টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

রাজশাহী থেকে রাশিয়া

rচট্টগ্রাম, ২২ আগস্ট ২০১৬ (সিটিজি টাইমস): সুনসান গ্রাম। মাঝ দিয়ে চলে গেছে পিচঢালা সরু পথ। রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরের এই কাশিপুর গ্রামেই একটি বাড়িতে রোববার ছিল কৌতূহলী উৎসুক মানুষের ভিড়। সবাইকেই আপ্যায়ন করছেন দিনা জহুরা। করবেন নাই বা কেন? বাড়ির মেয়ে মার্গারিটা মামুন যে অলিম্পিকে স্বর্ণ জিতেছে। এক কান, দুই কানে এ খবর রটে যেতেই গ্রামের শান্ত রাস্তায়ও ভিড়! মার্গারিটা এ বাড়িরই ছেলে আবদুল্লাহ আল মামুনের মেয়ে। গ্রামের লোক অবশ্য মামুনকে ‘শিপার’ নামেই চেনেন। বছর আটেক আগে একবার শিপার মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন গ্রামে। তখনকার সেই ছোট মেয়েটিই যে অলিম্পিক জিতেছে, সে খবরে গোটা গ্রামে যেন উৎসবের রব। ‘রিটা এ পর্যন্ত তিনবার গ্রামে এসেছে। সর্বশেষ এসেছে প্রায় আট বছর আগে। সে ভাঙা ভাঙা বাংলা বলতে পারে। এখানে এসে বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে ব্যস্ত ছিল। সুযোগ পেলেই পুকুরের বাঁধানো ঘাটে এসে বসে থাকত। তার বাবা মামুন মেয়ে রিটাকে বলত- এটাই তোমার আসল বাড়ি। তুমি এখানে আসবে।’ স্মৃতিতে ডুবে যান রিটার ফুফু দিনা জহুরা। আক্ষেপ করেন, রিটার বাবা মামুনের শরীর এখন ভালো নেই। ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে তার শরীরে। এখন শয্যাশায়ী সে। রিটার ফুফুর কাছ থেকে ফোন নম্বর নিয়ে ফোন করা হয়েছিল আবদুল্লাহ আল মামুনকে। ‘আমি খুব অসুস্থ। কথা বলতে পারছি না’, অস্পষ্ট স্বরে মাত্র এটুকুই সাড়া দেন স্বর্ণজয়ীর বাবা।

মামুনের পরিবারের সদস্যরা জানান, দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি একাদশ শ্রেণিতে ভর্তর্ি হন রাজশাহী কলেজে। এখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে তিনি ভর্তি হন রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। কিন্তু লাশকাটা ঘরে গিয়ে তিন মাসেই ডাক্তারি পড়া থেকে মন উঠে যায় মামুনের। শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে ১৯৮৩ সালে রাশিয়ায় চলে যান। সেখানে গিয়ে বিয়ে করেন রুশকন্যা অ্যানাকে। মামুন-অ্যানা দম্পতির ঘরে দুই সন্তান_ মেয়ে মার্গারিটা আর ছেলে ফিলিপ আল মামুন।

গ্রামে রয়েছে মামুনের বাবার আমলের একটি পুরনো মাটির বাড়ি। এর পাশেই রাশিয়া থেকে ফিরে এসে মামুন তৈরি করেছেন একতলা ফ্ল্যাট বাড়ি।

গ্রামে এলে এই বাড়িতে তারা এসে থাকেন। কিন্তু প্রচণ্ড গরম তারা সহ্য করতে পারেন না। তাই এসি লাগানো হয়েছে ঘরে। কিন্তু সমস্যা হলো খাবার নিয়ে। রিটা এবং তার মা অ্যানা ভাত খেতে পারেন না। এখানে এসে শুধু জুস আর কফি খেত। লবণ দিয়ে সেদ্ধ করে চিংড়ি খেত। মাংসও খেত লবণ দিয়ে সেদ্ধ করে। কোনো মসলা তারা খেত না। রিটার ফুফু জানান, রিটা ভাঙা ভাঙা বাংলায় ‘বড় আপু খুব ভালো’ বলে অ্যানাকে বুকে জড়িয়ে ধরত।

