বিনা শুল্কে নিকটবর্তী রাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে পারে তাই তারা দেশীয় লবণকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল লবণ হিসেবে ব্যবহার করে না। আবার ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট ঘোষণা দিয়ে যে লবণ আমদানি করা হয় হাত ঘুরে সেই লবণই চলে যাচ্ছে আমাদের লবণ কলগুলোতে। সেখান থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট সুদৃশ্য মোড়কে সেজে হয়ে যাচ্ছে এসিআই সল্ট, মোল্লা সুপার সল্ট, কনফিডেন্স সল্ট, মুসকান সল্ট, তৃপ্তি সল্ট বা ফ্রেশ সল্ট। আর আমরা এগুলো নিয়ে যাচ্ছি আমাদের রান্নাঘরে। আমরা খবর রাখছি না যে, আমার দেশের লবণ চাষিদের আহরিত লবণ বিক্রি হচ্ছে না। লবণ বিক্রি করতে না পেরে তারা অনাহারে, অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের নানা অত্যাচারের শিকার হয়ে তারা কোন কোন সময় নামমাত্র মূল্যে লবণ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।

সুত্র মতে, লবণের ব্যাপক চাহিদার কারণে উৎপাদিত লবণ পরিশোধন ও বাজারজাত করণের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে অন্তত ৩৬০ টি লবণ মিল-কারখানা। এসব মিলের মধ্যে শুধু কক্সবাজার সদরের বিসিক শিল্প নগরী ইসলামপুর কেন্দ্রিক ৪০ মিলসহ জেলায় ছোট বড় মিলে গড়ে উঠেছে অন্তত ৫০ টি লবণ কারখানা। এ পেশায় সম্পৃক্ত রয়েছে অন্তত ৫ লক্ষাধিক কৃষক ও ব্যবসায়ী পরিবার। কিন্তু উৎপাদিত লবণ ও লবণের মিল-কারখানাগুলো দেশের ৬টি রাঘব বোয়াল মিলারের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে তাদের অভিযোগ।

লবণ চাষিদের অভিযোগ, ঢাকা ও নারায়নগঞ্জ কেন্দ্রীক পরিতোষ গংদের ‘সিক্সমিল সিন্ডিকেট’ সরকারকে ভুল বুঝিয়ে এবং দেশে কৃত্রিম লবণ সংকট দেখিয়ে ভারত থেকে লবণ আমদানী করে আসছিল প্রতিবছর। এতে নিজেরা লাভবান হলেও দেশের স্বনির্ভর লবণ খাতকে বিপর্যস্ত করে রাখে চিহ্নিত চক্রটি।

লবণচাষিদের দাবী, সরকার যেটুকুনই লবণ আমদানির অনুমতি দিয়েছে, তার চেয়ে যেন বেশী আমদানী করা না হয়। দেড় লাখ মেট্রিকটনের আড়ালে আরো বেশী আমদানী করা হলে এর প্রভাব মাঠে পড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

মতামত