রিটা সেভাবে না পারলেও ফিলিপ কিন্তু ভালো বাংলা বলতে পারেন। তিনি বলেন, ‘মামুনের ছেলে ফিলিপ ভালো বাংলা বলতে পারে। মামুন তাকে ভাত খাওয়ানো শিখিয়েছে।’ তিনি জানান, মামুন প্রতিবছরই গ্রামে আসত। এসে ১৫-২০ দিন থাকত। কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিন বছর ধরে আর আসতে পারে না। তার একটি কিডনি নষ্ট হলে অপারেশন করতে হয়। কয়েক মাস আগে সে বাথরুমে পড়ে যায়। এর পর আর হাঁটাচলা করতে পারে না। বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন দিনা জহুরা।

রিটার ফুফাতো ভাই শামসুজ্জোহা দুর্গাপুরের একটি কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘রিটা যখন ছোট ছিল, তখন তার বাবা চেয়েছিলেন, রিটা বাংলাদেশের হয়ে অলিম্পিকে খেলবে। এ জন্য তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দেশের অলিম্পিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগও করেছিলেন। কিন্তু তারা আগ্রহ দেখাননি। ফলে রাশিয়ার হয়েই তাকে খেলতে হলো।’ তিনি বলেন, ‘রিটা আমাদের বাংলাদেশের মেয়ে। এই গাঁয়ের মেয়ে। আমরা চাই, আগামী অলিম্পিক আসরে (জাপানে অনুষ্ঠিত হবে) সে বাংলাদেশের হয়ে খেলুক। এ জন্য দেশের পক্ষ থেকে আগ্রহ দেখালে রিটা খেলতে আপত্তি করবে না। কারণ, এটা তার বাবার ইচ্ছা ছিল।’ তিনি বলেন, ‘রিটা রাশিয়ার হয়ে খেললেও এ গৌরব আমরা করতেই পারি। কারণ, সে আমাদের দেশের মেয়ে।’

দিনার ছেলে শামসুজ্জোহা তার ট্যাবে সবাইকে দেখাচ্ছেন রিটার ক্যারিশমাময় রিদমিক। সবাই বিস্ময়ভরা চোখে দেখছে। আর বলছেন, ‘দেখ দেখ, আমাদের শিপারের (মামুন) মেয়ে।’ তাদেরই একজন মজিবুর রহমান। পেশায় কৃষক। তিনি বলেন, ‘মেয়ে যখন এসেছিল, তখন ছোট ছিল। এখন এত সুন্দর করে খেলছে। সোনা জিতেছে। এটা আমাদের গৌরব। গাঁয়ের মুখ, দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে সে।’

গৃহবধূ রওশন আরা বলেন, ‘আমরা এতটাই আনন্দিত যে ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে খেলা দেখেছি। চোখ সরাতে পারছি না।’

রোববার সন্ধ্যায় রাশিয়ায় মার্গারিটার বাবা আবদুল্লাহ আল মামুনকে ফোন করা হলে তিনি ফোনটি ধরেন। তিনি অস্পষ্ট স্বরে বলেন, ‘আমি খুব অসুস্থ। কথা বলতে পারছি না।’

এদিকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, ‘মার্গারিটা মামুন রিদমিক জিমন্যাস্টিকসে প্রথম হয়ে স্বর্ণ জিতেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার বাবা বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনে যোগাযোগ করেছিলেন তার মেয়েকে বাংলাদেশের হয়ে অংশগ্রহণ করানোর জন্য। কিন্তু তখনকার প্রশাসন আগ্রহ প্রকাশ করেনি। যাই হোক, তবুও আমরা তার এ অর্জনে আনন্দিত তো হতেই পারি।’

সুত্রঃ সমকাল

মতামত